পরিচালকদের দ্বন্দ্বে বেদখলের শঙ্কা :চলতি ঋণেও সুদ মওকুফ

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২১, ২৩:২৩

বেসরকারি খাতের সাউথইস্ট ব্যাংকে দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে নানা অনিয়ম। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ সদস্যদের সবাই পর্ষদ সভায় অংশ নেন না। মূলত পরিচালকদের অন্তর্দ্বন্দ্বই এর মূল কারণ বলে জানা গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তেও উঠে এসেছে ব্যাংকটিতে সংঘটিত নানা অনিয়ম আর জালিয়াতির কথা। এরই মধ্যে চাউর হয়েছে ব্যাংকটি বেদখল হয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকিং খাতে দখল-বেদখলের খেলা সম্প্রতি বন্ধ থাকলেও তা আবার চালু হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্ন ব্যাংকিং সূত্রগুলোর।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, বেসরকারি খাতের এই ব্যাংক একসময়কার জাঁদরেল ব্যবসায়ী নেতাদের দ্বারা পরিচালিত হলেও এখন তারা সবাই যেন নির্বাসনে। সব শেষ ব্যাংকটির অজ্ঞাত ব্যক্তিদের শেয়ার কেনার বিষয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ইতিপূর্বে ঘটে যাওয়া ব্যাংক দখলের ঘটনার পর ঐ সব ব্যাংকে অনেকেরই চাকরি চলে গেছে। কেউ প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন।

এদিকে ব্যাংকের পরিচালকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন চরমে। বার্ষিক সাধারণ সভায় যোগ দিচ্ছেন না অনেক পরিচালক। ফলে ব্যাংকটিতে এখন নিয়মাচার বলতে কিছু নেই বলে খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তেও          উঠে এসেছে। নিজস্ব  লোকদের ঋণ দেওয়া, চলতি ঋণের সুদ মওকুফ করে দেওয়া, যাকেতাকে ঋণ দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। পরিচালকদের দুই পক্ষের বিরোধে চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ইচ্ছেমাফিক ব্যাংক চলছে। এতে ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি ছাড়াও ব্যাবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যাংক। পরিচালকেরা সভায় উপস্থিত না থাকলে তা ব্যাংক পরিচালনার জন্য সহায়ক নয় বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়।

ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ নিয়েও চলছে লড়াই। কে হবেন পরবর্তী চেয়ারম্যান—এ নিয়ে আগে থেকেই দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ পেয়েছে। এরই মধ্যে ব্লক মাকের্টে বড় অঙ্কের শেয়ার কেনার ঘটনা ঘটেছে। পরিচালক হওয়ার নিয়ম অনুযায়ী ২ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ব্লক মার্কেটে ২ শতাংশের বেশি শেয়ার কিনে নিতে বিনিয়োগ হয়েছে ৪০ কোটি ৫৬ লাখ টাকার মতো। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান আইসিবির কাছ থেকে এই শেয়ার কেনা হয়েছে।

নানা অনিয়ম ও জালিয়াতি :

বেসরকারি খাতের সাউথইস্ট ব্যাংক নানা অনিয়ম ও জালিয়াতিতে জড়িয়ে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত প্রণোদনার অর্থ নয়-ছয় থেকে শুরু করে রপ্তানি তহবিলের অর্থও অন্য কাজে ব্যবহারের মতো কাজ করেছে এই ব্যাংক। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে একই ব্যক্তি থাকায় অন্য পরিচালকেরা রীতিমতো হতাশ। ফলে সভায় উপস্থিত না হওয়াই নিয়মে পরিণত হয়েছে অনেক পরিচালকের। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশদ পরিদর্শন প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

সাউথইস্ট ব্যাংকের বিনিয়োগ, ঋণ ও অগ্রিম, স্থায়ী সম্পদ ও অন্যান্য সম্পদের হিসাবে গরমিল পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দল; যেখানে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের বিভিন্ন বুকস অব অ্যাকাউন্টস ও সংশ্লিষ্ট নথি, রেকর্ড পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ব্যাংকের সার্বিক আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনা করা হয়েছে। ব্যাংকটির অন্যান্য শাখায় পরিদর্শন করলে আরো খারাপ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যাংকের মোট সম্পদ রয়েছে ৪২ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জনগণের আমানতের পরিমাণ ৩৪ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট সম্পদ বা দায়ের প্রায় সাড়ে ৮১ শতাংশ। অন্যদিকে ঋণ ও অগ্রিম রয়েছে ২৯ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা, যা দুই বছর আগের চেয়ে ১৫ শতাংশ বেড়েছে। আগের দুই বছরের চেয়ে মূলধন ৬৫ টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৮১১ কোটি টাকায়। অন্যদিকে গত বছরের জুন শেষে ব্যাংকের নিট মুনাফা, রিটার্ন অন অ্যাসেটস (আরওএ) এবং রিটার্ন অন ইক্যুইটি (আরওই) আগের দুই বছরের তুলনায় কমে গেছে। শ্রেণীকৃত ঋণ হিসাবায়নের ক্ষেত্রে তা সঠিকভাবে করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

জাল-জালিয়াতির উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে এসেছে যে, ব্যাংকের রংপুর শাখায় এক গ্রাহকের পে-অর্ডারের ১৫ লাখ টাকা সংশ্লিষ্ট হিসাবে জমা দেওয়া হয়নি। এর পরিবর্তে ঐ টাকা আত্মসাত্ করেছেন ব্যাংকের কর্মকর্তা। গ্রাহক স্বার্থ ক্ষুণ্ন এবং এত বড় জালিয়াতি করার পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ১৭টি ফোর্সড লোনকে একটি টার্ম লোনে রূপান্তর করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আর ঐ টার্মলোন মূলত পুনঃতপশিল করা হয়েছে। আরেক প্রতিষ্ঠানকে বিলাসবহুল গাড়ি কেনার জন্য চার বছর মেয়াদি ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা গাড়ির ঋণ দেওয়া হয়েছে, যা উত্পাদনশীল খাতে না দিয়ে অনুত্পাদশীল খাতে দেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকের গুলশান শাখার দুই গ্রাহকের ব্যক্তিগত ক্রেডিট কার্ডের বিল দেওয়া হয়েছে রপ্তানি প্রত্যাবাসন কোটা (ইআরকিউ) অ্যাকাউন্টের অর্থ থেকে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার পরিপন্থি। বিভিন্ন ক্রেতা বা আমদানীকারকের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিপত্রে বর্ণিত পণ্যের তালিকায় শুধু তারিখ, পরিমাণ ও মূল্য পরিবর্তন করে ‘অ্যামেন্ডমেন্ড’ উল্লেখ করে চুক্তিপত্রের বিপরীতে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ও ইডিএফ সুবিধা গ্রহণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে কীভাবে কী করা হয়েছে তার ব্যাখ্যা দিতে পারেনি ব্যাংক। এছাড়া মনোনীত প্রতিনিধি ও রপ্তানিকারকের মূল স্বাক্ষর চুক্তিপত্রে পাওয়া যায়নি।

ব্যাংকের স্থায়ী সম্পদ, অগ্নি, মোটরযানসহ বিভিন্ন খাতের বিমা-সুবিধা নেওয়া হয়েছে এশিয়া ইনসিওরেন্স লিমিটেড থেকে। কোন বিমা কোম্পানি থেকে এই সুবিধা নেওয়া হবে, তার জন্য টেন্ডারের ভিত্তিতে তালিকভুক্ত করার কথা থাকলেও এর কিছুই করা হয়নি। এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই ব্যাংকের একাধিক পরিচালক এশিয়া ইনসিওরেন্সের পরিচালক। এছাড়া শেয়ার ক্রয় সুবাদে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ঐ ইনসিওরেন্সের মনোনীত পরিচালক (বর্তমানে উপদেষ্টা)। ফলে ঐ ইনসিওরেন্স কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার বিষয়ে নিয়মকানুনের কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি।

সরকারঘোষিত প্রণোদনার অর্থ বণ্টনেও অনিয়ম দেখা গেছে। এক প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের মে মাসের বেতন দেওয়ার সময় একই ফোন নম্বরে এপ্রিল মাসে ৭ হাজার ৯১৬ টাকা বেতন দেওয়া হলেও মে মাসে দেওয়া হয়েছে ৩৪ হাজর ৬৭৬ টাকা, যা প্রাপ্ত বেতনের চেয়ে ২৬ হাজার ৭৬০ টাকা বেশি। নিয়োগের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ছয় মাসে ৪৭ জন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের অনেকের ব্যক্তিগত তথ্য হালনাগাদ করা হয়নি। আর অভিজ্ঞ কর্মকর্তা যারা অন্য ব্যাংক থেকে এসেছেন, তাদের অনেকের ছাড়পত্র ব্যক্তিগত ফাইলে নেই। সূত্র আরো জানায়, ব্যাংকের চেয়ারম্যান তার এক আত্মীয়কে ঋণ দিয়ে সেখানে চলতি ঋণের সুদ বাবদ ৫৪ কোটি টাকা মওকুফ করে দিয়েছেন।