বই মানুষের আত্মার আত্মীয়

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:৪৫

উত্কৃষ্ট গ্রন্থ মানুষের আনন্দ ও প্রকৃত সুখ দান করে। মানুষের উন্নততর বৃত্তিগুলো চায় সত্য, জ্ঞান ও আনন্দের আলো। জ্ঞান ও শিল্প সাধনা মানুষকে পশুত্বের স্তর থেকে নিয়ে যায় ঊর্ধ্বালোকে। অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের মধ্যেও সেতু গড়ে তোলে মানুষের লেখা বই। তারই মধ্যে অমর হয়ে থাকে মানুষের আত্মার শাশ্বত জ্যোতি। গ্রন্থের আনন্দের সূত্র ধরে মানুষ অগ্রসর হয়ে চলে সভ্যতা ও সংস্কৃতির পথে। আমাদের বৃহত্তর জীবনের আনন্দময় যাত্রাপথের প্রধান পাথেয় গ্রন্থরাজি। কত মানুয়ের চলার পদচিহ্ন পড়েছে পৃথিবীর বুকে। তার ছন্দকে ধরে রেখেছে এই বই। কত ভাষায় মানুষ কথা বলেছে- সে কথার সংগীতধ্বনি চিহ্নিত আছে বইয়ের অক্ষরে। বিচিত্র মানুষের বিচিত্র হূদয়ের অনুরণন মর্মরিত হচ্ছে গ্রন্থরাজির পাতায় পাতায়। মানুষের মন সেই আনন্দরাজির অন্তঃপুরে প্রবেশ করে সীমাহীন আনন্দ লাভ করে।

একুশে বই মেলা আমাদের জনসাধারণের মধ্যে একটি রুচি ও সাহিত্য-সাংস্কৃতিক মানসিকতার সৃষ্টি করে। দিন দিন বইমেলার পরিসর বড় হচ্ছে। মেলা দৃষ্টিনন্দন হচ্ছে। স্টলবিন্যাস, সাজানো সব কিছুতে অপূর্ব ছন্দ পরিলক্ষিত হচ্ছে। এছাড়া বইয়ের প্রচ্ছদে প্রযুক্তির ছোঁয়া যা সত্যিই মনোরম। একুশের মেলা উপলক্ষে দেশের প্রধান লেখক ও সাহিত্যিকদের গ্রন্থের পাশাপাশি নবীন লেখক-কবিরাও স্ব-স্ব গ্রন্থ প্রকাশের উত্সাহ লাভ করে থাকেন এবং প্রকাশকরাও উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছেন। এর ফলে বহু নতুন বই প্রকাশিত হচ্ছে। যা আমাদের সবার জন্য সুখকর ও মঙ্গলজনক। একুশের মেলা প্রবর্তন হওয়ায় দেশে পাঠকদের বই পড়ার ব্যাপক অভ্যাস এবং বই কেনার প্রতি মানুষের ঝোঁক গড়ে উঠেছে। একুশের বইমেলা কেবল একটি বইমেলা নয়, এটি এখন জাতীয় চেতনায় অঙ্গীভূত হয়ে উঠছে। অমর একুশের এই বইমেলার তিনটি উপযোগিতার কথা উল্লেখ করা যায়—(ক) একুশের বইমেলাকে উপলক্ষ করে সারা বছরে প্রকাশিত, বিশেষভাবে মেলার জন্য প্রকাশিত বইসহ নানা ধরনের বইয়ের একত্রে উপস্থাপন সম্ভব। আগ্রহী পাঠকের সামনে কাঙ্ক্ষিত গ্রন্থ তুলে ধরায় পাঠক ও প্রকাশক উভয়ই লাভবান হচ্ছে; (খ) একুশের বইমেলা উপলক্ষে অপেক্ষাকৃত সস্তা দামে বই কেনার একটা সুযোগ পাওয়া যায় ; (গ) কোন্ বিষয়ে, কোথায় কার কোন্ লেখকের নতুন লেখা প্রকাশিত হয়েছে, এর অনুসন্ধানের উত্সভূমি এই বইমেলা।

বই মানুষের এক অন্তহীন কল্যাণ ও আনন্দময় জগতের সন্ধান দেয়। কাজের পথে বিচরণ করেও পরমানন্দ লাভ করার অবলম্বন হলো বই। যুগ যুগ ধরে মানুষের সর্বোত্তম চিন্তা-ভাবনা, ধ্যান-ধারণা বইয়ে সংগৃহীত হয়ে আছে। এই বইয়ের সান্নিধ্যে এসে মানুষ নিজের হূদয়ের প্রসার ঘটায়, লাভ করে এই উন্নত জীবনের আনন্দময় স্পর্শ। সেজন্য বই হচ্ছে মানুষের জীবনের নিত্যসঙ্গী। বই মানুষের আত্মার আত্মীয়। তাই বইকে সংসারের একটি অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রী হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বই কিনলে একদিন পারিবারিক গ্রন্থাগার গড়ে উঠবে এবং পরিবারের সব সদস্যের জন্য তা একটা আনন্দের উত্স হয়ে উঠবে। পরিণামে বইয়ের সঙ্গে যে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠবে তা ব্যক্তি ও জাতির জীবনে সীমাহীন কল্যাণ বয়ে আনবে।

মহান ভাষা আন্দোলনের স্মরণে বাংলা একাডেমি একুশের বইমেলার আয়োজন করে থাকে। একুশে বইমেলাকে উপলক্ষ করে এদেশের বহুসংখ্যক প্রকাশক, ক্রেতা, দর্শক ও পাঠকের একত্রে সমাবেশ ঘটে এবং মাত্র অল্পদিনের জন্যে হলেও একটা সাহিত্য-সাংস্কৃতিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। যা দেশ ও জাতির মন-মানসিকতার জন্য যথেষ্ট উপকারী। এছাড়া সাহিত্যিক, লেখক, সাংস্কৃতিক কর্মী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকসহ নানা স্তরের মানুষ এ বইমেলায় আসে। তবে শিশু, তরুণ ছাত্র-ছাত্রীদের ভিড়ই অধিক লক্ষ করা যায়। 

বই মানুষের প্রিয় সঙ্গী। আনন্দের আরেক নাম বই। বই জ্ঞানের বিশাল ভান্ডার। জ্ঞান আর আনন্দ এই দুইয়ের অভাব সম্পূর্ণভাবে পূরণ করে বই মানুষকে পরিপূর্ণ করে তোলে। বই পড়ায় মানুষের মনের আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে এক নতুন অনুভূতি জন্ম দেয়। ফলে মানুষ সুন্দরকে উপলব্ধি করতে পারে। পৃথিবীর অন্য বইমেলার সঙ্গে আমাদের অমর একুশে বইমেলার কোনো তুলনা হয় না। কারণ, সেই মেলাগুলো শুধুই বাণিজ্যিক। কিন্তু অমর একুশে বইমেলায় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। এই মেলা শুধু বই কেনা-বেচার মেলা নয়। আমাদের চেতনা জাগরণের মেলা। আমাদের মনোজগত্ রাঙিয়ে দেওয়া এই মেলা। মেলার আয়োজনে মানুষ নতুন প্রেরণা ও উত্সাহ লাভ করে। তাই দুঃখ-বেদনার মুহূর্তে, মানসিক অশান্তিতে, নিঃসঙ্গতায় বই হয় মানুষের একান্ত সাথী। তাই কবির ভাষায় বলতে চাই :রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে/ প্রিয়ার কালো চোখ বিবর্ণ হয়ে যাবে/কিন্তু বই অনন্ত যৌবনা/বই থাকবে চিরদিন।

n লেখক :ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার,

 সোনালী ব্যাংক লিমিটেড