দেশি বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে কিছু কথা

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২১, ২১:৩০

দেশের অন্যতম প্রাচীন ও শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকে সম্প্রতি অর্থনৈতিক বিষয়ক একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। লেখাটি সুলিখিত কিন্তু অবেগপ্রবণ ও বাস্তবতাবিবর্জিত। বিশেষ করে, লেখক দেশের বিদ্যমান বিনিয়োগ নিয়ে কিছু কথা বলেছেন যা অগ্রহণযোগ্য। তাই এ ব্যাপারে কিছু বলার আবশ্যকতা অনুভব করছি। লেখক লিখেছেন, যেসব তরুণ সব সময় বিদেশে যাওয়ার জন্য উদ্গ্রীব ও স্বপ্ন দেখতেন কর্মের জন্য, তারা আজ নিজেরাই বিভিন্ন ব্যাংক থেকে জামানতবিহীন ঋণ নিয়ে ব্যবসায়ী হচ্ছেন। অথচ এই বক্তব্যের অনুকূলে কোনো পরিসংখ্যান দেননি। ব্যাংক থেকে কতজন তরুণ জামানতবিহীন ঋণ নিয়ে উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী হয়েছেন সে প্রশ্ন উত্থাপন করা যেতেই পারে। আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার হিসেবে জানি, ট্র্যাডিশনাল ব্যাংক থেকে একজন তরুণের জামানতবিহীন ঋণ পাওয়ার সুযোগ কতটা সীমিত। ব্যাংকারদের মনোভাব এখনো জামানতবিহীন ঋণ দানের অনুকূলে নয়। যারা জামানাতবিহীন ঋণের জন্য আবেদন করেন ব্যাংকারদের বেশির ভাগই তাদের অক্ষম উদ্যোক্তা বলেই মনে করেন। তারা ভাবেন এদের ঋণ দেওয়া হলে সেই ঋণের কিস্তি আদায়ে অসুবিধা হবে। তাই যতটা পারা যায় তাদের নিরুত্সাহিত করা হয়।

তিনি আরো লিখেছেন, বিদেশ থেকে গত ২০ বছরে যে পরিমাণ মেশিন ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে তার চেয়ে দ্বিগুণ আমদানি হয়েছে গত তিন বছরে। এই বক্তব্যের অনুকূলেও তিনি কোনো তথ্য বা পরিসংখ্যান দেননি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার অনুভূত হবে যে, গত তিন বছরে, যার অর্ধেকটাই কেটেছে করোনা সংক্রমণের মধ্যে শিল্পে ব্যবহার্য ক্যাপিটাল মেশিনারিজ এবং কাঁচামাল আমদানি কতটা কমে গেছে। শুধু গত তিন বছরই নয়, গত প্রায় এক যুগ ধরে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। কোনোভাবেই ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের অনুপাত জিডিপির ২২/২৩ শতাংশের ওপর উন্নীত করা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকালে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার জিডিপির ২৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল। সরকারি খাতে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কিন্তু এটা স্বীকৃত যে, সরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি মানেই দুর্নীতির বিস্তার আরো কিছুটা বেড়ে যাওয়া। গত এপ্রিল মাসের শেষে দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে বিনিয়োগযোগ্য উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা। ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার এখন ৯ শতাংশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরো কমে ৭ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে কিন্তু তার পরও সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তারা ঋণ নিতে আগ্রহী হচ্ছেন না। ২০২০-২০২১ অর্থবছরের জন্য বাস্তবায়িত বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে ব্যাংক ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। বছর শেষে এক্ষেত্রে অর্জিত হয়েছে মাত্র ৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ। তাহলে কি দেশের উদ্যোক্তাদের ব্যাংক ঋণের প্রয়োজন শেষ হয়ে গেছে? দেশে কার্যকর অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশের অনুপস্থিতির কারণে উদ্যোক্তাদের অনেকেই নতুন করে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধান্বিত। বিশ্বব্যাপী প্রত্যেকটি দেশের অভ্যন্তরীণ ভোগ-চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। ফলে পণ্য ও সেবা উত্পাদন করলেই আগের মতো তা রপ্তানি করা যাবে সেটা নাও হতে পারে। তাই পণ্য উত্পাদকগণ ‘ধীরে চলো নীতি’ অনুসরণ করছেন। অনেকেই তাদের প্রকল্পের উত্পাদন কমিয়ে দিয়েছেন।

স্বাভাবিক বিনিয়োগ পরিবেশ না থাকলে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয় না। দেশে যদি বেকার সমস্যা সহনীয় পর্যায়ে থাকত, তাহলে কি তারা বিদেশে যাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকত? তিনি উল্লেখ করেছেন, দেশে বর্তমানে যে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়ের বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করছে তা অতীতে কখনোই ছিল না। তাই তিনি বিদেশে ভালো কাজের সুযোগ পেয়েও দেশে ফিরে এসেছেন বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য। কেউ তার ব্যক্তিগত কারণে বিদেশ থেকে ফিরে আসতে পারেন কিন্তু তা দিয়ে এটা প্রমাণিত হয় না যে, দেশে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করছে। একটি দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ পরিমাপ করার সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হচ্ছে ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচকে দেশটির অবস্থান নির্ণয় করা। ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়? জাতিসংঘের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচক দেখেই বিদেশি উদ্যোক্তারা একটি দেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. মীর্জ্জা এ বি আজিজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘গত প্রায় ১০ বছর ধরে দেশে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার জিডিপির ২২ থেকে ২৩ শতাংশে সীমিত রয়েছে। অর্থমন্ত্রী নিজেও তার বাজেট বক্তৃতায় ইজ অব ডুয়িং বিজনেস উন্নয়নের কথা বলেছেন। সরকার এক্ষেত্রে কিছু কিছু চেষ্টাও করছেন। কিন্তু ফলাফল খুব একটা ইতিবাচক নয়। আমাদের সামনে অনেক লম্বা রাস্তা। আমাদের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। ২০১৭ সালে ইজ অব ডুয়িং বিজনেসে আমাদের অবস্থান ছিল ১৭৭। অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়ে ২০১৯ সালে ১৬৮তে অবস্থান করে। তার অর্থ হচ্ছে এখনো আমাদের ওপরে অবস্থান করছে ১৬৬টি দেশ।’ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটির সাবেক (বিডা) নির্বাহী পরিচালক বলেছিলেন, ২০২১ সালের মধ্যে ইজ অব ডুয়িং বিজনেস সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ডাবল ডিজিটে অর্থাত্ ১০০-এর নিচে নামিয়ে আনা হবে। কিন্তু তিনি দায়িত্ব ত্যাগের আগে স্বীকার করেছেন বর্তমান পরিস্থিতিতে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। কোনো দেশের মোট জসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ যখন ১৫ থেকে ৬০ বছর বয়সি হয় তখন সেই অবস্থাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলা হয়। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এটাই শ্রেষ্ঠ সময়। যারা এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে না, তারা আর কখনো উন্নতিও অর্জন করতে পারে না। রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা যায় না। বাংলাদেশ যে অর্থনৈতিক উন্নতি অর্জন করছে তার পেছনে রয়েছে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার অবদান। এই অবস্থা ২০৩০-২০৩৫ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। তারপর বাংলাদেশ আবারও উন্নয়নের দৌড়ে পিছিয়ে পড়তে শুরু করবে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়নের একটি পর্যায়ে অবস্থান করছে। উন্নয়নের সুবর্ণ সুযোগ আমরা হেলায় পার করছি। কিন্তু একে জাতীয় স্বার্থে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানোর কোনো উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত সৃজনশীল ক্ষমতার অধিকারী। তারা প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে যে কোনো অসাধ্য সাধন করতে পারে। কিন্তু তারা নিজেদের সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ পাচ্ছে না। উত্পাদনের সুফল সাধারণ মানুষ ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভোগ করতে পারছে না। ফলে বিত্তবান-বিত্তহীনের মধ্যে সৃষ্ট বৈষম্য ক্রমশ বাড়ছে। গিনি সহগ অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিত্তবান-বিত্তহীনের মধ্যে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বৈষম্য বর্তমানে চরম পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পরও এই ব্যবধান ছিল অনেকটাই সহনীয় পর্যায়ে।

বাংলাদেশে বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ নেই বলেই প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে। কোনোভাবেই এই অর্থ পাচার থামানো যাচ্ছে না। স্থানীয়ভাবে কার্যকর বিনিয়োগে অনুকূল পরিবেশ থাকলে মানুষ অর্থপাচার কেন করবে?

n লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক