সম্পর্ক এখন মরা নদী কিংবা ধুধু মরুভূমি

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২১, ২১:৩০

আত্মীয়তা ও বন্ধুত্বের সম্পর্কের মধ্যে আজ যেন নেই কোনো গভীরতা। মানুষে মানুষের সম্পর্ক, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব থাকলেও একে অপরের প্রয়োজনে সেই সম্পর্কের গভীরতা যেন ক্রমেই হারাচ্ছে তার নাব্য। অথচ সম্পর্কের মধ্যেই তৈরি হয় পারস্পরিক প্রাপ্তির আশা-আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু প্রয়োজনে সেই আশা-আকাঙ্ক্ষা কখনো হয় গুড়ে বালি, সম্পর্ক ধারণ করে তার ভার্চুয়াল রূপ, বাস্তবে প্রাপ্তির খাতার পাতাগুলো বেশির ভাগই থেকে যায় ফাঁকা। একটা সময় ছিল, যখন মানুষের এত সম্পদ, টাকাপয়সা ছিল না, কিন্তু তাদের মধ্যে একে অপরের সম্পর্কের গভীরতা ছিল অনেক বেশি। বন্ধুত্বের সংখ্যা ছিল সীমিত, কিন্তু আজ গাণিতিক সংখ্যায় পরিচিতি বাড়লেও অতীতের স্বল্পসংখ্যক আত্মীয়-বন্ধুই ছিল প্রকৃত বন্ধু, পরোপকারী। হাইব্রিড যুগে মানুষের মন ও মননে যেন হাইব্রিড চিন্তা, সম্পর্কে স্বাদ নেই, পুষ্টি নেই, তৃপ্তি নেই। বন্ধু ও পরিচিত জনের কাছে যে প্রত্যাশা থাকে তা এখন আর পূরণ হয় না, প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মঝে থাকে বিস্তর ফারাক। সম্পর্ক যেন সৌজন্যতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, প্রয়োজনের মুহূর্তে চেহারায় রং বদলায়। নদী শুকিয়ে যায় ধীরে ধীরে পলি পড়ে; কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সম্পর্কের গভীরতা যেন দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে অপ্রাপ্তিতে। মনোবিজ্ঞানীরা যদি একটু সামনে এগিয়ে না আসেন তাহলে তো ভবিষ্যতে সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাবে, মানুষ হবে সঙ্গীহীন। যদি চেনা মানুষের কাছে প্রয়োজনে সহযোগিতা পাওয়া না যায় তাহলে সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা কি? অথচ সকল সম্পর্কের মাঝে প্রত্যাশা থাকে, যে প্রত্যাশা সহযোগিতা, সহমর্মিতা, বিপদে একে অপরকে পাশে পাওয়া।

মানুষ ছুটছে, অবিরাম ছুটছে, ব্যস্ততা তাদের ভাবতে দেয় না। সম্পর্কের মধুরতা, প্রশান্তি, নির্মলতা এগুলো যেন আর কারো ভাবনায় নেই। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে পৃথক পরিবার হয়েছে বহুকাল আগে। পৃথক পরিবারে একসময় অনেক সদস্য থাকলেও আজ তা ছোট হয়ে আসছে। এই ছোট পরিবারের প্রয়োজনীয়তাও ছোট; কিন্তু এদের জন্য সম্পদ গড়তে গিয়ে অনেকের কর্মব্যস্ততা, অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা, সহযোগিতা প্রদান এবং সহমর্মিতা দেখানোর সময় থাকে না, এমনকি অনেকের এ বিষয়গুলো ভাবনায়ও আসে না।

তার পরও সম্পর্ক টিকে আছে, থাকবে, তবে স্বার্থপরের মতো একা একা বড় হতে গেলে এই সম্পর্কের গভীরতা একসময় হয়ে পড়ে নাব্যহীন নদীর মতো। কোনো সংকটময় মুহূর্তে কারো আর্থিক সাহায্যের জন্য সামর্থ্য না থাকলেও অন্তত যা কিছু আছে তা দিয়ে সাহায্য করা উচিত, তাও না পারা গেলে, অন্তত মানসিক-মানবিক সাহায্য সহযোগিতা দেওয়া, বিপদে পাশে দাঁড়ানো একান্ত কর্তব্য। মানুষের এই অনুভূতিগুলো ভোঁতা হয়ে গেলে সমাজের সংজ্ঞাই পালটে যাবে। এমন আধুনিকতা সত্যিই কাম্য নয়, যা পারস্পরিক সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তাকে তুচ্ছ করে, বাস্তবের চেয়ে স্বপ্ন অথবা ভার্চুয়াল জগেক বিস্তৃত করে। নানাভাবে মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে; আগে কাজ শেষে আড্ডা ছিল, স্কুল শেষে মাঠে খেলাধুলা ছিল, রাত্রিতে পড়াশোনার পাশাপাশি বিনোদন যাত্রাপালা-গান-কনসার্ট ছিল; এখন আর তা নেই। এখন কাজ শেষে বাসায় এসে মোবাইলে অফিস-ব্যবসা, স্কুল শেষে চার-ছয় ইঞ্চি মোবাইল ফোনে খেলা। এই ভার্চুয়াল জগতের ব্যস্ততা এতটাই বিশাল, এক মোবাইল ফোনে পার করা যায় সারাটা দিন। আত্মীয়-বন্ধু, আপনজনদের কথা মাঝেমধ্যে মনে হলেও খোঁজ নেওয়ার সময় নেই, তাদের কোনো অনুরোধ পেলেও সহসা ভুলে যায়। একান্ত নিজ পরিবারের না হলে, কেউ তেমন উপকার করে না, অনুরোধ রাখে না। এভাবেই দেখা যায়, একজনকে একাধিকবার একই অনুরোধ করতে হয়, পেছনে লেগে থাকতে হয়, তোষামোদ করতে হয়। মনে হয় যেন তার কোনো দায়বদ্ধতা নেই, দায়িত্ববোধ নেই। কথা দিয়ে কথা রাখতে হবে এই বাস্তবতা এখন অনেকটাই কল্পনাতীত; বরং কথার বরখেলাপই চরম বাস্তবতা। আশ্বাস আছে কিন্তু বিশ্বাস ও ভরসা নেই, আপনজনের কাছে উপকার পেতেওা কখনো টাকা লেনদেন ছাড়া উপায় নেই। তাই ‘আপন’-এর সংজ্ঞাটি আবার নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার অবকাশ রয়েছে।

দীর্ঘ দিন যাবত্ করোনা মহামারির মধ্যে মানুষ যেন আরো বেশি ভাবলেশ/অনুভূতিহীন হয়ে পড়ছে। চারদিকে হঠাত্ হঠাত্ আপনজনদের বিয়োগান্তর, তারা যেন শোককেও এখন স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছে। মৃত্যুর মিছিল দেখে দেখে যেন পাষাণ হয়ে যাচ্ছে। একদিকে চাকরিহারা, বেকারত্ব, ব্যবসায় মন্দা, ব্যবসায় গুটিয়ে নেওয়া, অর্থনৈতিক ক্ষতি, অন্যদিকে জীবনযাত্রায় ছন্দপতন, শিক্ষার স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা নষ্ট। করোনার আগে যাদের যে পরিমাণ আয়-রোজগার ছিল, চাকরি ছিল, ব্যবসায় ছিল, আজ তা নেই। তাই চারদিকে হতাশা মানুষকে গ্রাস করেছে, কেউ কেউ ভুগছে মানসিক রোগে, শোকে, আতঙ্কে। কারো কারো কাছে সম্পর্কের মায়া এখন প্রায় তুচ্ছ, নিজের বেঁচে থাকাই যেন দায়।

তবে সম্পর্ক থাকলেই যে সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, তাও আশা করা ভুল; পরিচিতিই প্রাপ্তির জন্য সবকিছু নয়, সম্পর্কের গভীরতাও বিবেচ্য। তবে যার সঙ্গে সম্পর্ক আছে তার জন্য চেষ্টা এবং আন্তরিকতার কমতি থাকতে নেই। বর্তমান সমাজে সবাই যেন কেমন নিয়ম রক্ষার সম্পর্ক বজায় রাখছে; কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, আশ্বাসেই আটকে যায় সকল কিছু। যে চেনা মানুষ একসময় আপন ছিল প্রয়োজনের সময় তিনিই হয়ে ওঠেন অচেনা। প্রত্যাশার যেমন রয়েছে বহু ধরন, আশ্বাসেরও আছে ভিন্ন ভিন্ন রূপ। কেউ মুখে বলে বাস্তবে করে না; কেউ প্রথমেই না করে দেয় কারো সম্পর্ক দেওয়া-নেওয়ার, যার কাছে কিছু পাবে তাকেই শুধু দেবে, অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও তারা গুরুত্বহীন। যে গুরুত্বহীন তার সঙ্গে সম্পর্ক শুধু লৌকিকতা; কিন্তু সেই সম্পর্ক প্রত্যাশা পূরণে কিংবা কিছু পাওয়ার জন্য নয়। এই মানসিক অবস্থার ব্যাপকতা আগে এতটা ছিল না। যখনই প্রত্যাশিত ব্যক্তি বাস্তবের মুখোমুখি হয়, তখনই তার পুষে রাখা ধারণা বদলে যায়, দুঃখ পায়। একা একা বড় হওয়া আজ যেন বাস্তবতা। সামাজিক বন্ধন, সম্পর্কগুলো আজ যেন বালুর টিলা। আগে কেউ উপকার চাইলে তার জন্য চেষ্টা করা হতো, না পারলে যিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি প্রত্যাশিত ব্যক্তিকে ডেকে সান্ত্বনা দিতেন, সেই সৌজন্যতা আজ আর নেই। এ যেন শিশুর ডায়ালগ ‘কেয়ার করলাম না’। দিনে দিনে কেয়ার না করতে করতে মানুষে মানুষের সম্পর্কের গভীরতা হারাচ্ছে তার নাব্য। নাব্যহীন নদীর ভাঙন যেমন তীব্র, তেমনি প্রতিনিয়ত ড্রেজিং না করলে পলি পড়ে একটা সময় পরিণত হয় মরা নদী কিংবা ধুধু মরুভূমি। সম্পর্কের মাঝেও প্রত্যাশা-প্রাপ্তি না থাকলে সে সম্পর্ক গভীরতা হারায়, ধীরে ধীরে মরে যায়।

n লেখক :প্রাক্তন অধ্যক্ষ, ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, জাহানাবাদ, খুলনা