বিশ্বব্যাপী প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ এখনো চলমান। মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। এই দুঃসময়কে সঙ্গী করেই বছর ঘুরে আবার দুয়ারে কড়া নাড়ছে আনন্দের উত্সব ঈদ। ধনী-গরিব আর উঁচু-নিচুর ভেদাভেদ ভুলে পরিবার-আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে খুশির আয়োজনে মেতে ওঠার দিন এটি; কিন্তু গত দেড় বছর ধরে মহামারির দাপটে ঈদের এক ভিন্ন চিত্র দেখছে বিশ্ববাসী। গতবারের মতো এবারও ঈদের কাঙ্ক্ষিত আনন্দ উদ্যাপনের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা বিরাজ করছে। গত বছর ঈদুল ফিতরের আনন্দোত্সব ম্লান হয়েছিল কোভিড-১৯-এর প্রথম ঢেউয়ে, আর এবার সেই ঈদের উত্সাহ-উদ্দীপনায় ভাটা পড়েছে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ে। দেখতে দেখতে প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেছে। তবে মহামারি থামেনি। জনপদে তাই ফেরেনি স্বস্তি। জনজীবন হয়নি স্বাভাবিক। সামনে ঈদ কিন্তু কোথাও কেন জানি ঈদের সে আনন্দ নেই।
বিশ্বের অনেক দেশেই লকডাউনের মাধ্যমে সংক্রমণের তীব্রতা কমানো গেলেও বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থা ও খেটে খাওয়া মানুষের কথা বিবেচনায় সরকারের পক্ষ থেকে অনেক সময় লকডাউন শিথিল করা হয়েছে। ফলে সংক্রমণের মাত্রা একেবারে বন্ধ করা যায়নি। লকডাউনের কড়াকড়িতে মানুষের চলাচল সীমিত থাকলেও ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে ও নিম্ন আয়ের মানুষের কথা বিবেচনা করে আবারও লকডাউন তুলে দেওয়া হয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশের লোকজনের মধ্যে ভীতি এখন আগের মতো নেই। ফলে লকডাউন শিথিলতার সুযোগে গ্রামের বাড়িতে পা বাড়াচ্ছেন বেশির ভাগ মানুষ। সরকারি নিষেধাজ্ঞা, আন্তঃজেলা গণপরিবহনের অভাব ও করোনার ভয়—কোনো কিছুই ঈদযাত্রা থামিয়ে মানুষকে বিরত রাখতে পারছে না। অনেকক্ষেত্রে সংক্রমণের তীব্রতা ঠেকাতে লকডাউনের অংশ হিসেবে দূরপাল্লার সব ধরনের বাস, ট্রেন এবং লঞ্চ সার্ভিস বন্ধ করে দেওয়া হলেও ব্যক্তিগত গাড়ির দৌরাত্ম্য থামানো যায়নি। এতে করে উচ্চবিত্তের জন্য ঈদযাত্রা সহজ হলেও নিম্নবিত্তকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষ বাস, পিকআপ ভ্যান, ট্রাক এমনকি অ্যাম্বুলেন্সে করে যে যেভাবে পারে ঢাকা ত্যাগ করার অপ্রাণ চেষ্টা করেছে। গণমাধ্যমের অনেক জায়গায় তাদের এই বাড়ি ফেরাকে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপিত হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ঈদে গ্রামে যাওয়া আসলে কী অর্থ বহন করে গ্রাম থেকে জীবিকার খোঁজে নগরে আসা মানুষের কাছে? এর সরাসরি উত্তর নেই এই শ্রেণির মানুষের কাছে। নগরের সিংহভাগ মানুষ জীবিকার তাগিদে গ্রাম থেকে অভিবাসিত। ইট-কংক্রিটের দেওয়ালে আচ্ছাদিত বিশাল বিশাল অট্টালিকার এই শহর তাদের আপন করে নিতে পারেনি। ফলে ব্যক্তিগত জীবনে সামাজিক শেকড়ে যুক্ত থাকাটা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এসব মানুষকে ভালোবাসার বন্ধনে আটকে রাখার কোনো ক্ষমতা কি এ নিষ্ঠুর, নির্দয় এবং কংক্রিটের শহরের আছে? তাদের কাছে মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন যেখানে আছে সেটিই আপন নীড়, নিজের আবাসস্থল! তাই মানুষ করোনার ভয়, সরকারঘোষিত লকডাউন, গণপরিবহনের অভাব কিংবা জরিমানার ভয়—কোনো কিছুকেই তোয়াক্কা না করে ঢাকা ছেড়ে দেশের বাড়ি যাওয়ার আনন্দে ঈদযাত্রায় শামিল হয়েছে। শহুরে নাগরিক শিক্ষিত মধ্যবিত্তের চোখ দিয়ে দেখলে এসব মানুষের ঈদযাত্রাকে বোকামি মনে হতে পারে; কিন্তু এসব মানুষের দুর্দমনীয় আবেগ এবং ভালোবাসার উচ্চতা করোনা মহামারির মানদণ্ডে বিচার করলে তাদের নিখাদ আবেগ অনুধাবন করা যায় না। তাই করোনার ঝুঁকি নিয়ে ঈদযাত্রাকে আমরা নিরুত্সাহিত করি, সেটা ঠিক আছে কিন্তু ‘দেশের বাড়ি’ যাওয়ার যে তীব্র টান এবং অকৃত্রিম আবেগ, সেটাকে যেন আমরা কটাক্ষ না করি।
করোনার কারণে সামাজিক বা শারীরিক বিচ্ছিন্নতা বাড়লেও শেষ হয়ে যায়নি সৌহার্দ, সম্প্রীতি আর ভালোবাসার প্রগাঢ় বন্ধন। প্রতিবারই যেভাবে ঈদের আনন্দ পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে শহরের অসংখ্য মানুষ নাড়ির টানে ফিরে যায় যার যার নীড়ে; মহামারি-বিঘ্নিত সময়ে অনেকের পক্ষেই তা সম্ভব হবে না। তবু দূরে থেকেই মানুষ আনন্দে শামিল হবেন অন্তরে অন্তরে। এ ধরনের বিবর্ণ ঈদ মুসলমানরা উপভোগ করবে, তা ছিল কল্পনারও বাইরে; কিন্তু অতিমারিতে আমাদের সেই কঠিন বাস্তবতা মানতেই হবে। মহামারির কারণে অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে অনেকেই সংগ্রাম করছে টিকে থাকার। সেই দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হবে ঈদের প্রকৃত শিক্ষা। তাই করোনা অতিমারির এই দুঃসময়ে নিজের খুশি বিসর্জন দিয়ে করোনা সংকটে দুর্দশাগ্রস্তের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমেই সবাই মিলে এই সংকট মোকাবিলায় সচেষ্ট হতে পারি।
n লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
