কোভিড-১৯-এর তাণ্ডবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতিসহ সব খাতেই পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু পিছিয়ে নেই বাল্যবিবাহ। করোনাকালীন এই পরিস্থিতি যেন বাল্যবিবাহের স্বর্ণযুগ। গত সাত মাসে বাল্যবিবাহের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ হাজার। এক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে বরগুনা, নীলফামারী, উত্তরবঙ্গসহ বেশ কিছু অঞ্চল। যদিও অসংখ্য শিশু বিবাহ জরিপের আড়ালেই থেকে যায়। সূত্রমতে, বাংলাদেশে ৫৯ শতাংশ মেয়ের ১৮ আর ২২ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় ১৫ বছরের আগে। বাল্যবিবাহে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। কিন্তু করোনা মহামারির মধ্যে এদেশে ১৩ শতাংশ বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিগত ২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। জরিপে উঠে এসেছে, খাদ্যসংকট, হতদরিদ্র ও অনিশ্চিত শিক্ষাব্যবস্থা এর মূল হোতা। মহামারিতে পারিবারিক টানাপোড়েনে ছোট্ট মেয়েকে বিয়ে দিয়ে সংসারে জনসংখ্যার চাপ কমাচ্ছেন অনেক অভিভাবক। বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ও ঝুঁকির মুখে রয়েছে দুই শ্রেণির মানুষ। তারা হলো প্রান্তিক জনগণ ও শিক্ষার্থী।
ব্র্যাকের গবেষণায় স্পষ্ট হয়েছে, করোনাকালে অভিভাবকের কাজকর্ম না থাকায় ভবিষ্যত্ দুশ্চিন্তার কারণে ৮৫ শতাংশ, সন্তানের স্কুল খোলার অনিশ্চয়তায় ৭১ শতাংশ, করোনা মহামারি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কায় অনিরাপত্তাবোধের কারণে এবং বিদেশ থেকে আসা ছেলে হাতের কাছে পাওয়ায় ৬২ শতাংশ বেড়েছে বাল্যবিবাহ। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, লকডাউনে ঘরের মধ্যে পরিচিত মানুষের মাধ্যমে শিশুরা যৌন হয়রানির শিকার হওয়াও বাল্যবিবাহের অন্যতম কারণ। সেভ দ্য চিলড্রেনের গ্লোবাল রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ৫ লাখ মেয়ে বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে আছে, আর বাল্যবিবাহের শিকার ১০ লাখ মেয়ে সন্তানসম্ভবা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ২ লাখেরও বেশি মেয়ে বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে আছে, যার প্রভাব বাংলাদেশের জন্য অশুভ। করোনা মহামারির কারণে ২০২৫ সালে বাল্যবিবাহের সংখ্যা বেড়ে মোট ৬ কোটি ১০ লাখ পর্যন্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি।
বাল্যবিবাহ এভাবে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়াটা দেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটি অশুভ সংকেত। এতে বৃদ্ধি পাবে মাতৃমৃত্যুর হার, গর্ভপাত, শিশুমৃত্যুর হার, অপরিকল্পিত গর্ভধারণসহ নানান সমস্যা। এছাড়া দেশের নারীসমাজ দিনকে দিন পিছিয়ে পড়বে, অশিক্ষিত মা অশিক্ষিত জাতি উপহার দিয়ে যাবে, সমাজে বেড়ে যাবে নারী নির্যাতন, নারীর প্রতি সহিংসতা, লোপ পাবে নারীর ক্ষমতায়ন এবং দেশের উন্নয়নে নিষ্ক্রিয় রয়ে যাবে নারীসমাজ।
এখনই সময় বাল্যবিবাহের লাগাম টেনে ধরার। অন্যথায় আধুনিক যুগে এসেও পড়ে থাকতে হবে কয়েক যুগ পেছনে। এক্ষেত্রে প্রান্তিক জনগণের খাদ্যসংকট দূর করতে সরকারের বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার চাকা সচল করতে বিকল্প পথ উদ্ধারে কালক্ষেপণের সুযোগ নেই। এছাড়া সর্বস্তরের জনগণকে সচেতন করে তুলতে একযোগে কাজ করতে হবে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭-এর কঠোর বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
