ব্যাংকিং খাতে বিশৃঙ্খলার কিছু নজির এখনো ওপেন সিক্রেট। কোনো কোনো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা এমডির দাপটের কাছে অসহায় গ্রাহকেরা। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গেও তাদের দুর্ব্যবহার মারাত্মক। দাপটের নেপথ্যে রয়েছে খুঁটির জোর। ব্যাংকের তথাকথিত মালিক বলে যারা নিজেদের জাহির করেন, সেই উদ্যোক্তা পরিচালকদের প্রশ্রয়েই এমডির এত ক্ষমতা। কারণ, ব্যাংক এবং ব্যাংকের বাইরে নানা এজেন্ডা রয়েছে পরিচালকদের অনেকেরই। সেগুলো বাস্তবায়ন করা, প্রয়োজনে ম্যানেজ করার কাজটি যিনি করতে পারেন, নিয়োগের সময় সে বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়। এতে করে ‘মালিকপক্ষের’ কাছাকাছি থাকার সুবাদে অন্যদের ওপর দাপট দেখান।
সূত্রমতে, কোনো কোনো ব্যাংকের এমডি গ্রাহকভেদে সেবা দিয়ে থাকেন। কাউকে কাউকে তোয়াক্কাই করেন না। আবার কাউকে ইচ্ছেমাফিক সুদ মওকুফ করে দেন, সুদের হার কমিয়ে দেন। একই ব্যাংকে দুই রকম নিয়মে প্রকৃত উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ক্ষমতা পেয়ে কখনো কখনো ভুলেই যান যে তিনি ব্যাংকে চাকরি করেন মাত্র। এমন এমডিও রয়েছেন, নিজের ফ্লোরকে ব্যয়বহুল সজ্জিত করলেও অন্যদের বেলায় ঠিক বিপরীত চিত্র। যদিও এ ধরনের ক্ষমতাধর এমডিরা বেশি দিন টিকতে পারেন না। একপর্যায়ে সরে যেতে হয়।
কোনো কোনো এমডি রয়েছেন, যিনি নিজেকে ‘ভিনগ্রহের’ মানুষ ভাবেন। কেউ আছেন, যারা গ্রাহকদের সবাইকে ঋণসহায়তা দেন না। বাছাইকৃত কিছু নির্দিষ্ট গ্রাহককে ঋণসুবিধা দিয়ে থাকেন। ফলে ভোক্তা ঋণ, নারী উদ্যোক্তা ঋণসহ অন্যান্য সেবা এ ধরনের ব্যাংকে খুবই সীমিত। ‘স্মার্টনেস’ দেখাতে এ ধরনের এমডিরা বলে থাকেন তাদের ব্যাংকে খেলাপি ঋণ কম। আসলে ঋণ ব্যবসায় তার অবদানও কম। বরং পরিচালকদের স্বার্থই তিনি বেশি দেখেন।
এ ধরনের এমডি মূলত সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লিয়াজোঁ রাখেন। উদ্যোক্তা পরিচালকের অপরাপর ব্যবসার স্বার্থ দেখা, টাকার প্রয়োজন হলে গ্রাহকের নামে ঋণ অনুমোদন করিয়ে উদ্যোক্তা পরিচালককে দিতে পারাই তার বড় কাজ।
কোনো কোনো এমডি রয়েছেন নিজের পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়েই সারা দিন মেতে থাকেন। তার নিজের স্বাতন্ত্র্য তাতে হারিয়ে যায়। আবার কেউ কেউ এমন রয়েছেন যে, তিনি যে ব্যাংকে যাবেন, সেই ব্যাংকে শুরুতে ঢালাও ছাঁটাই করবেন কিংবা চাকরি ছাড়তে বাধ্য করবেন। তারপর নিজের পরিচিত কিছু লোক নিয়ে আসবেন। এই প্রক্রিয়ায় একজন এমডি একটি বেসরকারি ব্যাংকে যোগ দেওয়ার পর এমন কাজ করেছেন। এমনকি ব্যবসাও ভালো করতে পারেননি। ঐ ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকেরা এখন হতাশ এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে তার পুনর্নিয়োগে সম্মতি দেবেন না।
সরকারি ব্যাংকের কোনো কোনো এমডির দাপট এতই যে, সবকিছু যেন হাতের মুঠোয় নিয়ে চলেন। চাউর হয়েছে যে, এক এমডি তার চেয়ারম্যানের পুনর্নিয়োগের দায়িত্ব নিজেই নিয়েছেন। কোনো কোনো ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার নিয়ে জটিলতা, জালজালিয়াতির ঘটনার পরও তিনি বহাল তবিয়তেই আছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্রগুলো বলেছে, অতীতে অনেক বিজ্ঞ ব্যাংকার ছিলেন। ব্যাংক ও অর্থনীতির স্বার্থকেই তারা বড় মনে করতেন। আর এখন প্রভাবশালী কিংবা স্বার্থান্বেষীদের সেবা দিলে এমনকি দুর্নীতির অভিযুক্ত হলেও পুনর্নিয়োগে সমস্যা হয় না। এমডিদের দেখাদেখি মহাব্যবস্থাপকেরাও কম যান না। বিশেষত এমডিদের ঘনিষ্ঠ যারা, তারাও বেপরোয়া। ফলে কর্মীদের পদোন্নতি থেকে শুরু করে অন্যান্য সুবিধা দিতেও বৈষম্য দেখা দেয়। ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ে। এমডি, জিএম মিলে ভুয়া কাগজপত্রে ঋণ দেওয়া হয়। সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত এক ব্যাংক থেকে খামারের নামে এক নরীকে ঋণ দেওয়া হয়েছে। পরে দেখা গেল খামারের কোনো অস্তিত্বই নেই। প্রভাবশালী বড় গ্রাহকদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রেও নিয়মনীতি সঠিকভাবে প্রতিপালন করা হয় না। ব্যাংক নিজেই কাগজপত্র তৈরি করে যেন ঋণ দিতে পারলেই খুশি। অন্যদিকে প্রকৃত উদ্যোক্তারা ঋণের জন্য ঘুরে ঘুরে হয়রান। তাদের কাগজপত্রের ত্রুটি থাকলে ঋণ দেওয়া হয় না। ১০ লাখ টাকার একটি ঋণের জন্য যে ধরনের কাগজপত্র দরকার, তেমনি ১০০ কোটি টাকার ক্ষেত্রেও একই রকম কাগজপত্রের দরকার হয়। ছোট পুঁজির উদ্যোক্তাকে ঋণ দিলে সুবিধা পাওয়া যাবে না, তাই নিরুত্সাহিত করা হয় বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়।
