কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহে দায়িত্বরত নার্স ও ওয়ার্ডবয়ের অবহেলা-গাফিলতিতে একর পর এক রোগী মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। গত শনিবার অক্সিজেন সিলিন্ডার না পেয়ে অশীতিপর এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় কুষ্টিয়া সদর আসনের এমপি মাহবুব-উল আলম হানিফের নির্দেশে গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে আপাতত অক্সিজেন সংকট নেই। তবে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, চিকিত্সক-টেকনোলজিস্টসহ লোকবল সংকট ও করোনা ওয়ার্ডে দায়িত্বরতদের গাফিলতি-অবহেলায় হাসপাতালের করোনা রোগীরা পাচ্ছে না সুচিকিত্সা। মারা পড়ছে রোগী।
গত শনিবার অক্সিজেন না পেয়ে মারা যান কুষ্টিয়া সদর উপজেলার স্বর্গপুর গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ারা খাতুন (৮৯)। হাসপাতালের করোনা ইউনিটের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বারান্দায় চিকিত্সাধীন আনোয়ারা খাতুনের অক্সিজেন ফুরিয়ে গেলে পরবর্তী সিলিন্ডার পেতে স্বজনরা দায়িত্বরত নার্স-ওয়ার্ড বয়দের কাছে বারবার আকুতি জানিয়েও সিলিন্ডার পাননি। ফলে সিলিন্ডার অভাবে স্বজনদের চোখের সামনে ছটফট অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন আনোয়ারা ।
আনোয়ারার পুত্রবধূ আসমার অভিযোগ, অক্সিজেন অক্সিজেন করে নার্স-ওয়ার্ড বয়দের কাছে কয়েক বার গেলেও তারা কোনো কর্ণপাতই করেনি। পরে ঘটনা তদন্তে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এম এ মোমেন, কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষের পক্ষে দায়িত্বপ্রাপ্ত ডাক্তার সালেক মাসুদ ও সংশ্লিষ্ট করোনা ওয়ার্ডের দায়িত্বরত চিকিত্সকসহ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির প্রধান ডা. এম এ মোমেন বলেন, কোনো রোগীর মৃত্যু আমাদের কাম্য নয়। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। কর্তব্যে অবহেলা কিংবা কারো গাফিলতি পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে গত ৫ জুলাই হাসপাতালে ভর্তি রোগী নিলুফার ইয়াসমিন নার্গিস (৪৩) উচ্চ মাত্রার অক্সিজেন না পেয়ে মারা যান। ভুক্তভোগী নার্গিসের ভাই নয়নের অভিযোগ, চেষ্টা-তদবির করেও উচ্চমাত্রার অক্সিজেন মেলেনি। অক্সিজেন না পেয়ে তার বোন ছটফট করতে করতে মারা যান।
এছাড়া গত ৮ জুলাই হাসপাতালের পেয়িং ১ নম্বর রুমের ৫ নম্বর বেডে চিকিত্সাধীন মিরপুর উপজেলার আমলা রাজনগর গ্রামের সাইফুল ইসলাম (৫৬) অক্সিজেন না পেয়ে মারা যান বলে অভিযোগ স্বজনদের। সিলিন্ডারে ঐ রোগীকে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু উচ্চমাত্রার অক্সিজেন না পেয়ে শ্বাসকষ্টে সাইফুল স্ত্রীর চোখের সামনেই মারা যান। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের কানো অভিযোগই আমলেই নেয় না।
এ হাসপাতালের ১৪৩টি বেডে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সংযোগ, ২৪টি হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা ও ৬৫০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার রয়েছে। এছাড়া খাতা-কলমে হাসপাতালে চারটি আইসিইউ বেড দেখানো হলেও এটি পরিচালনায় নেই প্রশিক্ষিত চিকিত্সক-নার্স। এছাড়া হাসপাতালে করোনা রোগী চিকিত্সায় প্রতিদিনের রোস্টারে যেসব চিকিত্সকদের নাম অন্তর্ভুক্ত থাকে তাদের অনেকেই ওয়ার্ডে রাউন্ডে না এসে ফাইল/রেকর্ড দেখেই রোগী চিকিত্সা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতালে ভর্তি রোগীর অধিকাংশেরই প্রয়োজন হচ্ছে উচ্চমাত্রার অক্সিজেন। কিন্তু সব রোগীকে উচ্চমাত্রার অক্সিজেন দেওয়ার সক্ষমতা নেই। এদিকে অব্যাহত রোগীর চাপ সামলাতে ওয়ার্ডে বিছানা ছাড়িয়ে বাড়তি রোগীর ঠাঁই মেঝে ও বারান্দায় মিললেও বেড বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।
কোভিড-১৯ রোগীর সেবা ও প্রাথমিক সাপোর্ট দিতে এই হাসপাতালে নিয়োজিত ছাত্রলীগের স্বেচ্ছাসেবী টিমের ৬৫ সদস্য ও রোটারি ক্লাবের সদস্যরাই যেন একমাত্র ভরসা। গত দেড় বছর ধরে তারা রোগীদের অনেক সেবা দিচ্ছে।
