বুধবার সমগ্র দেশে উদ্যাপিত হইবে পবিত্র ঈদুল আজহা। মহান আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ ও আত্মত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল এই ঈদ। ইহার পাশাপাশি এই ঈদ আমাদের মধ্যে শান্তি, সৌহার্দ, ভ্রাতৃত্ব ও আনন্দের বার্তাবাহক। ঈদুল আজহার দুই রাকায়াত নামাজ শেষে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কোরবানি করিয়া থাকেন। মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ (আ.) কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহ পাকের প্রতি গভীর আনুগত্য ও সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের যে বিরল নজির স্থাপন করেন, ঈদুল আজহা তাহারই স্মারক। হজরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে তাহার সর্বাধিক প্রিয়বস্তু স্নেহের পুত্র হজরত ইসমাইল জবিহুল্লাহকে (আ.) বিনা দ্বিধায় কোরবানি করিতে উদ্যত হন। মহান আল্লাহর হুকুমে ও অলৌকিকভাবে সেই ছুরির নিচে ইসমাইল (আ.)-এর স্থলে একটি দুম্বা কোরবানি হয়। এইভাবে পিতা-পুত্র ইমানের এক কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এই জন্য পশু কোরবানি দেওয়ার সময় আমরা পবিত্র কোরআনের এই আয়াতটি উচ্চারণ করিয়া থাকি, যাহার অর্থ হইল—‘নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও মরণ বিশ্বপ্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য নিবেদিত ও উত্সর্গকৃত’ (সুরা আল আন’আম :১৬২)।
কোরবানির মর্মবাণী আরো পরিষ্কারভাবে বলা হইয়াছে এই আয়াতে, যাহার অর্থ—কোরবানির পশুর গোশত বা রক্ত কোনোকিছুই আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না। বরং তাহার নিকট পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (সুরা হজ-৩৭)। তাকওয়া অর্থ খোদাভীতি। আল্লাহর প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্য ও নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের জন্যই দরকার তাকওয়া। ইহার মাধ্যমে মুমিন-মুসলমানগণ সেই সংকল্প করেন, যাহাতে প্রয়োজনবোধে তিনি তাহার সবকিছু এমনকি নিজের প্রাণও আল্লাহর নামে কোরবানি করিতে সর্বদা প্রস্তুত থাকেন। এই জন্য গোশত খাওয়া, সামাজিকতা রক্ষা কিংবা অর্থবিত্তের গরিমা প্রকাশ করা কোনোটাই কোরবানির উদ্দেশ্য হইতে পারে না। অবশ্য সবার উপর কোরবানি করা আবশ্যক নহে। যিনি মালে নিসাবের অধিকারী তথা সামর্থ্যবান, কেবল তাহার উপর কোরবানি করা ওয়াজিব। তিনিই এই পরীক্ষা দিবেন এবং অভাবী-দরিদ্র মানুষের মধ্যে কোরবানির মাংস বিতরণের মাধ্যমে সকলকে সেই আধ্যাত্মিক আনন্দের সহিত শামিল করিবেন। উল্লেখ্য, ঈদুল আজহার সহিত হজও প্রাসঙ্গিক। প্রতি বত্সর মুসলমানদের বৃহত্তম ধর্মীয় সম্মেলন পবিত্র হজের পরই কোরবানি দেওয়া হয়। পাঁচ দিন ধরিয়া চলে হজের নানা আনুষ্ঠানিকতা। বিভিন্ন দেশ হইতে আসা লক্ষ লক্ষ মুসলমান আরাফাত ময়দানে সমবেত হন। ইহাও মুসলিম ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
ঈদুল আজহা আমাদের ত্যাগের শিক্ষা দেয়; কিন্তু ত্যাগের চাইতে অনেক সময় আমাদের নিকট বড় হইয়া উঠে ভোগবিলাস ও অপচয়। আধ্যাত্মিকতাকে ছাপাইয়া যায় বস্তুগত আনুষ্ঠানিকতা। বিশেষত কোরবানি হইতেছে আল্লাহর আনুগত্যের বিনম্র প্রকাশ; কিন্তু ইদানীং দেখা যায়, অনেকেই পশু জবেহ দেওয়ার সময় সেলফি তুলেন ও ভিডিও করিয়া ফেসবুকে দেন, যাহা মোটেও বাঞ্ছনীয় নহে। ঈদের রাত্রে আমাদের ইবাদত-বন্দেগিতে নিমগ্ন থাকা ও ঈদের দিন আল্লাহর স্মরণে অধিকতর তাকবির পাঠ করা উচিত। মোটকথা, কোনো অপসংস্কৃতিতে মত্ত নহে, ঈদুল আজহাও আমাদের পালন করিতে হইবে কোরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী। বর্তমানে দেশে করোনা মহামারির কারণে জীবন-জীবিকা হারাইয়া অনেক মানুষ দিশাহারা। এই ঈদের সময় তাহাদের প্রতি আমাদের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। ইহার পাশাপাশি পশু কোরবানি করিবার পর আমাদের চারিপাশের পরিবেশ যাহাতে সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর থাকে, সেই জন্য দ্রুত কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করিতে হইবে। বস্তুত কোরবানির পশু জবেহর মাধ্যমে সকল রিপুকে বিনাশ করিয়া হূদয় পরিশুদ্ধ করিতে পারিলেই সার্থক হইবে আমাদের ঈদুল আজহা পালন। সবাইকে জানাই পবিত্র ঈদুল আজহার অনাবিল প্রীতি ও শুভেচ্ছা—ঈদ মোবারক।
