লাইভে এসে ‘অ্যাকশন’

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২১, ২১:১১

প্রেমে ব্যর্থতা, পারিবারিক অশান্তি, বেকারত্ব, আর্থিক সমস্যা ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে পৃথিবী জুড়ে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে, এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে লাইভে এসে আত্মহত্যা যেন ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। এর বেশির ভাগ ঘটনা উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রেমঘটিত টানাপড়েন থেকেই শুরু হচ্ছে। কোনো একজনের ভালোবাসায় ভাটা পড়া, দুজনের সম্পর্কের মধ্যে অন্য কারো আগমন, প্রেম চলাকালীন দৈহিক সম্পর্কে জড়িয়ে পরবর্তীকালে প্রেমিকের তরফ থেকে বিয়েতে টালবাহানা, পরস্পরের প্রতি সন্দেহ-অবিশ্বাস, সম্পর্ক অস্বীকার ইত্যাদি থেকে এ ধরনের মৃত্যুর এ ঘটনাগুলো ঘটছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, লাইভে এসে ঘটনা ঘটানোর পেছনে মূলত বিশেষ কাউকে দেখানোটাই মুখ্য ভূমিকা রাখছে। গত মাসে চট্টগ্রামে সিঅ্যান্ডএফের এক কর্মচারী প্রেমিকাকে ভিডিও কলে রেখে আত্মহত্যা করেছে। আত্মহত্যার কারণ হিসেবে জানতে পারা যায়, যশোরে বসবাসকারী তার প্রেমিকার একাধিক ছেলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া। তাই ছেলেটি রশি টাঙিয়ে ফাঁস দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ভিডিও কল দিয়ে প্রেমিকাকে জানায় ওসব বাদ না দিলে সে আত্মহত্যা করবে। অপর প্রান্ত থেকে প্রেমিকা জবাবে বলে, এতে তার কিছু আসে-যায় না। তার পরই সেই প্রেমিক গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। কয়েক মাস আগে একইভাবে সিলেটের এক তরুণ ফেসবুকে লাইভে এসে আত্মহত্যা করে। গলায় ফাঁস দেওয়ার ঘণ্টাখানেক আগে একটি মেয়েকে দায়ী করে ফেসবুক পোস্টে বলে—চলে যাচ্ছি না-ফেরার দেশে, ভালোবেসো না, ঠকে যাবে। এ ধরনের ঘটনা কিন্তু প্রায়ই ঘটে চলেছে। এগুলো দেখে অন্যরা শিখছে; মনে করছে, প্রেমের সম্পর্ক একটু এদিক-ওদিক হলেই লাইভে এসে জীবন বিসর্জন দিয়ে ‘হিরো’ হওয়া যাবে।

লাইভে এসে যারা আত্মহত্যা করছে, এরা কিন্তু জীবনের হিসাবনিকাশ মেলাবার ও বিকশিত হওয়ার আগেই সবকিছুর পাট চুকিয়ে দিচ্ছে। একজন মানুষের চিন্তার জগত্ বা পরিধি যখন ছোট হয়ে যায়, যখন তার চলাফেরা, ওঠাবসা দু-চার জনের মধ্যে সীমিত হয়ে পড়ে, তখন সে ভালোমন্দের বাছবিচার ও জীবনের অর্থ, তাত্পর্য ও দায়দায়িত্ব সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে থেকে ভালো চিন্তা, শুভ উদ্যোগ, সমাজের প্রতি অঙ্গীকারগুলো একটু একটু করে লোপ পেতে থাকে, তার পরিধিটা ছোট হতে থাকে, তখন তার কাছে জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে খুব একটা দূরত্ব থাকে না। আর তখনই ঘটে যায় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো। বৃত্তাবদ্ধ জীবনে চিন্তাশক্তির সীমাবদ্ধতা, তাদের আত্মহত্যার পথে প্ররোচিত করে। ভালোবাসার মানুষের আঘাত সহ্য করার মতো মানসিক শক্তি তাদের থাকে না। এদের কাছে আবেগটাই মুখ্য হয়ে ওঠে। তাই মৃত্যুই তাদের কাছে মুক্তির একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপকরা বলেন, পরিকল্পিতভাবে এবং আবেগতাড়িত হয়ে আত্মহত্যা সংঘটিত হয়ে থাকে। আর আমাদের দেশে অধিকাংশ আত্মহত্যা আবেগ তাড়িত হয়ে ঘটে থাকে। এ কারণে তরুণ-তরুণীরাই বেশি আত্মহত্যা করে। কেউই আত্মহত্যার জন্মগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে এ পৃথিবীতে আসে না, শারীরিক ও মানসিক বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতে নিজেকে সামলে নিতে না পেরে হাসতে খেলতে বা ঠুনকো আবেগের বশীভূত হয়ে অনেকে জীবন বিসর্জন করে থাকে। যারা আত্মহত্যা করে তাদের কেউই নাবালক বা অপ্রাপ্তবয়স্ক না। আত্মহত্যার ঘটনাগুলো সাধারণত ১৬-১৭ থেকে ৪০-৪৫ বছরের মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটে থাকে। আর বয়সের এ ধাপটিই হলো মানুষের জীবন গঠন এবং জীবনের মোড় ঘোরানোর উপযুক্ত সময়।

যে আত্মহত্যা করে, সে নিজে হয়তো নিষ্কৃতি চায়। কিন্তু তার এ নিষ্কৃতি পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য নিয়ে আসে গ্লানি, যন্ত্রণা ও লজ্জা। ঐ পরিবারের সদস্যরা অন্যদের সঙ্গে ঠিকভাবে মিশতে পারে না, মানুষজন বাঁকা চোখে দেখে। সমাজে অনেক ক্ষেত্রে অপাঙেক্তয় হয়ে যেতে হয়। কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে অনেকেই ঐ পরিবারের কারো সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে জড়াতে চায় না। অনেকই ইনিয়েবিনিয়ে বলে, ঐ পরিবারের অমুক তো আত্মহত্যা করেছিল। অর্থাত্ যে চলে যায়, সে তো যায়ই, কিন্তু পরিবারের অন্যদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ পরিস্থিতির ক্ষেত্র তৈরি করে যায়, যা আত্মহত্যাকারীর পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, নিকটজনদের জন্য অন্তহীন অমানিশার সূচনা মাত্র।

প্রেমে ব্যর্থতা, আর্থিক অনটন, জীবনের ব্যর্থতা, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার বিকল্প কোনোভাবেই আত্মহত্যা হতে পারে না। এ ধরনের অঘটনগুলোতে কোনোভাবে মনকে প্রবোধ দেওয়া যায় না। জীবনের ব্যাপ্তি, মর্যাদা, দায়িত্ব, কর্তব্য ও মাহাত্ম্য অনেক বেশি। কারো প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ, অন্যায়, অনাচার ও বঞ্চনার কারণে আত্মহত্যা কখনোই জাস্টিফাইড হয় না। প্রেম-বিয়ে, ভালোবাসাই জীবন নয়, এগুলো জীবনের অনুষঙ্গ মাত্র, এর বাইরেও জীবন আছে, জীবনের সৌন্দর্য আছে। একে বহুভাবে রাঙানো যায়, আনন্দময় করা যায়। জীবন সব সময় ছক মেনে চলবে না, কঠিন পরিস্থিতি আসতেই পারে, তাকে জয় করতে হবে, স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে হবে।

আমাদের দেশে যত ধরনের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়, তার বেশির ভাগই ঘটে থাকে সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে। কঠিন বিপদে অবিচল থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার প্রথম ও প্রধান প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হলো পরিবার। আমাদের পরিবারগুলোকে দৃঢ় মানসিক স্বাস্থ্যসংবলিত সন্তান ও সদস্য গঠনে ভূমিকা রাখতে হবে। তাদেরকে মানসিকভাবে ম্যাচিউরড ও শক্তিশালী করার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ঘরেই করতে হবে। একই সঙ্গে ছেলেমেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতা, নৈতিকতার পাঠগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে। পৃথিবী যে দু-চার জন মানুষ নিয়েই নয়, এটাও তাদের বোঝাতে হবে, যেন তারা ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ বিষয়ে আশাগুলোকে অতিক্রম করতে পারে। পরিবারের যখন কোনো সদস্য মানসিক সমস্যায় ভোগে তখন অনেক ক্ষেত্রে তার বিষয়টিকে অ্যাড্রেস করা হয় না, বা অন্যরা অনেক সময় বুঝতে পারে না বা বুঝলেও গুরুত্ব দেয় না; ফলে বিপদের ঝুঁকি বাড়ে। তাই পরিবারের যখন কোনো সদস্য এ ধরনের সমস্যায় ভোগে, তখন কালবিলম্ব না করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

আত্মহত্যার বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস পালন করা হয়ে থাকে। ২০১৯ সালে ঐ দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল—‘ওয়ার্কিং টুগেদার টু প্রিভেন্ট সুইসাইড’। মনে রাখতে হবে, জীবনের মূল্য অনেক বেশি। এটা নিয়ে ছেলেখেলার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদের বোঝাতে হবে, মোটিভেশনাল ওয়ার্ক করতে হবে, পত্রিকা ও সামাজিক মাধ্যমগুলোকে এই ব্যাপারে সোচ্চার হতে হবে। চিত্কার করে বলতে হবে—জীবন অনেক বড়, অনেক বিস্তৃত, জীবনের দায় অনেক। মিথ্যা ও ঠুনকো আবেগে বশীভূত হওয়ার জন্য এ জীবন নয়।

n লেখক :সরকারি চাকরিজীবী