আমরা দায় সেরেই ক্ষান্ত

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২১, ২১:১১

যদি প্রশ্ন করা হয় মানুষ কেন সমাজে বাস করে? উত্তর আসবে, মানুষ সামাজিক জীব, দলবদ্ধভাবে থাকতে পছন্দ করে। এমন উত্তরে আমরা সন্তুষ্ট নই। মতানৈক্যের কারণ, জঙ্গলে পশুরাও তো দলবদ্ধভাবে থাকে। তবে তারা কেন সামাজিক নয়? এখানে ফারাক হচ্ছে বিবেক, বুদ্ধি ও মনুষ্যত্বের। পশুর আছে পশুত্ব আর মানুষের মনুষ্যত্ব। পশুত্বের ধর্ম হলো হিংস্র ও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠা আর মনুষ্যত্ব হলো সাম্য, ন্যায়, নীতি তথা মানবীয় হয়ে ওঠা। ‘সামাজিক’ ধারণাটি দলবদ্ধতা থেকে আসেনি; এসেছে মনুষ্যত্বের চূড়ান্ত জাগরণ থেকে; যেখানে মানুষ মানুষের, জীবন জীবনের।

সমাজ বাস্তবিকভাবে কোনো ব্যক্তি বা যন্ত্র নয়, সমষ্টিগত মানুষের একটি সংগঠন। যেখানে আছে হাসি, কান্না, সুখ, দুঃখ, শুভ, অশুভ, অনুভূতি, আবেগ, বিবেক, জ্ঞান, বুদ্ধি। আবার ন্যায়, অন্যায়, অবিচার, সুবিচার, প্রতিবাদ, সংগ্রাম, জাগরণ, গণজাগরণও আছে। সমাজ আমাদের জন্য কাজ করে। নিরাপত্তা দেয়, টিকে থাকার উপাদান জোগায়। আবার আমাদেরও সাড়া দিতে হয় সমাজের প্রয়োজনে। এই কাঠামোর সৃষ্টি যেমন মানুষের জন্য, তেমনি এর নিয়ন্ত্রণও মানুষের হাতে। সুতরাং বোঝা গেল, সমাজ ও মানুষের মধ্যে কিছু বোঝাপড়ার জায়গা আছে, পারস্পরিক দায়বদ্ধতা আছে। কোনো জনপদ যখন অন্যায়, অপরাধ, অত্যাচার ও অবিচারের পথে ধাবিত হয়, সমাজ তখন স্বপ্রণোদিত হয়ে রুখে দাঁড়ায়, প্রতিবাদ করে। অনাচারের চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছানোর আগেই তা প্রতিহত করে। এর ব্যত্যয়ও ঘটতে পারে। এই সমাজে যদি শুভ বোধসম্পন্ন মানুষের স্বল্পতা এবং ভোগবাদী ও কুরুচিসম্পন্ন মানুষের আধিক্য ঘটে, সমাজ তখন প্রতিবাদের বদলে সেই অনিয়ম, অবিচারের পক্ষে গিয়েই দাঁড়ায়। তখন সেখানে নেমে আসে কালো আঁধার। খোয়া যায় মনুষ্যত্ব, বিকিয়ে যায় মানবিকতা, যা মানবগোষ্ঠীর জন্য ভয়াবহ।

প্রত্যেক মানুষেরই সমাজের প্রতি কিছু দায়-দায়িত্ব রয়েছে, যা যুগের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই যুগে আমরা বাস্তবিক নই, কেবল দায়িত্ববানের মুখোশ পরে ঘুরে বেড়াতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চক্ষুলজ্জার ভয়ে না করলেই নয় বা নিতান্তই ফিরিয়ে দেওয়া যায় না—এমন দু-একটি কাজের উদাহরণ ছাড়া আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা মেটানোর নজির মেলানো যে ডুমুর ফুলের চাইতে সহজলভ্য হবে না, তা হলফ করে বলতে পারি। অথচ দায়বদ্ধতা আসে আত্মিকভাবে স্বপ্রণোদিত হয়ে, কোনো জোর-জবরদস্তি বা চাপিয়ে দিয়ে নয়।

ইদানীং আবার এই দায়বদ্ধতা হয়ে উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়া কেন্দ্রিক। ব্যাপারটা এমন যে, এখন কোথাও কেউ বিপদে পড়লে, কোন দুর্ঘটনা ঘটলে বা অপরাধ সংঘটিত হলে আমরা তাত্ক্ষণিক কয়েকটি ছবি তুলেই চুকিয়ে ফেলি দায়-দায়িত্বের সব খাতা। পরে বাড়িতে গিয়ে সুন্দর একটি ক্যাপশন লিখি মনের মাধুরী মিশিয়ে, অতঃপর তা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়ে উদ্ধার করে ফেলি সমাজ! আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো সমস্যা, দুঃখ-দুর্দশা বা কষ্টের পোস্ট চোখে পড়লে প্রথমে একটি রি-অ্যাক্ট দিই। তারপর গদগদ সহানুভূতিশীলতায় ভরিয়ে ফেলি কমেন্ট বক্স। ভাবটা এমন, যেন মায়ের চেয়ে মাসির দরদই বেশি। দুঃখের ভাগ একটু বেশি হলে ক্ষেত্রবিশেষে শেয়ারও দিয়ে বসি। তবে ঘটনা এখানেই শেষ। সমস্যা নিরসনে কার্যত ভূমিকা রাখার জন্য খোঁজা হলে তখন আর কারোরই সন্ধান মেলে না। মিলবে কীভাবে? আগেই তো দায় সেরেছি লাইক, কমেন্ট আর শেয়ার দিয়ে! সোশ্যাল মিডিয়াগুলো হয়ে উঠেছে যেন একেকটি নাটকের রঙ্গমঞ্চ। যেখানে কেউ সাজছেন বিরাট দানশীল, কেউ জনদরদি, কেউ মহাপণ্ডিত কেউ-বা নিজেকে জাহির করেছেন সমাজ সংস্কারকের ভূমিকায়। নাটকের এই চরিত্রগুলো যদি সত্যিই বাস্তবিক হয়ে উঠত, তবে অনেক আগেই পালটে যেত আমাদের সমাজ-রাষ্ট্রের চেহারা, বদলে যেত দৃশ্যপট। অনেক মানুষের সম্মিলিত পরিশ্রমে গড়ে ওঠা সভ্যতায় আমরা সভ্য হয়েছি। এই সভ্যতার প্রতিদান দিতে আমি থেকে আমাদের হয়ে উঠতে হবে। আমার থেকে সবার। আত্মকেন্দ্রিকতা পরিহার করে চিন্তা করতে হবে সামগ্রিকতার। আমাদের কণ্ঠ রোধ হয়েছে, বিবেক বধ হয়েছে। এই রোধ আর বধ থেকে মুক্তি পেতে সামাজিক অবক্ষয় রোধে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে একযোগে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ড্যাফোডিল

আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।