বিপুল আয়ের সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি) বরিশাল ডিপোতে চলছে হরিলুটের কারবার। এ ডিপোর অধিন ২১টি রুটের ৩৩টি সচল বাসের অনুকুলে চালক রয়েছেন ৭৯ জন। গাড়ির তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি চালক থাকলেও ১৭ জন কন্ট্রাকটারের মধ্যে কর্মক্ষম রয়েছেন ১০ জন। চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত বাস চালক ও চাহিদার তুলনায় নগন্য কন্ট্রাকটরের ফায়দা লুটছে ডিপো সংশ্লিষ্ট সবাই। অথচ ডিপোতে মোট ১২৩ জন জনবলের প্রতি মাসে ৩৫ লাখ টাকার ওপরে বেতন এবং ঈদ-কোরবানিতে বাড়তি ১৫ লাখ টাকার ওপরে বোনাস দেওয়া হয়। বিপুল জনবলের এ ডিপোতে সংকট দেখিয়ে বাস পরিচালিত হচ্ছে নির্দিষ্ট কয়েকজন চালক ও কন্ট্রাকটার দ্বারা। প্রতি রুটের রাউন্ড ট্রিপে প্রকৃত আয় ধামাচাপা দিয়ে নির্ধারিত আয় দৈনিক কাগজে-কলমে জমা রেখে সকলেই লুটপাটের সহযোগী হচ্ছেন।
যদিও ডিপোর ম্যানেজার ডিজিএম মো. মনিরুজ্জামান (বাবু) ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, সংস্থার বাসগুলো সংশ্লিষ্ট রুটের কন্ট্রাকটরের মাধ্যমে এভাবেই পরিচালিত হওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে এ ডিপোতে কন্ট্রাকটরের অনেকগুলো পদ শূন্য থাকায় চালকরা চালাচ্ছেন। দৈনিক নির্ধারিত টাকা জমা দেওয়ার বিষয়ে তিনি এটাকে বৈধ বলে জানান। বরিশাল-কাঠালবাড়ি রুটের দৈনিক ১০টি বাস একজন চালক দিয়ে পরিচালনার বিষয়ে তিনি জানান এ রুটের জন্য অন্য কেউ আবেদন না করায় ফোরকান নামের একজন চালক তা পরিচালনা করছেন। প্রতি রাউন্ড ট্রিপে বর্তমানে নির্ধারিত ১৫ হাজার টাকা দিয়ে একজন সরকারি বেতনভূক্ত চালকের নামে চলছে সংস্থার সবচেয়ে লাভজনক বরিশাল-কাঠালবাড়ি রুটের ১০টি বাস। তবে বিআরটিসি’র চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলাম (অতিরিক্ত সচিব) ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, নির্ধারিত করে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সংস্থার বেতনভূক্ত চালক গাড়ি চালিয়ে যে আয় আসবে তা সংশ্লিষ্ট ডিপোতে জমা দিবেন। বরিশালের একজন চালক লাভজনক রুটে একা নির্ধারিত আয়ে ১০টি বাস চালানোর বিষয়ে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। খুব শীঘ্রই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, বিআরটিসিকে লাভজনক করতে নানান উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই তার অনেক সুফলও আসছে এবং পরিচালকদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
জানা গেছে, ঈদুল আযহাকে কেন্দ্র করে বরিশাল-কাঠালবাড়িসহ বিআরটিসির সব রুটেই আয় বেড়েছে কয়েকগুণ। অথচ চালকদের নামে চলা সরকারি এ সার্ভিসের যাত্রীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার বেশি আদায় এবং স্বাস্থ্য সচেতনা ছাড়াই অধিক যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। অথচ সরকারি কোষাগারে নির্ধারিত টাকা জমা দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, বরিশাল ডিপোর লাভজনক রুটসহ সব রুটেই কাগজে-কলমে সবাই দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রয়োজনীয় খরচও নিয়ে থাকেন। কিন্তু প্রতি রাউন্ড ট্রিপের লাভের টাকা ভাগাভাগি করে নির্ধারিত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়ে থাকে। যুগ যুগ ধরে এ কার্যক্রম অব্যাহত ভাবে চলতে থাকায় মাস শেষে বিপুল আয়ের এ ডিপোকে লোকসান দেখানো হচ্ছে। বর্তমানে বরিশাল ডিপো লোকসানে রয়েছে তিন কোটি টাকার ওপরে। যদিও বর্তমান ম্যানেজারের দাবি তিনি প্রতি মাসেই কিছু না কিছু লাভ দেখছেন। কিন্তু তাও তিনি যোগদানের পর ২২ জন চালককে অন্যত্র বদলি এবং যন্ত্রাংশ ক্রয়ে কিছুটা টাকা সাশ্রয় করে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে এ ডিপোর বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা ঊর্ধ্বতনদের কাছে নানান অপকর্ম তুলে ধরে ডিপো ম্যানেজারের রোষানলে পড়ে ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ায় এখন আর কেউ মুখ খুলছে না। তবে সম্প্রতি বিআরটিসির চেয়ারম্যান, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া অভিযোগ এবং পূর্বের ম্যানেজারের বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দায়েরকৃত মামলা সূত্রে জানা গেছে, এ ডিপোর অধীন একাধিক রুট লিজ দেওয়া, রুটগুলো ডিপোতে ম্যানেজারের ঘনিষ্ট চালক-কন্ট্রাকটরের মাধ্যমে পরিচালিত করে টাকা আত্মসাত করা, বাসগুলো সংস্কারের নামে বিপুল টাকা আত্মসাত করা, অস্থায়ী জনবল নিয়োগ দেওয়াসহ নানান ভাবে লুটপাট করায় কখনোই এ ডিপোটি লাভের মুখ দেখছে না।
বরিশাল ডিপো অফিস সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি রুট ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য মোট ৭০টি বাসের মধ্যে ৭টি অকেজো ঘোষণা করা হয়েছে। ভারী মেরামতের জন্য রয়েছে ১০টি, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯টি, লং লিজে রয়েছে ৭টি। বর্তমানে ৩৩টি বাস নিয়মিত চলাচল করলেও ২/১টি সবসময়ই মেরামতের জন্য থাকে। সংশ্লিষ্টরা জানান, বাস সংকটে একাধিক রুটে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সরকারি সার্ভিস।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা জানান, বরিশাল ডিপোর অধিনে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে সার্ভিসে থাকা বাসে প্রতিদিন প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার সড়কপথে কমপক্ষে ৪ সহস্রাধিক যাত্রী পরিবহন করা হয়ে থাকে। অতীতে প্রতি মাসে ডিপোটিতে দেড় কোটি টাকারও বেশি যাত্রীভাড়া আয় করলেও এখন তা অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে অব্যবস্থাপনার ফলে। বিভিন্ন রুটের বাসগুলো লিজ দেওয়া, পুরনো গাড়ির অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়, অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয় মেটাতে এ বাস ডিপোটির লাভের পথ রুদ্ধ করছে। তাই একসময়ের লাভজনক বরিশাল বাস ডিপোটি ক্রমে ক্রমে লোকসানি ডিপোতে পরিণত হয়েছে।
