শতকোটি টাকার মালিক চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী!

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২১, ০০:২৫

বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর’ ছিলেন আব্দুল মালেক (৪২)। বিভিন্ন দুর্নীতি করার অপরাধে ২০১৫ সালে চাকরিচ্যুত হন। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষায় চিপ্স ব্যবহার, বিভিন্ন কোটায় নকল সার্টিফিকেট তৈরি করে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নাম করে এরই মধ্যে বনে গেছেন শতকোটি টাকার মালিক। সম্প্রতি প্রতারণার শিকার একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে রবিবার রাতে রাজধানীর মণিপুরীপাড়া এলাকা থেকে আব্দুল মালেককে গ্রেফতার করে র্যাব। এ সময় তার কাছ থেকে উদ্ধার করে প্রতারণার কাজে ব্যবহূত বিভিন্ন জাল সনদ ও নথিপত্র। গতকাল সোমবার রাজধানীর কাওরানবাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়ে র?্যাব-৪ এর অধিনায়ক মোজাম্মেল হক বলেন, প্রতারক এই চক্রের মূল হোতা আব্দুল মালেক। এই চক্রের পলাতক আরো তিন সদস্য আবদুর রাজ্জাক, আল-আমিন ও অবিনাশ মিলে সরকারি চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা করে আসছিল। চক্রের বাকি তিন সদস্যকে গ্রেফতারের চেষ্টা করছি।

তিনি জানান, মালেক প্রতারণার মাধ্যমে অনেক সম্পত্তি ও শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তার নামে বিভিন্ন ব্যাংকে ৫০ লাখ টাকার বেশি এফডিআর রয়েছে। এছাড়া ঢাকা জেলার ধামরাই থানার ফোর্ডনগর এলাকায় ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ জমি রয়েছে। রাজধানীর মণিপুরী এবং ৬০ ফিট এলাকায় তিনটি ফ্ল্যাট রয়েছে। যার আনুমানিক মূল্য ১ কোটি টাকা। কুষ্টিয়ার সদর থানার বড়িয়া এলাকায় জাহান সুপার মার্কেট ছাড়াও নিজ গ্রামে ২৫ বিঘা জমি এবং একটি পাকা বাড়ি রয়েছে। কুষ্টিয়ায় তার জাহান গ্রুপ নামে একটি কনজ্যুমার প্রোডাক্ট কারখানা আছে। এছাড়া কুষ্টিয়া এক্সপ্রেস নামে একটি বাস ও চারটি ট্রাক রয়েছে।

মালেকের উত্থান প্রসঙ্গে র?্যাব অধিনায়ক মোজাম্মেল হক বলেন, ১৯৭৯ সালে কুষ্টিয়ায় জন্ম নেওয়া মালেক ১৯৯৩ সালে দাখিল এবং ১৯৯৫ সালে আলিম পাশ করেন। এরপর স্থানীয় একটি কলেজ থেকে বি কম ও এম কম ডিগ্রি পড়েন। ২০০৪ সালে তিনি বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি শুরু করেন। এরপর থেকে চাকরি প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিতে থাকেন। একপর্যায়ে ২০১০ সালে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে তাকে সাময়িক ও এসব অভিযোগের সত্যতা পেলে ২০১৫ সালে তাকে চাকরিচ্যুত করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

প্রতারণার কৌশল সম্পর্কে র্যাব কর্মকর্তা বলেন, মালেক প্রথমে নিজ এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এজেন্ট নিয়োগ করে চাকরি প্রার্থীদের সংগ্রহের কাজ শুরু করে। তারপর সরকারি চাকরি প্রার্থীদের প্রলোভন দেখানোর জন্য ২০১৬ সালে ‘এমভিশন’ নামে একটি কোচিং সেন্টার চালু করেন। সেখানে চাকরি প্রার্থীদের মধ্যে থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের কোটা (জেলা, প্রতিবন্ধী, মুক্তিযোদ্ধা, এতিম, আনসার) শ্রেণীকরণ করত। সেই অনুযায়ী প্রার্থীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাইবাছাই করে স্ট্যাম্পে চুক্তির মাধ্যমে টাকা অথবা জমির দলিল জমা রাখার শর্তে তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতেন। চুক্তি শেষে বিভিন্ন মাধ্যম যেমন লিখিত পরীক্ষায় প্রার্থীর ছবি পরিবর্তন/প্রশ্নপত্র ফাঁস/প্রার্থীকে ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে পাশ করানো হতো। এরপর নাগরিক সনদপত্র পরিবর্তন, জন্মসনদ, চারিত্রিক সনদ, এতিমখানার সনদ, প্রতিবন্ধী সনদপত্র ও চেয়ারম্যান প্রত্যয়নপত্র পরিবর্তনসহ যেসব জেলায় অধিকসংখ্যক জনবল নিয়োগ উল্লে­খ থাকে জাতীয় পরিচয়পত্রে সেসব জেলার প্রার্থীর ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করা হতো। কোনো চাকরি প্রার্থী চুক্তি অনুযায়ী টাকা দিতে না পারলে তাদের জমা রাখা দলিলের মাধ্যমে প্রার্থীর জমি দখল করে নিত। যারা এই প্রক্রিয়ায় চাকরি পেতেন তাদেরকে জিম্মি করার জন্য সব ধরনের কাগজপত্র জমা রাখত। যাতে পরবর্তীকালে কেউ ঝামেলা করলে তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে চাকরি পাওয়ার অভিযোগ দিতে পারে।