শফিকুর রহমান রয়েল
অন্যান্য মহাদেশের মতোই ২০২০ সালটা এশিয়ার জন্যে বয়ে এনেছিল নানান যন্ত্রণা ও বহুবিধ চ্যালেঞ্জ। কোভিড-১৯ কোন দেশের কত প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, তার সঙ্গে সুখের ধারণার সম্পৃক্ততা থাকাটা স্বাভাবিক। তবে সেটি বড় কোনো নিয়ামক রূপে আবির্ভূত হয়নি। এক জনের জীবনের সন্তুষ্টির সঙ্গে নানা বিষয় জড়িত। এ বছর প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০২০ সালের প্রেক্ষিতে তৈরি। করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর প্রাক্কালের তুলনায় ২০২০ সালের শেষ দিকে এসে দেখা গেছে, জরিপে অন্তর্ভুক্ত ১৪৯টি দেশই সুখের প্রসঙ্গে অনেক বেশি স্থিতিশীল। কোন দেশ কতটা সুখী, তা যাচাই করতে গিয়ে বস্তুত যে সব বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, সেগুলো হচ্ছে মাথাপিছু মোট দেশজ উত্পাদন, প্রয়োজনের সময় সামাজিক সহযোগিতা, সরকারের মধ্যে দুর্নীতির অনুপস্থিতি, সুস্বাস্থ্যপূর্ণ গড় আয়ু, জীবনে পছন্দ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা, অন্যদের প্রতি উদারতা বা সৌজন্যতা। গবেষকরা জনগণের সুখ মূল্যায়ন করতে গিয়ে মূলত এই ছয়টি চলককেই বেছে নিয়েছেন। দীর্ঘমেয়াদি সুখ যাচাইয়ের জন্য এই উপকরণগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকা প্রয়োজন।
এশিয়ার সুখী দেশের তালিকায় এক নম্বরে আছে তাইওয়ানের নাম। মাথাপিছু মোট দেশজ আয়, গড় আয়ু ও সামাজিক সহযোগিতা, এগুলোর বিচারে ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টে তাইওয়ানের পয়েন্ট উঁচুতেই থাকে। তাইওয়ানের সামাজিক সহযোগিতার একটি বড় প্রমাণ হচ্ছে এখন পর্যন্ত অনেক বহুপ্রজন্মগত পরিবার চোখে পড়ে। সেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ভিত্তিতে সম্প্রদায় মূল্যায়িত হয়। প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছে তারা। আজ পর্যন্ত লকডাউনে যেতে হয়নি তাদের। এশিয়ার সুখী দেশের তালিকায় দুই নম্বরে আছে বিশ্বের এক অতিধনী দেশ সিঙ্গাপুর। তবে বিশ্বে তাদের অবস্থান ৩২ নম্বরে। অর্থ যে সুখ কিনতে পারে না সিঙ্গাপুর তার প্রমাণ। ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টে আয়, প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাস ও সুস্বাস্থ্যপূর্ণ গড় আয়ু এই তিন বিচারে খুব ভালো করলেও অন্যদের প্রতি উদারতা ও সামাজিক সহযোগিতায় তারা মার খেয়ে যায়। অর্থ নয়, ব্যত্তিগত সম্পর্কাবলি সুখের আসল সুপারচার্জার হিসেবে কাজ করে।
অনেককে অবাক করে দিয়ে সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র ও মধ্য এশিয়ার মুসলিম দেশ উজবেকিস্তান এশিয়ার সুখী দেশের তালিকায় রয়েছে তিন নম্ব অবস্থানে। জাতিসংঘের নির্ণীত সুখী দেশের রিপোর্টে ৩ কোটি ৪০ লাখ লোকের এই দেশ ভালো পয়েন্ট অর্জন করেছে। জীবনের ওপর জনগণের নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সহযোগিতা ও উদারতার প্রশ্নে উজবেকদের সুনাম রয়েছে। তারা ক্রমশ ধনীও হয়ে উঠছে। ২০ বছর আগে প্রায় ৩০ শতাংশ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করত। এখন তা মাত্র ১০ শতাংশ। এশিয়ায় উজবেকিস্তানের পরের স্থানটি তাদের প্রতিবেশী কাজাখস্তানের। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে অর্থাত্ করোনা চলাকালীন এই সময়টাতে ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস ইনডেক্সে ১৫ ধাপ ওপরে উঠে গিয়ে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। মাত্র ১ কোটি ৯০ লাখ লোকের দেশ কাজাখস্তান করোনা প্রতিরোধে কাজভাক নাম ভ্যাকসিন নিজেরাই আবিষড়ার করেছে এবং তা ৯৫ শতাংশ কার্যকরী। ১২০টি এথনিক গ্রুপ বসবাস করলেও সবাই শান্তিপ্রিয়। মধ্য-আয়ের দেশ উজবেকিস্তান তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের তথ্যানুসারে সেখানে মাত্র ৪ শতাংশ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি লোকের বয়স ৩০। ১৫ বছরের নিচের জনসংখ্যা এক-চতুর্থাংশ।
সুখী দেশের তালিকায় এশিয়ার সেরা পাঁচের শেষ স্থানটিতে আছে পর্যটন সমৃদ্ধ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর থাইল্যান্ড। রাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভ সত্ত্বেও ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস ইনডেক্সে তাদের অবস্থান অপরিবর্তিতই (৫৪তম) রয়ে গেছে। গড় আয়ু, পছন্দ বেছে নেওয়ার ক্ষমতা, আন্তঃব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং করোনাকে ভালোভাবে সামাল দেওয়াতেই তাদের এমন নৈপুণ্য প্রদর্শন। এশিয়ার সেরা ১০টি সুখী দেশের তালিকায় এরপর ক্রমান্বয়ে যারা রয়েছে, তারা হচ্ছে জাপান, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, কিরগিজস্তান ও মঙ্গোলিয়া। করোনা প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে ততোটা সফলতা দেখাতে পারেনি জাপান। এছাড়া ২০২০ সালে তাদের অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১৯ সালের পর এটিই তাদের প্রথম সংকোচন। অর্থনীতিসমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সেখানে আত্মহত্যার হার অনেক বেশি। এ বিষয়টি এমনই জটিল পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, জাপান প্রথমবারের মতো ‘মিনিস্টার অফ লোনলিনেস’ নিয়োগ দিয়েছে। একাকিত্ব নিরসনে সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম আয়োজন করার পাশাপাশি মিডিয়ায় আত্মহত্যাবিরোধী প্রচারকার্য চালানোয় নেতৃত্ব দেবেন তিনি।
—গ্লোবাল ফিন্যান্স অনুসরণে
