জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্ব উষ্ণায়ন একটি অবশ্যম্ভাবী পরিণতির দিকে লইয়া যাইতেছে এই মানবসভ্যতাকে। ইহার বিবিধ নিদর্শন এখন ঘন ঘন দেখা যাইতেছে। বিশ্বব্যাপী আমরা দেখিতে পাইতেছি শীত ও গরমের চরম অবস্থা, বিস্তীর্ণ ও প্রলম্বিত বন্যা, বিধ্বংসী দাবানলের ক্রমবর্ধমান প্রাদুর্ভাব। সম্প্রতি উত্তর-পশ্চিম ইউরোপ জুড়িয়া প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে জার্মানি ছাড়াও বেলজিয়াম, লাক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস এবং সুইত্জারল্যান্ডের মতো কয়েকটি দেশ জুড়িয়া এই বন্যা দেখা দেয়। বলা হইতেছে, ইউরোপে গত কয়েক দশকের মধ্যে ইহাই দেশটিতে সবচাইতে ভয়াবহ বন্যা। কিছুদিন ধরিয়া মৌসুমি বৃষ্টির কারণে চীনের মারাত্মক বন্যা দেখা দিয়াছে। স্থানীয় লোকেরা বলিতেছেন, তাহারা জীবনে কখনো এমন বৃষ্টি দেখেন নাই। চীনের কর্তৃপক্ষ বলিতেছে, এইরকম বন্যা অত্যন্ত বিরল। এই দিকে এই বত্সর মার্চ মাসে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বিগত ৬০ বত্সরের ইতিহাসে সবচাইতে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরিয়াই সতর্ক করিয়াছিলেন যে, মানুষের কর্মকাণ্ডের জন্য জলবায়ুতে যেই পরিবর্তন হইতেছে তাহার পরিণামে ঠিক এই রকম অতিমাত্রায় বৃষ্টিপাতের মতো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটিবে। আড়াই শতাব্দী পূর্বে শিল্পযুগের শুরুর পর হইতে বিশ্বের তাপমাত্রা ১.২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বাড়িয়া গিয়াছে এবং বিজ্ঞানীরা বলিয়া আসিতেছেন, বিশ্বের কার্বন নির্গমন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় হ্রাস করা সম্ভবপর না হইলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকিবে।
প্রকৃত অর্থে ‘জলবায়ু’ জিনিসটা পরিবর্তন হইবারই বিষয়! ইহাতে বিস্ময়ের কিছু নাই। যুগ যুগ ধরিয়াই পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন হইয়া আসিতেছে। পৃথিবীতে ইতিপূর্বে বরফ যুগ, উষ্ণ যুগ, বিবিধ প্রাকৃতিক পরিবর্তন অযুত-লক্ষ-নিযুত বত্সর ধরিয়া ঘটিয়া গিয়াছে। তবে বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের সহিত পূর্বেকার জলবায়ু পরিবর্তনের কিছু পার্থক্য রহিয়াছে। অতীতে জলবায়ু পরিবর্তন হইয়াছে অত্যন্ত ধীরে, হাজার হাজার বত্সর ধরিয়া। অন্যদিকে সতেরো শতকে শিল্পবিপ্লবের পর মাত্র কয়েক শতাব্দীতেই পৃথিবীর তাপমাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটিয়াছে। ইহার কারণ জলবায়ুর পরিবর্তন। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, এই পরিবর্তন পৃথিবীতে স্বাভাবিকভাবে ঘটিতে সময় লাগিত হাজার হাজার বত্সর। এখন প্রশ্ন হইল, বায়ুমণ্ডলে কার্বন জমা পড়িবার হার শূন্যে নামাইয়া আনা কি প্রায় অসম্ভব কাজ নহে? বলা যায়, আধুনিক অতি উন্নত জীবনযাপন ও সভ্যতার যাবতীয় বৈশিষ্ট্য গড়িয়াই উঠিয়াছে শিল্পবিপ্লবের হাত ধরিয়া। সুতরাং চাহিলেই শিল্পকারখানা-সৃষ্ট গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসারণ বন্ধ করা সম্ভব নহে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বিশ্বে বাংলাদেশ সর্ববৃহত্ ডেলটা। এই কারণে জলবায়ুর পরিবর্তন আমাদের জন্য অত্যন্ত ভয়ংকর ক্ষতির কারণ হইবে। বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর এক-তৃতীয়াংশ ঝুঁকিতে রহিয়াছে।
এই মুহূর্তে করোনা ভাইরাসের মহামারির জন্য সারা বিশ্ব এক অমানিশার মধ্যে ডুবিয়া রহিয়াছে। এই ব্যাপারেও বিশেষজ্ঞরা ইতিপূর্বে বলিয়াছেন যে, অরণ্য ধ্বংস এবং প্রাণিজগত্ ও মানুষের মধ্যে ব্যবধানটি ক্রমশ সংকুচিত হইবার ফলেই প্রাণীদের রোগ স্থানান্তরিত হইতেছে মানুষের দেহে। জলবায়ু পরিবর্তন লইয়া কয়েক বত্সর পূর্বে বান কি মুন একটি তাত্পর্যপূর্ণ কথা বলিয়াছিলেন। তাহার মতে, ‘প্ল্যান বি’ বলিয়া এই সমস্যার দ্বিতীয় কোনো সমাধান নাই, কারণ, আমাদের ‘প্ল্যানেট বি’ নাই। আমাদের যেহেতু দ্বিতীয় আরেকটি পৃথিবী নাই, কার্বন নিঃসারণ কমাইতে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ ব্যতীত আর কোনো উপায়ও নাই। ইউরোপের উন্নত দেশসমূহ এই ব্যাপারে সচেতন। তাহারা রাষ্ট্র উন্নয়নে পরিকল্পনা করিয়া থাকে ৫০ হইতে ১০০ বত্সরকে সামনে রাখিয়া। আর আমরা উন্নয়ন পরিকল্পনা করি পঞ্চবার্ষিকী সিস্টেমে। সেই পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করিতে দুই-তিন গুণ সময় বেশি লাগিয়া যায়। প্লানেট-বি-এর মতো আমাদের দ্বিতীয় আরেকটি বাংলাদেশও নাই। সুতরাং সামর্থ্য অনুযায়ী যতটুকু প্রস্তুতি গ্রহণ সম্ভব তাহার সবটুকুই এখনই লইতে হইবে। সময়ক্ষেপণেরও সময় নাই।
