আমার সন্তান ও পিতৃপুরুষের দেশ

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২১, ২১:৩৭

প্রায় ৩১ বছর আগে ১৯৯০ সালে ১৩-১৪ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে মাতৃভূমি ছেড়ে চলে আসি আমেরিকায়। তখনো আমাদের দেশ বলতে গেলে সাদাকালো টেলিভিশনের যুগ পার হতে পারেনি। কিন্তু আমেরিকা! কেবল বিশ্বের পরাশক্তি হিসেবেই নয়; অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং অভ্যন্তরীণ সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তখন পৃথিবী সেরা! আর এ কারণেই হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে দেশটির ভূখণ্ডে পা রাখার কয়দিন পরও যেন বিস্ময়ের ঘোর কাটছিল না। সবকিছু যেন স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল। নানা দেশের নানা ধর্ম-বর্ণ আর ভাষাভাষী মানুষের বাস দেশটিতে। প্রত্যেকে নিজ নিজ অধিকার ভোগ করছে। আছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। নাগরিকের অধিকার রক্ষায় সরকার যেন সবই করতে পারে।

এই যে মহামারি, এত ব্যয়বহুল জীবনযাত্রার মধ্যেও জনগণ বেকারত্ব তেমন টের পায়নি। তাদেরকে জীবিকার জন্য চিন্তিত হয়ে বাইরে ছুটতে হয়নি। সরকার জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা নিশ্চিন্তে ঘরে থেকেছে। জনগণ সরকারের নির্দেশ মেনে নেয় বিনা বাক্য ব্যয়ে। তাই বলে আমেরিকা যে একেবারে নিষ্কলুষ, তাও নয়। বর্ণবাদের ঘৃণিত বিষয়টি আজও আছে সেখানে।

যাহোক, এসব ভাবতে আর দেখতে দেখতেই স্বপ্নের মতো কেটে যায় কয়েক বছর। কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা রাখি। কিন্তু  স্বদেশ ত্যাগের মর্মপীড়া কিংবা দেশের প্রতি দায়িত্ব ও মমত্ববোধের সুমহান অনুষঙ্গটি তখনো আমার বোধে আসেনি। এরপর লেখাপড়া, ক্যারিয়ার গড়া, বিয়েশাদি, সন্তানের মুখ দেখে কেটে যায় আরো বেশকিছু বছর। এ সময় দেশের কথা, গ্রামের মানুষের কথা, নিকটাত্মীয়দের কথা প্রায়ই মনে পড়ত। মাঝেমধ্যে গ্রামের বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে কাটানো মধুর স্মৃতিগুলো রোমন্থন করে তাদেরকে হয়তো খুব মিস করতাম। দেশে বেড়াতে গেলে আবার ঠিক হয়ে যেত।

কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে হূিপণ্ডের কোনো একটা জায়গায় যেন চিনচিন ব্যথা অনুভূত হয়। কিছু একটা না পাওয়ার বেদনায় যেন বুকটা হাহাকার করে ওঠে। কোথায় যেন শূন্যতার ডামাডোল বেজে ওঠে। আমি জানি, এই ব্যথা শারীরিক সমস্যাজনিত নয়, মানসিক। আর এই হাহাকার, শূন্যতার ডামাডোল দেশকে ঘিরে, পূর্বপুরুষের ভিটেমাটিকে ঘিরে। যে মাটিতে আমি জন্মেছি, যেখানে কেটেছে আমার শৈশব ও কৈশোরের কিছু অংশ, সেই মাটির সোঁদা গন্ধ যেন আজও আমার গায়ে লেগে আছে। আমি কী করে সেই মাটির ঋণ শোধ করব সেই ভাবনা। আমার ভাবনায় ঘুরপাক খায়, নিজ দেশে ফিরে যাওয়া কিংবা আমার পরবর্তী প্রজন্ম তথা সন্তানদের তাদের পিতৃপুরুষের দেশে প্রতিষ্ঠিত করা, স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ করে দেওয়া, দেশের জন্য কিছু করা। 

কিন্তু আমার ভাবনায় ছেদ পড়ে। যখন দেখি কর্তৃপক্ষের খামখেয়ালিতে সাভারের তাজরীন গার্মেন্টস কিংবা রূপগঞ্জের জুস ফ্যাক্টরিতে শত শত শ্রমিক পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কিংবা লঞ্চডুবি, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষকে অকাতরে প্রাণ দিতে হয়। তখন আমি থমকে যাই। আমার ভাবনার জাল ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে যখন—এয়ারপোর্টে আমাকে অকারণেই হয়রানি হতে হয় কিংবা দেশকে ভালোবেসে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে গিয়ে সেখানেও পদে পদে হয়রানির শিকার আর ঘুষ দিতে বাধ্য করা হয়।

তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে বাংলাদেশ আজ ক্রমেই অর্থনৈতিক উন্নতির পথে। আছে উড়ালসেতু, ফ্লাইওভার, তৈরি হচ্ছে মেট্রোরেল, পদ্মা সেতুও নির্মাণের শেষের দিকে। অনেক বড় প্রজেক্টের সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বের বুকে এক উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার হাতছানি। এসব দেখলে গর্বে বুকটা ভরে ওঠে।

কিন্তু পত্রিকার পাতা কিংবা টেলিভিশনের স্ক্রিন ওপেন করলেই শত নেতিবাচক খবরে আমার মনে আতঙ্ক ভিড় করে। দেশের প্রতি আমার ইতিবাচক ভাবনার বাতিটি তখন ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসে। বলা বাহুল্য, একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিই সব নয়। সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা আর ন্যায়বিচারের মতো বিষয়গুলো একটি রাষ্ট্রের ভিত্তি, যা নাগরিকদের দেয় নিরাপদে সুখে-শান্তিতে বসবাসের নিশ্চয়তা। কিন্তু এখনো অধরাই বলা চলে।

ভাবছেন, বিদেশে গেলে দেশকে নিয়ে অনেকেই এরকম তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বড় বড় ডায়ালগ দেয়! সত্যিই হয়তো দেয়। তবে আমার এসব ভাবনা দেশকে হেয় করার মানসে কিংবা সরকারের সমালোচনার জন্যও নয়। আমার ভাবনায় সুদূর আমেরিকার মাটিতে জন্ম নেওয়া আমার উত্তরসূরি তথা সন্তানদেরকে দেশের মাটিতে প্রতিষ্ঠিত করার। ওরা পূর্বসূরির ভিটেমাটিতে ফিরে আসবে একদিন, সেই স্বপ্ন দেখি। কিন্তু তা কি আদৌ সম্ভব? এরই মধ্যে ওরা এই দেশ সম্পর্কে যথেষ্ট নেতিবাচক ধারণা পেয়েছে। ওদের এই নেতিবাচক ধারণা যতই বদ্ধমূল হচ্ছে আমার স্বপ্ন ততই দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। কারণ, ওরা এমন এক দেশে জন্মেছে যেখানে হিপোক্রেসি নেই, নেই খাদ্যে ভেজাল, বায়ুদূষণ, নেই চলতে-ফিরতে আক্রান্ত হওয়া কিংবা যানজটের ফাঁদে পড়ে মূল্যবান সময় নষ্ট হওয়ার ভয়। ওদের জন্মভূমি আমেরিকায় এসব অনিয়মের জায়গা নেই। বিশ্বের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে।

আমার তিন সন্তান বাংলাদেশ নামক দেশটিকে অনেক ভালোবাসে। ভালোবাসে এদেশের মাটি ও মানুষকে। স্বাধীনতার এবং ভাষার জন্য এদেশের মানুষের আত্মত্যাগ ওদেরকে আপ্লুত করে। কিন্তু এই আবেগ আর ভালোবাসা কি পারবে ওদেরকে এদেশে ফিরিয়ে আনতে? ওরা কি চাইলেই পারবে শুধু পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি বলে অনিশ্চিত জীবনকে বেছে নিতে? কেউ কি চায় অহেতুক সুখ ছেড়ে দুঃখের ভাগীদার হতে? কে না চায় একটু সুখ আর নিরাপদ আশ্রয় পেতে? খোদ দেশের মানুষই যেখানে একটু সুখ আর উন্নত জীবনের আশায় সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে জীবন বিলিয়ে দিচ্ছে, সেখানে কী করে আমার সন্তানরা জেনেশুনে সুখ আর নিরাপদ জীবন থেকে ঝুঁকি আর অনিশ্চয়তার জীবনকে বেছে নেবে?

তবু আমি আশাবাদী। আমার বিশ্বাস নিশ্চয়ই একদিন আমার দেশ পৃথিবীর বুকে একটি মর্যাদাবান দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। যেখানে থাকবে না রাজনৈতিক অস্থিরতা, হানাহানি, বিদ্বেষ, খাদ্যে ভেজাল, বায়ুদূষণ, যানজট, আর অনিয়ম-দুর্নীতি। নিশ্চয়ই একদিন এসব ঘুচে গিয়ে নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটবে। সেদিন গর্বের সঙ্গে সন্তানদের কাছে আবদার তুলব, চলো এবার তোমাদের আসল ঠিকানা বাংলাদেশে।

n লেখক :বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক