আমাদের দেশের মানুষ অকারণে বকবক করতে পছন্দ করে। এখানে শ্রোতার চেয়ে বক্তা বেশি। এমন কথানির্ভর জাতি দুনিয়ায় বড় বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। ‘বেশি কথা না বলা’ নিয়ে অনেক কথা বলা হয়, অনেক নিষেধ করা হয়, কিন্তু তাতে কেউ কান দেয় না। বেশি কথা বললেও কিন্তু সমস্যা হয় না, যদি সেটা কাজের কথা হয়। আবার অকাজের কথা বা বাজে কথা কম বললেও তা অনেকের কাছে অসহনীয় মনে হয়। কেউ কেউ আবার কিছু না বলেও অনেক কথা বলে যান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমনটি বলেছেন, ‘অনেক কথা যাও যে ব’লে কোনো কথা না বলি।’
মানুষ আসলে কথা না বলে থাকতে পারে না। বাক্প্রতিবন্ধী ছাড়া কমবেশি সবাই কথা বলে। কেউ বেশি কথা বলে কেউ বা কম। পৃথিবীতে এমনও মানুষ আছে, যারা হয়তো একদিন না খেয়ে থাকতে পারবে কিন্তু কথা ছাড়া থাকতে পারবে বলে মনে হয় না! একদিক থেকে দেখলে আসলে কথাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। সুখের কথা যদি আমরা কাউকে না বলি, সে সুখের মূল্য কী? আবার যখন দুঃখ আসে তখন কারো মুখের দুটো কথাই বাঁচার আশা জাগায়। কথাই অনেক সময় আনন্দ, আবার কথাই দুঃখ। কথার কারণেই ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়, আবার কথা দিয়েই তা ভাঙানো হয়। কথাই মানুষকে বড় করে, কথাই আবার মানুষকে নিচে নামায়। কথাতেই সত্য প্রকাশ পায় আবার মিথ্যাও কথার মাধ্যমেই আসে। সবটা আসলে নির্ভর করে আমাদের মর্জির ওপর। আমরা কোন কথা মুখ দিয়ে বলার জন্য বেছে নেব। আর কোন কথাটা এড়িয়ে চলব।
অনেকে কম কথা বলেন, কাজ বেশি করেন। কেউ কথা বেশি বলেন, কাজ কম করেন। অনেকে যতটুকু বলেন, ততটুকু করেন। কেউ আবার না করেও বলেন। আর কেউ না বলেও করেন। এই কথা ও কাজের ক্ষেত্রে কে ভালো কে মন্দ, তা সবাই জানেন। তার পরও একটা মান বা স্ট্যান্ডার্ড বোধহয় আমাদের চারপাশ থেকেই বোঝার আছে।
কম কথা বলে যে কাজ করে যায়, তার কাজই তাকে মানুষের কাছে স্মরণীয় করে রাখে। কথার মানুষ আর কাজের মানুষ এক নয়। অনেকে নিভৃতচারী, কেবল কাজই করে যান। আপাতদৃষ্টিতে তাদের কেউ অনেকটা অবহেলিত কিংবা তার সময়ে তেমন দাম পান না। কিন্তু মৃত্যুর পর ঠিকই তার কাজ তাকে অবিস্মরণীয় করে রাখে। কাজ করলে তা বলা দরকার, তাতে হয়তো মানুষ বুঝতে পারে। কাজ না করে বলাটা নিশ্চয়ই সমীচীন নয়। অল্প করে বেশি বলাও উচিত নয়।
তবে কথা বড় মারাত্মক জিনিস। কবি লিখেছেন : ‘মধুবাবুর কথার বিষে, পাড়ার লোকে হারায় দিশে’ অর্থাত্ কথায় সত্যি বিষ আছে। নাম ‘মধু’ বাবু হলে কী হবে, কথার জ্বালায় সবাইকে অতিষ্ঠ করতে পারেন তিনি। কথায় কী হয়? এ কথার জবাবটা বোধহয় সহজ নয়। কথায় অনেক কিছু হয়। হতে পারে। আবার নাও হতে পারে। মূল ব্যাপার হলো কোন কথা, কেমন কথা, কে বলছেন, কাকে বলছেন! ভাবুকরা বলে থাকেন, ‘কথা শতধারায় বয়’।
তবে কী বলবেন, কতটুকু বলবেন, কতটুকু নিষেধ করবেন, কাকে নিষেধ করবেন, সেটা খুব হিসাব করে বলতে হবে। না হলে সম্মান-ইজ্জত কিন্তু ধুলায় লুটাতে পারে! কীভাবে? তাহলে এক বাচ্চার কাহিনি শুনুন।
এক আত্মগর্বী পুলিশ সুপার ছেলেকে শিখিয়েছেন, কেউ পরিচয় জিগ্যেস করলে নিজের নাম বলার সঙ্গে সঙ্গে বলবে যে, আমি এসপি আবদুল খালেকের ছেলে! কিন্তু মায়ের মনে হলো, এরকম অহংকার দেখানো ঠিক নয়, তাই ছেলেকে নিষেধ করলেন, এরকম যেন না বলে। একদিন বাড়িতে অনেক অতিথি এসেছেন। একজন বাচ্চাটিকে জিগ্যেস করলেন, তুমি খালেক সাহেবের ছেলে না? বাচ্চাটা বলল, আব্বু তো তা-ই বলে, কিন্তু আম্মু মানা করে!
তবে কথা বলার ক্ষেত্রে বা ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন পর্যন্ত বাঙালি মধ্যবিত্তদের মধ্যে অন্তত একটা আগল বা রাখঢাক ছিল। সব কথা বলতে নেই, সবার সামনে বলতে নেই, সব জায়গায় বলতে নেই, বললেও লিখতে নেই এরকম কতকগুলো গণ্ডি ছিল। ফলে ভাবনার জগতে যা-ই থেকে থাক না কেন, সেটা সব সময় প্রকাশ্যে এসে পড়ত না। ব্যাবহারিক সৌজন্য বজায় থাকত। গত তিন দশকে সেই ভব্যতার আড়াল একেবারে হাওয়া হয়ে গেছে। এখন আমরা যে কেউ যে কাউকে যা খুশি তা-ই বলছি। নম্র-ভদ্র-সভ্য শব্দ ব্যবহার ভুলে গালাগালকেই একমাত্র ব্যাবহারিক ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছি। এখন রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী আর শ্রমজীবী-নিরক্ষর মানুষের ভাষায় খুব একটা তফাত নেই। এক্ষেত্রে আমরা সাম্যবাদী হয়ে গেছি। খিস্তি-খেউড়-গালাগাল আমাদের দৈনন্দিন ব্যাবহারিক ভাষায় পরিণত হয়েছে। ব্যক্তিপরিসর আর জনপরিসরের মধ্যে সীমারেখা ঘুচে গিয়েছে।
যেসব শব্দ ছাপার অযোগ্য বলে গণ্য হতো, সেসব আজ শরতের মেঘের মতো জননেতার মুখে, বুদ্ধিজীবীর লেখায় কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়ালে ভেসে বেড়াচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে সংবাদ কিংবা মতামতের নিচে সাংবাদিকদের প্রতি যে কদর্যতর হুমকি দিয়ে মন্তব্য পোস্ট করা হয়, কিছুদিন আগেও যা অকল্পনীয় ছিল। এখন এসব কুকথা মানুষ লিখে আনন্দ পাচ্ছে, বলে আনন্দ পাচ্ছে, যারা পড়ে কিংবা শুনে তারাও নিশ্চয়ই আনন্দ পায়। এসবের চাহিদা বা বাজারমূল্য যদি না-ই থাকবে, তাহলে সবাই এসব গালাগাল-খিস্তি-খেউড়ের প্রতি এমন উত্সাহ দেখাবে কেন? কুকথা যদি কোনো ‘প্রোডাক্ট’ হয়, তার ক্রেতা আমরা সকলেই। আর যার কাটতি আছে, তাকে বাজার থেকে হটাবে কে? সবার ওপরে বাজার সত্য—এ কথা আজ রাজনীতির মঞ্চেও খাটছে।
আমরাও দিনদিন সর্বংসহা হয়ে যাচ্ছি। প্রতিবাদের ভাষা আর সত্য উচ্চারণের সাহস আমরাও হারিয়ে ফেলছি। আমাদের সামনে কেউ কাউকে গালাগাল করলেও আমরা এর প্রতিবাদ করি না। এমনকি আমাদের গালি দিলেও না শোনার ভান করি। এ যুগে আমরা তেমন সাহস দেখাই না। এ যুগের মানুষের প্রাণের মায়া বেশি। বর্তমানে কেউ যদি সত্য বলে তার পেছনেও মতলব থাকে। আর সত্য অস্বীকার করা, সত্য গোপন করা কিংবা মিথ্যা বলার পেছনে তো উদ্দেশ্য থাকেই। প্রাণের ভয় হয়তো সব সময় থাকে না; কিন্তু অনেক কিছুই হারানোর ভয় থাকে।
তবে ইদানীং শুধু কথার মধ্যেই নয়, জীবনের সবখানেই বিষ! এক কবি দুঃখ করে বলেছেন,
‘দিব্যি বেঁচে আছি খাবারের বিষে, বিষের খাবারে
বিষ-বাষ্প নিঃশ্বাসে ভরে নিচ্ছি ফুসফুস, সরোবরে
বিষ হজম মনের একান্ত গহ্বরে
চোখের বিষ
মনের বিষ
ধনের বিষ
ভালোবাসার নামে ঈর্ষার বিষ জ্বলে আত্ম অহংকারে!’ তবে সব সময় সব বিষ কাজ করে না। বিষে ভেজাল তো আছেই, বিষ নিয়ে ভুলও হতে পারে। হয়ও। পরিশেষে এ বিষয়ে একটি পুরোনো গল্প।
বিমর্ষ এক লোক একটি ছাদ-রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসলেন, এক গ্লাস লাচ্ছি দিতে বললেন ওয়েটারকে। অন্য দিনের চেয়ে একটু তাড়াতাড়ি চলে এলো লাচ্ছির গ্লাস। তিনি লাচ্ছির গ্লাস সামনে রেখে খানিকক্ষণ বসে থাকলেন। খাওয়ার আগে ভাবলেন, বাইরের দুনিয়াটাকে একটু ভালো করে দেখবেন। রেলিংয়ের ধারে গিয়ে খানিক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। টেবিলে ফিরে দেখলেন তার লাচ্ছির গ্লাস অন্য আরেক জনের হাতে এবং তিনি বেশ আয়েশ করে তার সেই গ্লাস থেকে লাচ্ছি খাচ্ছেন। এই দৃশ্য দেখে তিনি চেয়ারে বসে কাঁদতে শুরু করলেন। সামনের লোকটি বিব্রত হয়ে বললেন প্লিজ কাঁদবেন না, এক গ্লাস লাচ্ছিই তো! আমি আপনাকে দুই গ্লাস লাচ্ছি কিনে দিচ্ছি।
শুনে প্রথম ভদ্রলোক বললেন, আমি সেজন্য কাঁদছি না।
তাহলে? জানতে চাইল দ্বিতীয় ভদ্রলোকটি ।
প্রথম ভদ্রলোকটি বলতে শুরু করলেন, ঘুম থেকে উঠেই বউয়ের সঙ্গে বিরাট ঝগড়া হলো; বাস এ মানিব্যাগ ছিনতাই হলো; অফিসে গিয়ে দেখি চাকরি চলে গেছে; বাড়িতে এসে দেখি বউ বাপের বাড়ি চলে গেছে। এত কিছুর পর ত্যক্তবিরক্ত হয়ে রেস্টুরেন্টে এসে বিষ খাব বলে লাচ্ছির সঙ্গে বিষ মিশিয়েছি, সেটাও আপনি খেয়ে ফেললেন? আমার আসলে কপালটাই মন্দ!
n লেখক :রম্যরচয়িতা
