বিশ্বকে স্থবির করে দিয়েছে মহামারি করোনা। ২০২০ সালের শুরু থেকে হঠাত্ করে বিশ্বমানবের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ছন্দপতন ঘটায় কোভিড-১৯ ভাইরাস। ভয়াবহ মৃত্যু এবং রোগের সংক্রমণ বৃদ্ধিতে বিচ্ছিন্নতায় জীবন কাটাচ্ছে মানুষ। দেশে দেশে চলছে লকডাউন, কার্ফিউসহ নানান বিধিনিষেধ। বন্ধ করা হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শপিংমল, প্রেক্ষাগৃহ, গণজমায়েত স্থানসহ অফিস-আদালত। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত মহামারি পর্যালোচনার ইউনেসকো রেকর্ডে বিশ্বের ৮০টি শহর করোনা ঠেকাতে জরুরি আইন প্রণয়ন করেছে।
মিডিয়া রাইটস ওয়াচডগ, রিপোর্টাস উইদাউট বর্ডার-এর মতে গত বছরের শেষ নাগাদ বিশ্বের ২৯টি দেশের কমপক্ষে ১২ জন সাংবাদিক কোভিড-১৯-সংক্রান্ত প্রতিবেদন দেওয়ায় আক্রমণের শিকার হয়েছেন। আশ্চর্যের বিষয়, বিশ্বের কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো করোনা মহামারিকে তাদের প্রতিপক্ষ ও সমালোচকদের দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। উদাহরণস্বরূপ, চীনে ভিন্নমতাবলম্বী একজন লেখককে করোনা থেকে রক্ষার অজুহাতে গ্রেফতার করে ক্ষমতাসীন সরকার। উগান্ডা সরকারের দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনা করে বই প্রকাশ করায় একজন লেখককে কোভিড-১৯ বিধির অধীনে গ্রেফতার করে। জিম্বাবুয়েতে শুধু সরকারের সমালোচনা করায় একজন লেখক ও তার বন্ধুকে মাস্ক পরা অবস্থায় ফাঁকা রাস্তা থেকে গ্রেফতার করেছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবমাননা ও মানহানির আইনের অপপ্রয়োগ দীর্ঘকাল ধরে থাকলেও সরকারের সমালোচনা দমনে কোভিড-১৯ বিধিনিষেধকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি করোনা ভাইরাস প্রতিকারের একটি মিথ্যা পরামর্শ দিচ্ছেন—এমন কার্টুন প্রচার করায় একজন সংবাদকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়।
কোভিড-১৯-এর বিধিনিষেধের কথা বলে সারা বিশ্বে ডিজিটাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে কঠোর হস্তে দমন করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ফ্রিডম হাউজের মতে, বিশ্বের কমপক্ষে ২৮টি দেশে অনলাইন ওয়েব সাইট ব্লক করা হয়েছে, করোনা পরিসংখ্যান বিষয়ক তথ্য এবং সরকারের সমালোচনা বিষয়ক মন্তব্য মুছে ফেলতে বাধ্য করা হয়েছে। এর মধ্যে চীন, ভারত, বেলারুশ, ভেনিজুয়েলা, মিশর, হাঙ্গেরি উল্লেখযোগ্য। মিয়ানমার এবং ইথিওপিয়ার জনগণকে করোনা ভাইরাসের প্রভাব এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রকৃত তথ্য দেওয়া থেকে অন্ধকারে রেখেছে সে দেশের সরকার। লকডাউন ও বিধিনিষেধ সত্ত্বেও নির্বাচন, পুলিশের বর্বরতা, গণবিক্ষোভ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনা বিশ্বে ঘটেছে এবং এখনো চলছে। বেলারুশ, উগান্ডা, নাইজেরিয়া, তানজানিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছে। বিক্ষোভগুলো ঠেকাতে গ্রেফতার, সহিংসতা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ এবং গণমাধ্যমের ওপর হামলা হয়েছে। বেলারুশে শত শত লেখক, শিল্পীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। করোনাকালীন এই কঠিন সময়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের চিত্রও বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে ভিন্ন নয়। বিগত এক দশকে দেশে গণমাধ্যমের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও রাজনৈতিক প্রভাব ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খড়েগর কারণে গণমাধ্যমের পেশাদারিত্ব ও স্বাধীন তথ্যপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। কোভিড-১৯ মহামারিকালে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের পেশাগত ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি প্রকট হয়েছে। অসংখ্য গণমাধ্যমকর্মী চাকরিচ্যুত হয়েছেন। বেতনের হার কমেছে অনেকের। অবৈতনিক ছুটি দেওয়া হয়েছে অনেককে। আবার অনেকে পেশা পরিবর্তন করতেও বাধ্য হয়েছেন।
করোনা অতিমারিকালে সাংবাদিকদের মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহে প্রতিকূলতা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও স্পর্শকাতর প্রতিবেদন তৈরি ও প্রকাশ দুরূহ হয়ে পড়ছে। আবার সংবাদ প্রকাশের দায়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ফাঁদে পড়তে হচ্ছে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীকে। সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত রোগীদের খাবার পরিবেশনে অনিয়মের সংবাদ করায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে তিন জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে। একই আইনে কারা-অন্তরিন অবস্থায় লেখক মুশতাক আহমদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মৃত্যু ঘটেছে।
যে সংবিধানের ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের আজকের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সে সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে দেখতে পাই, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদানের পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক, মালিকানা ও আইনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নানামুখী চাপ ও বিধিনিষেধের বেড়াজালে সাংবিধানিক এই অধিকার মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। করোনাকালীন এই সময়ে গুজব ও ভুয়া তথ্য নিয়ন্ত্রণ ও জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সংবাদপত্রের ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন অত্যাবশ্যক তেমনি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনও সময়ের দাবি।
n লেখক : সেক্রেটারি জেনারেল, পেন বাংলাদেশ
