করোনাকালে বেকারের দীর্ঘশ্বাস

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২১, ২১:৩৮

করোনাকালে গত অর্থবছর (২০২০-২০২১) এলোমেলো ছিল। ২০২১ সালে এসেও করোনা যেন আরো ভয়াবহ! যদিও নতুন বাজেটে বেকারদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো সুখবর নেই! এবার সেশনজট, চাকরির বয়স ও বেকারভাতা নিয়ে পর্যালোচনা করা যাক। দীর্ঘদিন ধরে সবধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে সেশনজট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। করোনাকালে চাকরির বিজ্ঞপ্তি কমে গেছে। চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা সময়মতো হচ্ছে না। করোনাকালে হাজার হাজার বেকারের চাকরিতে প্রবেশের বয়স শেষ হয়ে গেছে, অনেকের চাকরির বয়স শেষ হওয়ার পথে। ফলে স্বাভাবিকভাবে চাকরিতে যোগদানের বয়স বাড়ার দীর্ঘদিনের দাবি করোনাকালে আরো জোরালো হয়েছে। বেকারত্বের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে অনেক সময় বেকার তরুণের আত্মহত্যার খবরও শোনা যায়! যোগ্যতা অনুযায়ী সময়মতো তরুণদের কর্মসংস্থান না হওয়ায় হাজার হাজার বেকার তরুণের স্বপ্ন ও তাদের পরিবারের ঘুরে দাঁড়ানোর পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।  

করোনাকালে চাকরিপ্রত্যাশী বেকার তরুণ জনগোষ্ঠীর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সবচেয়ে বেশি। করোনার এই ভয়াবহ দুর্যোগের পরিসমাপ্তি কবে ঘটবে তাও নিশ্চিত করে বলা মুশকিল! বর্তমান প্রেক্ষাপটে লাখ লাখ চাকরিপ্রত্যাশী বেকার তরুণের চাকরির বয়স শেষ হওয়া ও সম্ভাব্য সেশনজটের কথা চিন্তা করে চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানো সময়ের দাবি। শুধু করোনাকালের এ সময়ে নয়, চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর দাবিটি দীর্ঘদিনের। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় সংসদের ভেতর-বাইরেও ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে চাকরিতে প্রবেশের বয়স যৌক্তিকভাবে বাড়ানোর আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল। গড় আয়ুও এখন বেড়ে ৭২ বছর। এছাড়া মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রায় সবকিছুতেই পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিত্সা, ব্যবসা, প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও গড় আয়ু ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। এমনকি অবসরের বয়সসীমাও বেড়েছে। কিন্তু চাকরিতে প্রবেশের বয়স আর বাড়ানো হয়নি। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বছরের পর বছর শুধু বেড়েই চলেছে। বিনিয়োগ না বাড়ায় কর্মসংস্থানও বাড়ছে না। সরকারি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সর্বশেষ গবেষণা বলছে, শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে সম্পূর্ণ বেকার ৩৩ দশমিক ৩২ শতাংশ। প্রত্যেক বছর গেল বছরের চেয়ে আরো বেশি চাকরিপ্রত্যাশী বাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু চাকরির ক্ষেত্র ও পদসংখ্যা সীমিত হওয়ার কারণে চাকরির প্রতিযোগিতামূলক বাজারে চাকরি পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ১৬০টিরও বেশি দেশে এখন চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০-এর অধিক। বাস্তবতা এটাই যে, এদেশে বর্তমানে লাখ লাখ ছেলেমেয়ের উচ্চশিক্ষা আছে, সনদ আছে কিন্তু চাকরি নেই!

উন্নত ও উন্নয়নশীল অনেক দেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণ বেকারদের কর্মসংস্থান হওয়ার আগ পর্যন্ত রাষ্ট্র ‘বেকারভাতা’ দিয়ে থাকে। ভালো হতো যদি করোনাকালের এ বছরের বাজেটে সরকার বেকারভাতার কোনো ঘোষণা দিত। করোনাকালে বেকার তরুণদের টুকটাক আয়ের পথও বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকে নিজের পরিবারের দিকে তাকিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে লোকলজ্জা ভুলে পথে নেমেছে। বেকার তরুণরা এ রাষ্ট্রের সম্পদ। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাষ্ট্র লাখ লাখ টাকা ভর্তুকি দিয়ে তরুণ শিক্ষার্থীদের দেশ গড়ার কাজে গড়ে তোলে। তাই করোনাকালে উচ্চশিক্ষিত বেকার তরুণদের জন্য বেকারভাতা চালু করা দরকার। বয়সে সাময়িক ছাড় নয়, দরকার চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানো। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সম্ভাব্য সেশনজটের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া, করোনাকালে চাকরিপ্রত্যাশী বেকার তরুণদের চাকরির বয়স বিবেচনা ও দীর্ঘদিনের যৌক্তিক দাবির প্রেক্ষাপটে এখনই চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ বছর করা দরকার। কর্মসংস্থানহীন করোনাকালের পরিবর্তিত বাস্তবতা বিবেচনায় এর বিকল্প নেই।

ঢাকা