পরিবেশের শুশ্রূষা প্রয়োজন

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২১, ২১:৩৯

সতীর্থ রহমান

বেশ কিছু গবেষণায় বাংলাদেশের সামাজিক বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে, টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে চারটি বিষয়কে বিবেচনায় নিতে হবে—জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দারিদ্র্য ও সুশাসন, প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট আপদ থেকে উদ্ভূত দুর্যোগ, মানুষের জীবন ও জীবিকার উপায়। বাংলাদেশের শতকরা ৮০ ভাগ লোক তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কৃষি সম্পর্কিত ক্ষেত্রে সম্পাদন করে। এর ফলে পরিবেশের ওপর মারাত্মক চাপ পড়ে এবং ভূমির উর্বরতা হ্রাস, পানি ও বাতাস দূষণ, প্রাকৃতিক বনভূমির ক্ষতি ইত্যাদি দেখা দিচ্ছে। এছাড়া উচ্চ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও ব্যাপক দারিদ্র্য ও পরিবেশের ক্ষতিসাধন করে থাকে।

মানুষ যেসব জিনিস ব্যবহার করে তার পরিত্যক্ত বিষাক্ত পদার্থই দূষণের সৃষ্টি করে। ধোঁয়া, ধুলাবালি, কীটনাশক, তেজস্ক্রিয় পদার্থ, জীবাশ্ম জ্বালানির ক্ষতিকর প্রভাব ইত্যাদি কারণে বায়ুদূষণ ঘটছে। কলকারখানার বর্জ্য পদার্থ পানি দূষিত করে। কীটনাশক ও রাসায়নিক সার পানিতে মেশে, তেলবাহী জাহাজ থেকে তেল ছড়িয়ে সাগরের পানি দূষিত হয়। দূষিত পানি সংক্রামক রোগ ছড়ায়। মাছ ও ফসলের মধ্যে বিষ জমে। সেসব খেয়ে মানুষ ভোগে বিষক্রিয়ায়। যানবাহনের বিকট শব্দ থেকে হয় শব্দদূষণ। কলকারখানার শব্দ, গাড়ির হর্ন, মাইকের আওয়াজ, বোমাবাজির শব্দ প্রভৃতি শব্দদূষণ সৃষ্টি করে। এটা মানুষের স্নায়ুবিক বৈকল্য, নিদ্রাহীনতা, শিরঃপীড়া, মানসিক রোগ ইত্যাদির কারণ।

বর্তমানে শহর, নগর ও বন্দরে বস্তিবাসী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী পঁচিশ বছরে নগর ও শহরবাসী জনসংখ্যার হার গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ৬০ শতাংশে। ক্রমাগতভাবে জনসংখ্যা বাড়ার ফলে এ বাড়তি জনসংখ্যাকে জায়গা দিতে গিয়ে শহরে দেখা যাচ্ছে পরিবেশগত নানা সমস্যা। হারিয়ে যাচ্ছে সবুজের সমারোহ। অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে বায়ুদূষণ ও তাপমাত্রা। শহর ও নগরে বাসযোগ্য পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে সবুজ বৃক্ষকে জায়গা করে দিতে হবে প্রতিটি পরিকল্পনায়। সবুজ নগরী তথা পরিবেশবান্ধব শহর গড়ে তুলতে পারলেই আগামী প্রজন্মের জন্য উন্নত ভবিষ্যত্ নিশ্চিত করা যাবে।

তাপমাত্রা বৃদ্ধি ধান চাষের ওপর অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ইরি মৌসুমে বৈরী আবহাওয়ার কারণে দিনাজপুরের দক্ষিণ কোতোয়ালির বিস্তীর্ণ ইরিখেত জ্বলে গেছে। সেচ সংকট, খরা, রোগ ও পোকামাকড় আক্রমণে এবার ব্যাপক হারে ধান চিটা পড়েছে। ভূপৃষ্ঠে পানি কমে যাওয়া এবং ভূগর্ভ থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও অস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে যায়। এতে শুষ্ক মৌসুমে গাছপালা মরে যেতে শুরু করে। উত্তরাঞ্চলের অধিকাংশ শহর ও গ্রামাঞ্চলে নলকূপে পানি উঠছে না। পানির লেয়ার নিচে নেমে যাওয়ার কারণে টিউবওয়েল ও সেচযন্ত্রগুলোর মধ্যে প্রায় অর্ধেকেই পানি ওঠা বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু টিউবওয়েলে কোনোরকমে পানি ওঠে। শহরে সাপ্লাই পানির অবস্থাও খারাপ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানির মেশিন চালু রেখেও পানির ট্যাংকি ভর্তি করা যায় না। উদ্ভিদ সমৃদ্ধ এলাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি, তাই পানির স্তর ওপরে থাকে। বৃক্ষ স্বল্পতার কারণে বৃষ্টি স্বল্পতা দেখা দেয়। ফলে পানির স্তর নিচে চলে যায়।

হযরত মুহাম্মদ (সা) প্রকৃতি-পরিবেশ সংরক্ষণে বৃক্ষরোপণের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি পবিত্র মক্কা ও মদিনা নগরীর একটি বিশেষ অঞ্চলকে সংরক্ষিত এলাকা বলে ঘোষণা করেন। এসব এলাকায় গাছ কাটা এবং বন্য পশুপাখি শিকার করা আজো নিষিদ্ধ। তাই বৃক্ষরোপণ ও সামাজিক বনায়ন না করে কেবল গাছ কেটে কাজে ব্যবহার করায় বৃষ্টির অভাব হচ্ছে, পৃথিবীর তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়েছে এবং পরিবেশ হচ্ছে বিনষ্ট।

দিনাজপুর