জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে চিকিত্সকদের ধরপাকড়ের অভিযোগ
মিয়ানমারে মারাত্মক কোভিড-১৯ সংক্রমণের ঢেউয়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিপর্যয়কর অবস্থার মধ্যেই চিকিত্সক ধরপাকড়ের অভিযোগ উঠেছে জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে। সেনাবাহিনী স্বাধীনভাবে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিত্সা করা কয়েক জন চিকিত্সককে গ্রেফতার করেছে। জান্তাবিরোধী বিক্ষোভে চিকিত্সকদের সমর্থনের জেরেই তাদের এভাবে ধরপাকড় করা হচ্ছে বলে চিকিত্সকদের সহকর্মী ও গণমাধ্যম বলছে। সিএনএন
গত ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকেই বিক্ষোভ, অসহযোগ আন্দোলনে উত্তাল হয়েছে মিয়ানমার। দেশ জুড়ে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে সাধারণ মানুষ। বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালিয়েছে। দমনপীড়নে ৯০০-র বেশি মানুষ মারা গেছে। আটক হয়েছে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী। এসেছে নির্যাতনের খবরও। জান্তাবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন চিকিত্সক, স্বাস্থ্যকর্মীদের অনেকেই। তাদের মধ্যে বহু চিকিত্সক গ্রেফতার হয়েছেন। আবার ধরপাকড়, নির্যাতনের ভয়ে অনেক স্বাস্থ্যকর্মীই অন্তরালে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে হাসপাতালগুলোতে সংকট দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কোভিড-১৯-এর সবচেয়ে মারাত্মক সংক্রমণের ঢেউয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমার। কিন্তু হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিত্সা সরঞ্জাম নেই। ঘাটতি রয়েছে অক্সিজেনেরও। স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট থাকায় গুরুতর বহু কোভিড রোগী হাসপাতালে যাচ্ছেন না। এতে অনেকে ঘরেই মারা যাচ্ছেন। মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় নগরী ইয়াঙ্গুনে অক্সিজেন সংকট দেখা দিয়েছে। কোভিড আক্রান্ত অনেকের পরিবারের সদস্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন অক্সিজেন সিলিন্ডার ভরে নেওয়ার আশায়। মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় ভিড় বাড়ছে সমাধিক্ষেত্রে। সেখানে শোকার্ত মানুষেরা ভিড় করছে, বাড়ছে কফিন। ফলে শেষকৃত্য কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের টানা কাজ করতে হচ্ছে।
বুধবার জান্তা সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন কোভিড শনাক্ত হয়েছে ৬ হাজার ৯৩ জন। এ নিয়ে দেশে সংক্রমণ ২ লাখ ৪৬ হাজার ৬৬৩ ছাড়িয়েছে। আর গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন মারা যাওয়ার সংখ্যা ২৪৭। সরকারি হিসাবে, মিয়ানমারে এ পর্যন্ত কোভিডে মৃতের সংখ্যা বলা হচ্ছে ৫ হাজার ৮১৪ জন। কিন্তু এর সঙ্গে একমত নন চিকিত্সক ও স্বেচ্ছাসেবীরা। তারা বলছেন, প্রকৃত সংখ্যা সরকার প্রকাশ করছে না। সিএনএনের সঙ্গে কথা বলা কয়েক জন চিকিত্সক ও স্বেচ্ছাসেবী বলেছেন, জান্তা কোভিডকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা জানান, অক্সিজেন বিক্রি ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে জান্তা সরকার। তাছাড়া, সামরিক বাহিনী পরিচালিত হাসপাতালগুলোতে সাধারণ রোগী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে কারাগারগুলোতেও। জান্তার ভয়ে অনেকে বাসায় চিকিত্সা নিচ্ছেন। আবার যারা হাসপাতালে যাচ্ছেন, তাদের অনেকে চিকিত্সা পাচ্ছেন না। কারণ, সেখানে পর্যাপ্ত অক্সিজেন নেই, শয্যা নেই, সেবা দেওয়ার মতো যথেষ্ট স্বাস্থ্যকর্মী নেই। এ পরিস্থিতিতে জান্তাবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া কয়েক জন চিকিত্সক অনেক সময় টেলিফোনে কিংবা রোগীর বাড়িতে গিয়ে বিনা মূল্যে চিকিত্সা করার চেষ্টা করছেন।
কিন্তু অন্যান্য আরো চিকিত্সকের বক্তব্য এবং গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, গত কয়েক সপ্তাহে মিয়ানমারের দুই বৃহত্তম নগরী ইয়াঙ্গুন এবং মান্দালয়ে সেনাবাহিনী কোভিড রোগীদের চিকিত্সা দেওয়া ৯ জন স্বেচ্ছাসেবী চিকিত্সককে আটক করেছে। সেনাবাহিনী পরিচালিত রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কাউন্সিল এক বিবৃতিতে ইয়াঙ্গুনে পাঁচ চিকিত্সককে গ্রেফতার করার খবর অস্বীকার করেছে। কিন্তু মান্দালয়ে চিকিত্সক গ্রেফতারের খবরের ব্যাপারে তারা কিছু উল্লেখ করেনি। এ ব্যাপারে জান্তা সরকারের মুখপাত্রের সঙ্গে রয়টার্স যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কোনো সাড়া মেলেনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিত্সক জানিয়েছেন, ‘মান্দালয় গ্রুপ- মেডিক্যাল ফ্যামিলি’ থেকে তার চার সহকর্মী গ্রেফতার হয়েছেন। অন্যদিকে, ইয়াঙ্গুনে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিত্সা দেওয়া একটি চিকিত্সক দলের তিন চিকিত্ককে সেনারা কৌশলে গ্রেফতার করেছে। এছাড়া, ইয়াঙ্গুনের নর্থ ডাগন জেলায় কার্যালয়ে তল্লাশি চালিয়ে দুই চিকিত্সককে গ্রেফতার করার খবর জানিয়েছে মিয়ানমারের আরেকটি নিউজ পোর্টাল। গণমাধ্যমের এই দুই খবরই জান্তা সরকার অস্বীকার করেছে।
