এবার কোরবানির পশুর চামড়ার দর গত বছরের তুলনায় বাড়িয়ে নির্ধারণ করায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা যে আশার আলো দেখেছিলেন, তা ঈদের দিন বুধবার বিকালেই মিলিয়ে গেছে। ঈদের দিন সকালের দিকেও চামড়ার দাম মোটামুটি থাকলেও বিকাল হতেই দাম পড়তে থাকে। পরে দাম এতটাই কমে যায় যে, অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া বিক্রি না করে ক্ষোভে-কষ্টে রাস্তায় ফেলে দিয়েছেন। গত বছর কোরবানির ঈদেও এমন দৃশ্য দেখা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু রাজধানীতেই নয়, চামড়ার দামের এই অবস্থা সারা দেশেই। মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমিয়ে দিয়েছে। আর এর পেছনে কাজ করেছে হাতেগোনা বড় বড় কয়েক জন ট্যানারি মালিক। কম দামে চামড়া কিনতেই তারা এ কাজ করেছেন বলে অভিযোগ তাদের। তারা আরো বলেন, গত ২ বছর ধরেই কোরবানির পশুর চামড়ার বাজার খুবই খারাপ। চামড়া কিনে লোকসান হওয়ায় অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ীই ইতিমধ্যে এ ব্যবসা ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু এবার গত বছরের তুলনায় কাঁচা চামড়ার দর বাড়িয়ে নির্ধারণ করায় করোনা সংকটকালীন এ সময়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা আশার আলো দেখেছিল। কিন্তু এবারও সিন্ডিকেট করে একটি চক্র চামড়ার দাম কমিয়ে দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগেও একটি বড় গরুর চামড়ার দাম ছিল ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। কিন্তু এবার ৫০০ টাকার ওপরে চামড়া বিক্রি হয়েছে খুবই কম। অধিকাংশ গরুর চামড়াই (লবণ ছাড়া) বিক্রি হয়েছে ২০০ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকার মধ্যে। ফলে অনেক মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীর কেনা দামই ওঠেনি। অথচ ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের সঙ্গে বৈঠক করেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চামড়ার দর নির্ধারণ করেছিল।
তবে আড়তদাররা জানিয়েছেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে তাদের অনেক বকেয়া টাকা আটকে রয়েছে। ট্যানারি মালিকরা তা পরিশোধ করছে না। ফলে তারা চাহিদা মতো চামড়া কিনতে পারছে না। এর প্রভাব পড়েছে চামড়ার দামের ওপর।
রাস্তায় পরিত্যক্ত চামড়ার স্তূপ
সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়ার দাম না পেয়ে রাস্তার ওপর চামড়া ফেলে গেছেন। ঈদের পরদিন গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর পোস্তা ও ঢাকেশ্বরী মন্দিরের আশপাশের আড়তের সামনের সড়ক ও লালবাগ সড়কেও অনেক চামড়া পড়ে ছিল। কেনা দামেও এসব চামড়া বিক্রি করতে না পেরে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এসব চামড়া রাস্তায় ফেলে গেছেন।
মিরপুরের বাসিন্দা কবির ও আমিনুল পাঁচ-ছয় বছর ধরে চামড়ার ব্যবসা করেন। গত বছর অনেক টাকা লোকসান হওয়ায় এই দুই মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আর চামড়ার ব্যবসা করবেন না। কিন্তু সরকার এবার গত বছরের থেকে বাড়িয়ে চামড়ার দর নির্ধারণ করায় মনে করেছিলেন এবার ব্যবসা ভালো হবে। কিন্তু এবারও লোকসানের মুখ দেখতে হলো। এ প্রসঙ্গে আমিনুল বলেন, ঈদের দিন সকালের দিকেও আড়তদাররা চামড়ার মোটামুটি দাম দিচ্ছিলেন। কিন্তু বিকালের দিকে দাম পড়ে যায়। পরে কেনা দামেও আর চামড়া নিচ্ছিলেন না। অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী ক্ষোভে-কষ্টে চামড়া ফেলে দিয়েছেন বলে তিনি জানান।
পুরান ঢাকার বাসিন্দা জোবায়ের বলেন, তিনি ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকার মধ্যে গরুর ৪০টি চামড়া কিনেছেন। কিন্তু সন্ধ্যার দিকে যখন পোস্তায় চামড়া বিক্রি করতে গেলেন আড়তদাররা আড়াই শ টাকার ওপরে চামড়ার দাম দিতে চাননি। তিনি বলেন, সরকারের নির্ধারণ করা চামড়ার দর আড়তদাররা মানলে এ অবস্থা হতো না।
উত্তরবঙ্গের সিরাজগঞ্জের আড়তগুলো থেকে প্রতি বছর কোরবানির ঈদের পর প্রচুর চামড়া রাজধানীর বিভিন্ন ট্যানারিতে আসে। গতকাল সিরাজগঞ্জের নিউ ঢাকা রোডের হাসিনুর রহমানের আড়তের সুজন বলেন, চামড়ার কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে কোনো কোনো মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া ফেলে দিয়েছেন। তিনি বলেন, চামড়ার দাম কম অন্যদিকে লবণের দাম বেশি। ফলে চামড়ায় লবণ দেওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, সরকার কাঁচা চামড়ার যে দর নির্ধারণ করে দিয়েছে তারচেয়ে দর অনেক বেশি পড়ছে। তাহলে আমরা কত দামে চামড়া বিক্রি করব?
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব হাজি টিপু সুলতান দাম না পেয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের চামড়া ফেলে দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, হয়তো আড়তদাররা পচে নষ্ট হয়ে যাওয়া চামড়া কিনেনি। আর চামড়া সরকারের বেঁধে দেওয়া দরেই কেনা হয়েছে। কোথাও কোথাও তার চেয়ে বেশি দরেও কেনা হয়েছে। তাই চামড়ার দাম না পাওয়ার বিষয়টি ঠিক নয়।
এদিকে রাজধানীর সড়কের ওপর চামড়া ফেলে যাওয়ায় পচে নষ্ট হয়ে তা থেকে র্দুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে গত বৃহস্পতিবার ‘কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম তদারকি’ বিষয়ক এক অনুষ্ঠানে ক্ষোভ প্রকাশ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরশনের মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নুর তাপস বলেন, রাস্তার পাশাপাশি অনেক এলাকার নালা-নর্দমাতেও চামড়া ফেলে দেওয়া হয়েছে। এতে করপোরেশনের কর্মীরা এসব পরিষ্কার করতে গিয়ে বেকায়দায় পড়েন।
প্রসঙ্গত, এবার ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরু-মহিষের চামড়া ৪০ থেকে ৪৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর এই দাম ছিল ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। আর ঢাকার বাইরে লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরু-মহিষের চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৩ টাকা থেকে ৩৭ টাকা; যা গত বছর ছিল ২৮ থেকে ৩২ টাকা। এছাড়া সারা দেশে লবণযুক্ত খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৫ থেকে ১৭ টাকা, আর বকরির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১২ থেকে ১৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
জানা গেছে, দেশে সারা বছর যে সংখ্যক পশু জবাই হয়, তার অর্ধেক হয় এই কোরবানির ঈদে। ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বছরে বাংলাদেশ থেকে মোটামুটি ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৬৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ গরুর চামড়া, ৩১ দশমিক ৮২ শতাংশ ছাগলের, ২ দশমিক ২৫ শতাংশ মহিষের এবং ১ দশমিক ২ শতাংশ ভেড়ার চামড়া।
চট্টগ্রামে চামড়া সংরক্ষণে কড়াকড়ি
চট্টগ্রাম অফিস থেকে সৈয়দ আবদুল ওয়াজেদ জানান, চট্টগ্রামে এবার ঈদুল আজহায় পশু কোরবানি গত বছরের চেয়ে কম হয়েছে। সরকারি নির্দেশনা থাকায় কঠোর নজরদারিতে এবার পশুর চামড়া নষ্ট হতে দেওয়া হয়নি বলে জানান চামড়া ক্রয়-বিক্রয় ও পরিবহনসংক্রান্ত বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটি এবং বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার সমবায় সমিতির কর্মকর্তারা। চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের হিসাব মতে, এবছর গত বছরের চেয়ে ৫ শতাংশ পশু কম কোরবানি হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি এর জন্য দায়ী বলে তারা মনে করছেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটির প্রধান এবং বাংলাদেশ টি বোর্ডের সচিব মোহাম্মদ রুহুল আমিন ইত্তেফাককে বলেন, গতকাল শুক্রবার বেলা ১১টা পর্যন্ত তাদের মনিটরিং অনুসারে যে তথ্য মিলেছে তা হলো চট্টগ্রাম মহানগরীতে আড়তদাররা ২ লাখ পিস বিভিন্ন পশুর চামড়া লবণজাত করে সংরক্ষণ করেছেন। বিচ্ছিন্নভাবে দুয়েকটি তথ্য ছাড়া এবার নগরীতে পশুর চামড়া নষ্ট হতে দেওয়া হয়নি। কয়েকটি স্থানে পরিত্যক্ত চামড়ার কথা শোনা গেলেও সেগুলো তাত্ক্ষণিকভাবে সংগ্রহ করে মাদ্রাসা, বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও আড়তদারদেরকে লবণ দিয়ে সংরক্ষণের জন্য হস্তান্তর করা হয়েছে। সংরক্ষিত এসব চামড়া আড়তদাররা দুই আড়াই মাস পরেও ঢাকায় নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতে পারবেন। তিনি জানান, সরকার নির্ধারিত মূল্যে প্রতি বর্গফুট চামড়া তারা মৌসুমি চামড়া বিক্রেতাদের কাছ থেকে কিনেছেন। আকৃতি ও প্রকার ভেদে ৩০০, ৪০০ ও ৫০০ টাকায় চামড়া কিনেছেন বলেও তিনি জানান।
চামড়া যথাযথভাবে সংরক্ষণের নজরদারির কথা স্বীকার করলেও নগরীর বিভিন্ন এলাকার কোরবানিদাতা জনসাধারণ ইত্তেফাককে জানান, এবছর তাদের অনেকেই মৌসুমি চামড়া বিক্রেতাদের দেখা পাননি। ফলে কোরবানির পশুর চামড়া তারা বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা, মসজিদ ও মাদ্রাসার সংগ্রহকারীদের হাতে বিনামূল্যেই হস্তান্তর করেছেন।
এদিকে আড়তদারদের একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে আরো প্রায় সোয়া ১ লাখ চামড়া লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এসব চামড়া আড়তে পৌঁছলে আড়তদারদের চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হতে পারে বলে তারা আশা করছেন।
