রাজ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষার দাবিতে রাজপথে ধর্নায় (অবস্থান ধর্মঘট) বসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। কিন্তু তিনদিনের মাথায় গতকাল মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের এক আদেশে নৈতিক জয় এসেছে দাবি করে সেই অবস্থান ধর্মঘট থেকে সরে দাঁড়ালেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী। এর ফলে সেন্ট্রাল ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (সিবিআই) ও পুলিশের মধ্যে নজিরবিহীন দ্বন্দ্বে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকটের আপাতত নিরসন হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আদেশে বলা হয়েছে, কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারকে গ্রেফতার করা যাবে না। তবে সিবিআই ডাকলেই জেরার জন্য হাজিরা দিতে হবে। আদালতের এই আদেশকে মমতা নৈতিক জয় বললেও কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি বলছে, সিবিআইর জয় হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের চাঞ্চল্যকর সারদা ও রোজভ্যালি দুর্নীতি মামলায় তদন্তের নেতৃত্বে ছিলেন কলকাতার বর্তমান পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার। সিবিআইর অভিযোগ তদন্তে পাওয়া অনেক নথি-প্রমাণ রাজীব কুমার দেননি। এমনকি তাকে জিজ্ঞাসাবাদের নোটিস দেওয়া হলেও তিনি হাজির হননি। এরই প্রেক্ষিতে কোন ধরনের অনুমতি না নিয়ে গত রবিবার সিবিআই কর্মকর্তারা কমিশনার রাজীব কুমারকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে তার বাসভবনে যান। প্রথমে সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ সিবিআই কর্মকর্তাদের বাড়িতে ঢুকতে বাধা দেয়। পরে দুই পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে। এক পর্যায়ে পুলিশ সিবিআই কর্মকর্তাদের টেনে-হিঁচড়ে গাড়িতে তুলে স্থানীয় থানায় নিয়ে যায় এবং তাদেরকে সেখানে আটক করে রাখে। এই ঘটনার পর মমতা ব্যানার্জি কেন্দ্রীয় সরকারের হেনস্থার প্রতিবাদে তাত্ক্ষণিক কলকাতার ধর্মতলায় অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেন।
এর পরদিনই আদালত অবমাননার অভিযোগ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় সিবিআই। পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে তদন্তের তথ্য-উপাত্ত নষ্টের অভিযোগও উত্থাপন করে তারা। তবে আদালত এ ব্যাপারে তথ্য-প্রমাণ পেশ করতে বলে। গতকাল এই আবেদনের ওপর শুনানি হয়। শুনানি শেষে সুপ্রিম কোর্ট আদেশ দেয়। আদেশে অবমাননার ব্যাপারে আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে, কলকাতা পুলিশের কমিশনার রাজীব কুমার, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য সচিব মলয় দে এবং ডিজিপি বীরেন্দ্রকে। আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে। এদিকে আদালতের আদেশের পর সিবিআই শিলংয়ে জেরার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। গতকাল বিকালে রাজীব কুমার চিঠি দিয়ে সিবিআইকে জানিয়েছেন, ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি শিলংয়ে হাজিরা দিতে পারবেন।
১৩-১৪ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে অবস্থান ধর্মঘট:আদালতের আদেশের পর উত্সবের মেজাজ দেখা যায় কলকাতার ধর্মতলায় মুখ্যমন্ত্রী মমতার অবস্থান ধর্মঘটের মঞ্চে। সুপ্রিম কোর্টের আদেশকে নৈতিক জয় হিসেবেই দেখছেন মমতা। তিনি বলেন, এটা আমাদের নৈতিক জয়। বিচার ব্যবস্থার প্রতি আমাদের আস্থা রয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু মঞ্চে আসেন। তার অনুরোধে অবস্থান ধর্মঘট তুলে নেওয়ার কথা ঘোষণা করেন মমতা। তবে তিনি জানান, ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে একই ইস্যুতে অবস্থান ধর্মঘট করবে তার দল।
এদিকে সুপ্রিম কোর্টের আদেশকে সিবিআইর জয় বলে দাবি করেছে বিজেপি। ভারতের আইনমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ বলেন, কোনও সরকার বা রাজনৈতিক দল নয়, সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশে সিবিআইর নৈতিক জয় হয়েছে। কেউ যদি এটাকে তাদের জয় বলেন, আমরা আর কী বলতে পারি।
পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ: মমতার বিক্ষোভ মঞ্চে উপস্থিত থাকায় পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ব্যবস্থা নিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তার বিরুদ্ধে সর্ব ভারতীয় সার্ভিস রুল ভাঙার অভিযোগ আনা হয়েছে। গতকাল রাজ্যের মুখ্যসচিবকে পাঠানো এক চিঠিতে এ নির্দেশ দেওয়া হয়।
