ফেরদৌস ওয়াহিদ
ফকির আলমগীরের সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৭৩ সালে। সেই থেকে আমাদের বন্ধুত্ব। যে বন্ধুত্বে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না, ছিল সৃজনশীলতায় যুুুথবদ্ধ হয়ে একসাথে কাজ করা। এই বন্ধুত্ব ছিল চিরকাল। এতো বছরের পথচলা, কত শত স্মৃতি আমাদের। দেশে-বিদেশে গান করার স্মৃতি। গণসংগীতকে অনেকদূর নিয়ে গেছে। তার মৃত্যুতে দেশের গণসংগীতের শূণ্যতা কিছুটা হলেও তৈরি হবে। গণসংগীতের ভান্ডার ছিল তার কাছে। তার কতটা অর্জন, তা দেশের মানুষ এখন বুঝবে। বাংলাদেশের গণসংগীতকে ফকির আলমগীর একাই সারা বিশ্বের কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।
ফকিরের মৃত্যুর খবরটি শোনার পর থেকে সত্যি খারাপ লাগছে। কেবলই মনে হচ্ছিল তার কণ্ঠে আর কোনোদিন শুনব না। শুনব না নেলসন ম্যান্ডেলা নিয়ে সেই বিখ্যাত গান। মেহনতি মানুষের জন্য গান করতো, শ্রমজীবী মানুষের জন্য গান করতো। গান দিয়ে সে জয় করে নিয়েছিল কোটি মানুষের মন।
জীবনে চলার পথে অনেক অনেক স্মৃতি। একটা স্মৃতির কথা শেয়ার করি। একবার আমরা একসাথে শো করতে দিনাজপুরের পথে। হঠাত্ পথে খাবারের বিরতি। তখন আজম খানের ব্যান্ড, আমি, ফকির , ফিরোজ শাই তুমুল জনপ্রিয়। পথচারীরা টের পেয়ে ফকিরকে ঘিরে ধরলো। আমরা খেতে রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। আমাদের সকলের খাওয়া শেষ। বের হয়ে দেখি গোল হয়ে সবাই বসে আছে, ফকির গান গেয়ে চলেছে! সবার সম্বস্বরে ছোটখাটো কনসার্ট। পরে ওর জন্য আমাদের সবার দেরি হলো। যেতে যেতে বললাম, এভাবে বিনে পয়সায় গান শুনাও ক্যান?? এত অ্যাভেলেইভল হবার দরকার কী?
ও বললো, ‘আরে আমি তো গণমানুষের শিল্পী। যখন যেখানে মানুষ আমাকে শুনতে চাইবে তখনই আমি শুনাবো। এটাই আমার কাজ।’ এই ছিল ফকির আলমগীর। কোনো একজন ভক্ত ওকে একটি গান শোনানোর অনুরোধ করতে বাকি। ও সাথে সাথে গেয়ে শুনিয়ে দেবে। এর বাইরে ঈর্ষা করার মতো একটি অতি পরিশ্রমী কাজ সে করেছে। তা হলো ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠির প্রতিষ্ঠা। একটি প্রতিষ্ঠান, সংগঠনকে একাই টেনে নিয়ে গেছেন। আমরা তো শুধু গান গেয়েছি। ও গানের বাইরে এইসব কাজ করেছে অনেক। ফকির আলমগীর ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠীকে একাই ধরে রেখেছে ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। লেখালেখিও করেছে। ফকির আলমগীরের ছিল সবাইকে আপন করে নেওয়ার বিরাট ক্ষমতা। তার ভেতরটা বড় ছিল বলেই সব মানুষকে আপন করে নিতে পারতো। আমি, ফকির আলমগীর, ফিরোজ সাঁই, আজম খান একসঙ্গে বহু জায়গায় গান করেছি। তিন জনই আর নেই, আমি একা হয়ে গেলাম। ফকির আলমগীর তার যেকোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে আমাকে নিমন্ত্রণ করতো। শিশুর মতো মন ছিল ফকির আলমগীরের। তার বিয়ের পাগড়িটা আমিই পড়িয়ে দিয়েছিলাম। ফকির আলমগীর নেই, বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। আমার তিন বন্ধুই চলে গেল আমাকে ছেড়ে।

