করোনার টিকা লইয়া দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নাই। গতকাল জাপান হইতে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ২ লক্ষ ৪৫ হাজার ২০০ ডোজ টিকা ঢাকায় পৌঁছিবার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলিয়াছেন যে, দেশে করোনার টিকার কোনো সংকট হইবে না। স্বাস্থ্যমন্ত্রীও বলিয়াছেন যে, দেশে ২১ কোটি টিকার ব্যবস্থা করা হইয়াছে। বাংলাদেশে শেষপর্যন্ত করোনার টিকার আর হাহাকার থাকিতেছে না—ইহা খুবই আশাব্যঞ্জক একটি দিক; কিন্তু এই মুহূর্তে দেশের জেলা-উপজেলা পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক মানুষ করোনার সুচিকিত্সা পাইতেছেন না। অনেক ক্ষেত্রে আইসিইউ বেড তদবির করিয়াও পাওয়া যাইতেছে না। ইহার মূল কারণ জেলা-উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা। উপজেলা পর্যায়ের সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে যে চিকিত্সাসুবিধা বিদ্যমান তাহা অনেকটা ফাস্ট এইড ছাড়া আর কিছু নহে। করোনার প্রাদুর্ভাব যখন পৃথিবী জুড়িয়া ছড়াইয়া পড়িল, তখন আশঙ্কা করা হইয়াছিল যে, অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে ক্ষয়ক্ষতি হইবে অধিক। কেননা এই সকল দেশে স্বাস্থ্য অবকাঠামো আশানুরূপ নহে। শুধু চাকচিক্যময় ভবন তৈরি করিলেই চলে না, সেইখানে পর্যাপ্ত ডাক্তার-নার্স-টেকনিশিয়ান ইত্যাদি জনবল নিয়োগসহ মেশিনারি ও ঔষধপত্রের যোগান দেওয়া আবশ্যক। এইরূপ সতর্কবার্তার পর দেড় বত্সরেরও অধিক সময় পাইলাম; কিন্তু আমরা কেবল বিপদের অপেক্ষা করিতেছিলাম। অপেক্ষা করিতেছিলাম বিদেশি দান-অনুদানের উপর। এখন বিপদ যখন বাড়িতেছে ও করোনার বিভিন্ন ভ্যারিয়েন্ট আসিয়া আক্রমণ করিতেছে, তখন উন্নয়নশীল দেশসমূহ চোখে সরিষার ফুল দেখিতেছে।
আমাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেগুলিতে কী কী সুবিধা রহিয়াছে? করোনার টিকার ব্যবস্থা করা হইয়াছে বটে; কিন্তু কোনো কোনো হাসপাতালে অক্সিজেনের ব্যবস্থা থাকিলেও সকল জায়গায় নাই। ফলে রোগীর অবস্থা জটিল আকার ধারণ করিলে অগত্যা বিভাগীয় হাসপাতাল কিংবা ঢাকায় রেফার করা হয়। আমাদের বিভাগীয় হাসপাতালগুলিও অনেক ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ নহে। ফলে গ্রামাঞ্চল হইতে অনেক জটিল রোগী বিভাগীয় বা রাজধানী শহরে আসিতে আসিতে পথিমধ্যেই মারা যায়। অবশ্য করোনা আসিবার পর আমেরিকা ও ইউরোপের মতো দেশসমূহও অপ্রস্তুত ছিল। ফেডারেল বা রাজ্যসরকারগুলি সেই সমস্যা সমাধানে হিমশিম খাইয়াছে। তবে তাহাদের অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্য থাকায় তাহারা এখন পরিস্থিতি অনেকটা সামলাইয়া উঠিতেছেন; কিন্তু আমাদের মতো দেশসমূহের কী অবস্থা হইবে? আমাদের জনসংখ্যার একটি বৃহত্ অংশ এখনো গ্রামে-গঞ্জে বসবাস করেন। তাহাদের অবহেলা করিবার পরিণতি শুভ হইতে পারে না। উপজেলা করা হইয়াছে নাগরিক সুবিধা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাইয়া দেওয়ার জন্য; কিন্তু সেই সকল সুবিধা আজও আমরা তাহাদের দিতে পারি নাই। মানুষ ব্যবসায়-বাণিজ্য, চাকুরিবাকরি, শিক্ষাদীক্ষা, চিকিত্সা ইত্যাদির জন্য এখনো রাজধানীনির্ভর। এই ঈদের ছুটিতে আমরা দেখিতেছি বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড ও ফেরিঘাটে মানুষের প্রচণ্ড ভিড়! সেইখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ সুদূর পরাহত।
এই পরিপ্রেক্ষিতে উন্নয়নশীল দেশসমূহে যদি করোনায় আরো ক্ষয়ক্ষতি হয়, তাহাতে বিস্মিত হইবার কিছু থাকিবে না। প্রতিবেশী একটি বড় উন্নয়নশীল দেশে করোনায় মৃত্যুর মিছিল দেখিয়া আমরা হতভম্ব! ইন্দোনেশিয়ায় এখন প্রতিদিন গড়ে ৯ শতাধিক লোকের প্রাণহানি ঘটিতেছে করোনায়। করোনা রোগীর জন্য শুধু অক্সিজেন নহে, ভেন্টিলেটরসহ আরো অনেক কিছুই লাগে যাহা আমাদের নাই। বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, আগামী আগস্ট মাসে দেশে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি আরো খারাপ হইতে পারে। কোরবানির হাট লইয়া শিথিলতা, ঈদের ছুটিতে গাদাগাদি করিয়া চলাচল, গ্রামে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে অবহেলা ইত্যাদি কারণে আগামী মাস জুড়িয়া করোনা শনাক্ত ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বগতি দেখা দিতে পারে। তাহারা বলিতেছেন, এই দেশে কোভিড পিক এখনো দূরে। এতদিন সময় পাইয়াও আমরা প্রত্যাশিত প্রস্তুতি লইতে পারি নাই। তবে এখনো সময় আছে। এই ব্যাপারে আমাদের এখনই আরো সক্রিয় ও সচেতন হইতে হইবে।
