আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হোক গবেষণা

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২১, ২১:৩৯

গবেষণা বলতে মূলত বোঝায় বারবার অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিরাজমান সমস্যা নিরসনে নতুন জ্ঞান আবিষ্কার করার একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া যেখানে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় সাধারণত মানুষের অর্জিত জ্ঞানকে একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা হয়। দেশ ও জাতির মধ্যে উদ্ভূত বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে গবেষণার বিকল্প নেই। বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের বিষাক্ত আগ্রাসন থেকে বিশ্ববাসীকে রক্ষার জন্য মুক্তির দূত হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে করোনা টিকা, যা বিশ্বের বিভিন্ন গবেষকের গবেষণালব্ধ ফল। বাংলাদেশকে উন্নত দেশ হিসাবে বিনির্মাণের স্বপ্ন আমরা লালন করি, লালিত সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপদানের জন্য দেশের অভ্যন্তরে বিরাজমান সমস্যাগুলোর সমাধান অন্বেষণে নানাবিধ গবেষণা আবশ্যক। কিন্তু বাংলাদেশে গবেষণার অপ্রতুলতার চিত্র স্পষ্ট দৃশ্যমান। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা বিমুখতার ফলে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গবেষণায় অনাগ্রহ বাংলাদেশে গবেষণার ক্ষেত্রকে আরো সংকটময় করে তুলেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য ডিগ্রি দেওয়া নয়, বরং জ্ঞান সৃষ্টি, নিরন্তর অনুশীলন গবেষণা। কিন্তু বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মূল উদ্দেশ্য নামে মাত্র একটা ডিগ্রি দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে, যেখানে গবেষণার বিষয়টি এখনো পর্যন্ত সেভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে না। সরকারি-বেসরকারি মিলে দেশে বর্তমানে সর্বমোট ১৫১টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ৪৬তম বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০১৯ শিক্ষাবর্ষে ৬০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে গত বছরে কোনো ধরনের গবেষণা প্রকল্প পরিচালিত হয়নি। তাছাড়া, ২০২০ সালে বাংলাদেশ থেকে সর্বমোট গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে ৮০৯১টি, যা ২০১৯ সাল থেকে ২৪টি বেশি। কিন্তু, ২০১৬ থেকে বাংলাদেশের গবেষণা বৃদ্ধির হার ছিল গড়ে ২০ শতাংশ যা ২০২০-এ এসে হোঁচট খেয়ে দাঁড়িয়েছে ০.৩ শতাংশে। পরিসংখ্যানগুলো পর্যবেক্ষণ করলে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা ক্ষেত্রের দুর্দশার চিত্র স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়।

গবেষণা প্রকল্পে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এমন বন্ধুর অবস্থানের কারণে শিক্ষার্থীরা ক্রমশ গবেষণা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাছাড়া, চাকরির বাজারে গবেষণাধর্মী চাকরির অপ্রতুলতার সঙ্গে বিসিএস কেন্দ্রিকতার সংমিশ্রণ শিক্ষার্থীদের গবেষক হওয়ার স্বপ্নকে কণ্টকাকীর্ণ করে তুলছে। এজন্য গবেষণা সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের অবহিত করতে হবে। তাদের জানাতে হবে যে, গবেষণা শুধু উচ্চশিক্ষার সুযোগকে বিস্তৃত করবে না বরং ভবিষ্যতের কর্মবাজারেও তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করবে। নিজের মেধা ও বুদ্ধির কার্যকরী প্রয়োগে শিক্ষার্থীদের সৃষ্টিশীল সত্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে পারে গবেষণার মাধ্যমে। গবেষক হওয়ার জন্য একজন শিক্ষার্থীর ভেতরে আগ্রহ ও ধৈর্যশক্তি থাকা অত্যাবশ্যক। শিক্ষার্থীকে অনুসন্ধিত্সু হতে হবে। গবেষণায় শেষ বলে কিছু নেই, এর পরিধি সুবিস্তৃত, এজন্য শিক্ষার্থীর ক্রমাগত সম্মুখে অগ্রসরের মনোভব থাকতে হবে, হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়লে চলবে না।

উচ্চশিক্ষাকে ফলপ্রসূ করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা কর্মের ওপর নজর দিতে হবে। অন্যথায় স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অর্জিত জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগে ব্যর্থ হবে শিক্ষার্থীরা, যা দেশ ও জাতির জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে। এজন্য শিক্ষার্থীদের গবেষণায় আগ্রহী করার নিমিত্তে গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সমৃদ্ধ ক্যারিয়ার সম্পর্কে তাদেরকে অবগত করতে হবে। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যারা গবেষণার সঙ্গে জড়িত আছেন তারা কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাজেটের বেশির ভাগ ব্যয় হয় উন্নয়ন কাজে, গবেষণা খাতে বরাদ্দ খুবই কম। গবেষণায় বাজেট বৃদ্ধি করা অতীব জরুরি শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী করতে। অতিসত্বর আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণাবান্ধব হোক এটাই প্রত্যাশা। সৃষ্টিশীল এ পেশায় শিক্ষার্থীর নিরন্তর অনুপ্রবেশ ঘটুক। আগামীর উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে তরুণ গবেষকরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে সেটাই কাম্য।

n  লেখক :শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

 বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ