বৈধ পথে প্রবাসী আয় আহরণে প্রণোদনা ৩ শতাংশ করার প্রস্তাব

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২১, ২১:৪০

রেজাউল হক কৌশিক

করোনা ভাইরাসের প্রকোপে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক টানাপড়েন এখনো চলছে। এর মধ্যেই দেশের অর্থনীতিতে স্বস্তিদায়ক অবস্থায় ছিল রেমিট্যান্স আয়। রেমিট্যান্স বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল প্রণোদনা। এ প্রণোদনা আরো বাড়ানো যায় কি না, সে প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে প্রণোদনা বাড়ানোর বিষয়ে যুক্তিও তুলে ধরেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

জানা গেছে, প্রবাসী আয়ে আরো এক শতাংশ প্রণোদনা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাত্ এখন রেমিট্যান্সে যে দুই শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে তার সঙ্গে আরো এক শতাংশ বাড়িয়ে তিন শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এখন সরকার রেমিট্যান্সের ওপর যে প্রণোদনা সে বিষয়েও প্রস্তাব দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে এ প্রণোদনা বিতরণের বিস্তারিত গাইড লাইনও তৈরি করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সে অনুযায়ী এখন রেমিট্যান্স বিতরণ করছে ব্যাংকগুলো। এদিকে রেমিট্যান্সের ওপর সরকার ঘোষিত দুই শতাংশের বাইরেও কোনো কোনো ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান বেশি প্রণোদনা দিচ্ছে। যদি কেউ অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠান তাহলে তার সুবিধাভোগী এক শতাংশ বেশি অর্থাত্ তিন শতাংশ প্রণোদনা পাচ্ছেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রবাসীদের হুন্ডির পথ থেকে নিরুত্সাহিত করতে বৈধ পথে রেমিট্যান্স ফি মওকুফ করা প্রয়োজন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৩০০র বেশি এক্সচেঞ্জ হাউজ থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংকের রেমিট্যান্স আসে। একেক দেশের এক্সচেঞ্জ হাউজগুলো ভিন্ন ভিন্ন ফি চার্জ নিয়ে থাকে। কিন্তু একটি সমন্বয় করা কঠিন। তাই প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ৫০০ মার্কিন ডলার কিংবা এর চেয়ে কম রেমিট্যান্স পাঠানো প্রবাসীদের প্রচলিত দুই শতাংশ প্রণোদনার পাশাপাশি অতিরিক্ত আরো এক শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।

চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ‘স্বল্প রেমিট্যান্স পাঠানো অভিবাসী কর্মীদের হুন্ডির পথ থেকে নিরুত্সাহিত করতে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর ফি মওকুফ করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে উচ্চ আয়ের প্রবাসীদের প্রদত্ত সুযোগের সঙ্গে তা সমন্বয় করতে হবে।’ এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক শীর্ষ রেমিট্যান্স আহরণকারী ১০টি ব্যাংক এবং বিভিন্ন দেশে অবস্থিত সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানাধীন ব্যাংকের সঙ্গে সভা করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, সদ্য বিদায়ি অর্থবছরে (২০২০-২০২১) আগের অর্থবছরের চেয়ে রেমিট্যান্স ৩৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। গত অর্থবছরে প্রবাসীরা ২ হাজার ৪৭৭ কোটি ৭৭ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ২ লাখ ১০ হাজার ৬১০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা হিসাবে)। আগের অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছিল ১ হাজার ৮২০ কোটি ৫০ লাখ ডলার।

২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়। বৈধ উপায়ে প্রবাসী আয় বাড়াতে এমন সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সে অনুযায়ী, ঐ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠালে প্রতি ১০০ টাকার বিপরীতে দুই টাকা প্রণোদনা পেয়ে আসছেন। এর ফলে করোনার মধ্যেও রেকর্ড গড়ছে রেমিট্যান্স। করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে মন্দা কাটাতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ৫ হাজার ডলার বা প্রায় ৫ লাখ টাকা কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়া ২ শতাংশ নগদ সহায়তা দিচ্ছে সরকার। যা আগে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়া নগদ সহায়তা দেওয়া হচ্ছিল। এদিকে গত নভেম্বরে রেমিট্যান্স পাওয়া আরো সহজ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রেমিট্যান্স প্রদানকারী ব্যাংক রেমিটারের কাগজপত্র নিজ দায়িত্বেই যাচাই করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রণোদনার অর্থ ছাড় করার জন্য রেমিট্যান্স আহরণকারী ব্যাংকের কাছে ‘কনফার্মেশন’ পাঠাবে। তার ভিত্তিতে রেমিট্যান্স আহরণকারী ব্যাংক রেমিট্যান্স প্রদানকারী ব্যাংক বরাবর প্রণোদনার টাকা ছাড় করবে বলে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট পেশের সময় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ঘোষণা করেন যে, ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়াতে সংশ্লি­ষ্ট ব্যাংকসমূহে বিশেষ প্যাকেজ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। আর প্রবাসীদের পাঠানোর রেমিট্যান্সের ওপর এখন যে ২ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে তাও অব্যাহত রাখার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী।

রেমিট্যান্সে প্রণোদনা বাড়ানোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে দুই শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। বৈধ পদে রেমিট্যান্স বাড়াতে আরো এক শতাংশ প্রণোদনা বাড়ানোর প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সরকার চেষ্টা করছে যাতে বৈধ পথে প্রবাসী আয় দেশে আসে। রেমিট্যান্সে প্রণোদনা দেওয়া পদ্ধতিটি বেশ কার্যকর হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। এ কারণে আরো এক শতাংশ বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা হয়েছে।