দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান চামড়ার মোকাম যশোরের রাজারহাটে ঈদ-পরবর্তী চামড়ার প্রথম হাট জমেনি। হাটে চামড়াও উঠেছে অল্প পরিমাণ। ঢাকার ট্যানারি মালিকরা বকেয়া টাকা না দেওয়ায় কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ চামড়া কিনতে পারেননি চামড়া ব্যবসায়ীরা। আবার সকালের বৃষ্টিপাত আর লকডাউনের ধকলে চামড়ার দাম কমে যায়। এতে খুচরা ব্যবসায়ীরা লোকসানের শিকার হয়েছেন।
ঈদ-পরবর্তী সময়ে যশোরের রাজারহাটের বাজারের দিকে নজর থাকে দেশের শীর্ষস্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ীদের। দেশের নানা প্রান্তের চামড়া ব্যবসায়ীরা এখানে ভিড় করেন চামড়া কেনাবেচার জন্য। ঈদ-পরবর্তী কয়েকটি হাটে এখানে কোটি কোটি টাকার চামড়া বিক্রি হয়। তবে গতকাল শনিবার ঈদ-পরবর্তী প্রথম হাটে চামড়া উঠেছে অনেক কম। দামও ওঠেনি সেভাবে। গতকাল এই বাজারে বেশির ভাগ লবণযুক্ত গরুর চামড়া ৪০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে। আকার ভেদে খুব অল্পসংখ্যক চামড়া ৭০০ টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। আরো ভালো দামের আশায় ব্যবসায়ীদের একটি অংশ বিপুল পরিমাণ চামড়া মজুত করে রেখেছেন বলে জানা গেছে।
লকডাউনের কারণে কুষ্টিয়া, নাটোর, ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার পাইকাররা বাজারে না আসার কারণেও অনেকে হাটে মাল তোলেননি।
যশোরের মনিরামপুরের জীবন দাস জানান, তিনি ২২ পিস ছাগলের চামড়া হাটে এনেছিলেন। প্রতি পিস চামড়া কেনা ছিল ৪০ টাকা। এতে লবণ ও পরিবহন খরচ আছে। কিন্তু বিক্রি করেছেন ৪০ টাকা পিস হিসেবে। এতে তার লোকসান হয়েছে। অভয়নগর উপজেলার হরিচাঁদ দাস জানান, তিনি ২৪ পিস গরুর চামড়ার মধ্যে ১০ পিস বিক্রি করেছেন ৫০০ টাকায়। আর ১৪ পিস ৩০০ টাকা হিসেবে। অথচ তার কেনা ছিল প্রতিপিস ৫০০ টাকায়। বাইরের ব্যবসায়ীরা না আসায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে দিয়েছেন। একই উপজেলার পবন বিশ্বাস জানান, তিনি ৪৩০ পিস গরুর চামড়া বিক্রি করেছেন ৯০০ টাকা করে। এতে তার লোকসান না হলেও লাভ হবে না। কেননা চামড়া কেনা ও লবণ পরিবহন খরচ মিলিয়ে একই দাম পড়ে গেছে। যশোরের আড়তদার মোস্তাক আহমদ জানান, তিনি ১ হাজার পিস গরুর চামড়া কিনেছেন গড়ে ৬০০ টাকা হিসেবে। এতে ঢাকায় বিক্রি করলে তার লাভ হবে। যশোরের ব্যাপারী শেফার্ড আহমেদের অভিযোগ, ট্যানারি মালিকরা বকেয়া টাকা পরিশোধ না করায় সব ব্যাপারী নগদ টাকার সংকটে রয়েছেন। যে কারণে চামড়া কেনা সম্ভব হচ্ছে না। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি এলাকার গোপাল চন্দ্র দাস ১ হাজার পিস গরু ও ছাগলের চামড়া নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলেও সব চামড়া বিক্রি করেছেন। তিনি বলেন, গত ৩০ বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে আমি জড়িত, কিন্তু চামড়ার এরকম দরপতন আগে কখনো দেখিনি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে চামড়া সংগ্রহ, লবণ লাগানো এবং পরিবহন খরচ মিলিয়ে যে চামড়ার দাম প্রতি পিস ৮০০-৯০০ টাকা পড়েছে, সেই প্রায় একই দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি। নড়াইল জেলার লোহাগড়ার ব্যবসায়ী সরনাল বিশ্বাস জানান, তিনি ৬০০ পিস গরুর চামড়া এনেছেন। বড় চামড়া বিক্রি করেছেন ৮০০ টাকায়, আর ছোট চামড়া ৪০০-৫০০ টাকা পিস হিসেবে। এতে কোনোমতে আমার পুঁজি বেঁচেছে। ঝিনাইদহের পাইকারি ব্যবসায়ী লিটন হোসেন জানান, ঢাকার ব্যবসায়ীদের কাছে এখনো অনেক টাকা বকেয়া রয়েছে। এরপরও তিনি ৭০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা দরে ৮০০ পিস গরুর চামড়া কিনেছেন।
বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল, জানান, ট্যানারি মালিকদের কাছে রাজারহাট ব্যবসায়ীদের ২০ কোটি টাকার উপরে পাওনা রয়েছে। মূলত নগদ টাকার সংকট এবং গতকাল বৈরী আবহাওয়ার কারণে রাজারহাটে চামড়ার হাট তেমন জমেনি। তারপরও নগদ টাকায় প্রায় ৪ কোটি টাকার বেচাকেনা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, সরকার পাঁচ জন ব্যবসায়ীকে ওয়েট ব্লু চামড়া রপ্তানির সুযোগ দেওয়ায় চামড়া শিল্পে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবার যেভাবে রাজারহাটের বাজার মনিটরিং করছে, তা অতীতে কখনো দেখা যায়নি। এক্ষেত্রে অতীতে যেসব ট্যানারি মালিক চামড়ার টাকা বকেয়া রেখেছেন, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের চিহ্নিত করতে পারলেই বোঝা যাবে গত কয়েক বছরে কারা কারসাজি করে এই শিল্পকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে।
হাটের ইজাদার হাসানুজ্জামান হাসু জানান, ৩-৪ বছর আগেও রাজারহাটে কোরবানি ঈদের হাটে অন্তত লাখ পিস গরুর ও ৫০ হাজার পিস ছাগলের চামড়া আসত। এখন আসছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার পিস গরু ও ২৫ হাজার মতো ছাগলের চামড়া। বাইরের ব্যবসায়ীরা না আসায় এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পুঁজি সংকটের কারণে হাট তেমন জমেনি।
