কৃষি ও শিল্পের কাঁচামাল

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২১, ২১:৪৮

সাধারণভাবে ‘আকাঙ্ক্ষা’ বলতে কোনো কিছু পাওয়ার ইচ্ছাকেই বোঝানো হয়। কিন্তু সব ইচ্ছাই আকাঙ্ক্ষা নয়। আকাঙ্ক্ষা সেটাই, যা পূরণ করার মতো সামর্থ্য থাকে। স্থান-কাল-পাত্রভেদে আকাঙ্ক্ষা ভিন্ন হতে পারে। আবার সময়ের বিবর্তনে আকাঙ্ক্ষার রূপান্তর বা পরিবর্তনও ঘটতে পারে। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ ছিল একটি খাদ্যঘাটতির দেশ। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য আমদানির মাধ্যমে জনগণের চাহিদা পূরণ করতে হতো। তখন খাদ্য উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার বিষয়টি আমাদের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ছিল না। কিন্তু কালের বিবর্তনে বাংলাদেশ এখন খাদ্য উত্পাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে।

বর্তমানে বিদেশ থেকে খাদ্যশস্য তেমন একটা আমদানি করতে হয় না বললেই চলে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ শুধু খাদ্য উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে তা-ই নয়, খাদ্যশস্য বাণিজ্যিকভাবে রপ্তানি করতেও পারবে। স্বাদু পানির মাছ চাষ, চিংড়ি চাষ, আম উত্পাদন ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় ১০টি দেশের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে (২০২০-২০২১) বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো কৃষিপণ্য রপ্তানি করে ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি অর্থ আয় করেছে। কৃষি খাতের প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি বাড়ানো গেলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে এ খাত থেকে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করা সম্ভব বলে কৃষিসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তবে এজন্য প্রথমেই কিছু জরুরি কাজ করতে হবে। প্রথমত, বর্তমানে কৃষি খাতের রপ্তানি কার্যক্রমে অপ্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এটা পরিবর্তন করে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়াতে হবে। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো, রপ্তানিকৃত কৃষিপণ্যের গুণমান নিশ্চিত করা। গুড এগ্রিকালচার প্র্যাকটিস (জিএপি) কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। অর্গানিক কৃষি পণ্যের উত্পাদন বৃদ্ধি করতে হবে। এটা করা গেলে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক কোয়ালিটি সার্টিফিকেশন লাভ করতে পারবে। তখন বিশ্ববাজারে সুপার চেইন শপগুলোতে সহজেই বাংলাদেশি পণ্য স্থান করে নিতে পারবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্য যে কোনো সেক্টরের চেয়ে কৃষি খাতের সম্ভাবনা অনেক বেশি। গত ৩০ বছরে বাংলাদেশের কৃষি খাতের সম্ভাবনা আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করেছি। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। তখন বার্ষিক খাদ্য উত্পাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ কোটি মেট্রিক টন। সময়ের বিবর্তনে বাড়িঘর নির্মাণ, রাস্তা তৈরি, কলকারখানা স্থাপন ইত্যাদি কাজের জন্য আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। জনসংখ্যা প্রায় আড়াই গুণ বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ১৬ কোটি ৯১ লাখে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু খাদ্য উত্পাদন বেড়েছে চার গুণেরও বেশি। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে দেশে খাদ্যশস্য উত্পাদিত হয়েছিল ৪ কোটি ১৫ লাখ ৭৪ হাজার মেট্রিক টন। গত দুই বছরে খাদ্য উত্পাদন আরো বেড়েছে। ফলে দেশে এখন খাদ্য ঘাটতি নেই বললেই চলে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি খাতের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি হলেও অতীতে এই খাতকে সেভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। স্বাধীনতার পর শিল্পায়নের ওপর যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কৃষিক্ষেত্রে ততটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে কৃষির পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটেনি। কৃষি ও শিল্পের মধ্যে বিরোধ বা দ্বন্দ্ব নেই বরং এই দুটি খাত পরস্পর পরিপূরক। আমরা এই চিরন্তন সত্যটি প্রায়শই উপলব্ধি করতে ভুলে যাই। বাংলাদেশে অবশ্যই বৃহত্ শিল্পকারখানা স্থাপনের প্রয়োজন আছে। জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত এবং সুষমকরণের জন্যই এটা প্রয়োজন। কিন্তু তাই বলে কৃষিকে অবহেলা করে বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত শিল্পায়ন সম্ভব নয়। বরং বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে প্রচলিত শিল্পায়নের পাশাপাশি কৃষিকে শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। অর্থাত্ আমাদের এমন সব শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে হবে, যার কাঁচামাল আসবে কৃষি খাত থেকে। এটা করা গেলে জাতীয় অর্থনীতিতে শিল্প খাতের মূল্য সংযোজনের হার তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে আমাদের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৯৩ শতাংশের মতো আসছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। কিন্তু এই খাতটি আমদানিকৃত কাঁচামাল ও ক্যাপিটাল মেশিনারিজ-নির্ভর বলে জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজনের হার তুলনামূলকভাবে কম। মোট রপ্তানি আয়ের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই কাঁচামাল ও ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানিতে চলে যায়। কৃষিকে যদি শিল্পের কাঁচামাল জোগানের প্রধান উেস পরিণত করা যেত, তাহলে কৃষক তার উত্পাদিত ফসলের সঠিক মূল্য পেতেন। কৃষি যান্ত্রিকায়ন সহজতর হতো। কৃষি খাত থেকে অর্থ আহরণের হার বর্তমানের তুলনায় অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের মতো সম্ভাবনাময় কৃষি বিশ্বের খুব কম দেশেই আছে। কাজেই কৃষির সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। সঠিকভাবে পূর্ণাঙ্গ কৃষি যান্ত্রিকায়ন করা গেলে আগামী ১০০ বছরের বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানো কোনো সমস্যা হবে না।

বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থা চলছে সনাতনি পদ্ধতিতে। বংশপরম্পরায় কৃষক তার অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে কৃষিকাজ করছে। ফলে কৃষি খাতে উত্পাদনশীলতা কম। প্রতিটি কাজে সর্বোচ্চ দক্ষতা অর্জন করতে হলে প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। কৃষকদের খাতভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। এখানে আমি একটি বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৭৪ বছরে উন্নীত হয়েছে। ভবিষ্যতে এটা আরো বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান থেকে অবসর গ্রহণের বয়সসীমা ৫৯ বছর। এরপর একজন মানুষের আয় বর্ধক কাজে যুক্ত হবার খুব একটা সুযোগ থাকে না। অথচ অনেকেই চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পরও ১০/১৫ বছর জীবিত থাকেন। এই সময় তারা কর্মক্ষম থাকলেও তারা সাধারণত আয়বর্ধক কাজে যুক্ত হতে পারেন না। তারা পরিবারের ওপর বাড়তি বার্ডেন হিসেবে গণ্য হন। একজন মানুষ যখন অর্থ উপার্জনের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন তখন সমাজ-সংসারে তিনি অনেকটাই গুরুত্বহীন হয়ে যান। মূলত এ কারণেই কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণের পর অনেকেই দ্রুত বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েন। বর্তমানে দেশে ষাটোর্ধ্ব বয়সি মানুষের সংখ্যা প্রায় ২ কোটি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে কীভাবে বিনোদনমূলক আয়বর্ধক কাজে লাগানো যায় তা নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। যারা প্রবীণ জনগোষ্ঠী তারা প্রত্যেকেই বিভিন্ন কাজে দক্ষতাসম্পন্ন। তাদের দক্ষতার ওপর ভিত্তি করেই সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে। সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে যে বিপুলসংখ্যক মানুষ রয়েছেন তাদের মধ্যে বেশির ভাগই কর্মক্ষম। কাজেই এদের অর্থনীতির মূল স্রোতের বাইরে না রেখে কীভাবে তাদের অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতাকে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিশেষ দপ্তর স্থাপন করে দেশের সিনিয়র সিটিজেনদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করে তাদের বিভিন্ন গ্রেডে সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এরপর তাদের আগ্রহ অনুযায়ী ছোট ছোট কৃষি খামার, হাঁস-মুরগি পালন, কোয়েল পাখি পালন, ছাদবাগান করা ইত্যাদি আয়বর্ধন বিনোদনমূলক কাজে নিয়োজিত করা যেতে পারে। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের জন্য নামমাত্র সুদে তুলনামূলক সহজ শর্তে জামানতবিহীন প্রয়োজনীয় ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এটা করা হলে সিনিয়র সিটিজেনদের অবসর সময় ভালো কাটবে। তারা পরিবারের জন্য কোনো ‘দায়’ হিসেবে বিবেচিত হবেন না। পরিবারের অন্য সদস্যারাও তাদের কাজে সহায়তা করতে পারবেন। আমরা কয়েক জন সিনিয়র সিটিজেন দেশের বিভিন্ন জেলা ভ্রমণকালে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা বেশ কিছু সমন্বিত কৃষি খামারের সাফল্য প্রত্যক্ষ করেছি।

আমাদের মনে রাখতে হবে, দেশের সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে সিনিয়র সিটিজেনদের পেছনে ফেলে রেখে সেটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই তাদেরকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল স্রোতোধারায় যুক্ত করতে হবে। এজন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক লেখক