নীরবে সয়ে যাওয়াই যাদের জীবনের ব্রত

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২১, ২১:৪৯

সমাজ তার জন্মের পর থেকেই কিছু নিয়ম করে রেখেছে। সেভাবেই চলছে সমাজবদ্ধ মানুষ। সমাজ পুত্রসন্তানকে সম্পদ এবং কন্যাসন্তানকে দায় হিসেবে গণ্য করা শিখিয়েছে। এই মানসিকতার বিকাশও সমাজই ঘটিয়েছে। সমাজের নিয়ম মেনে নেয় সমাজের নারী-পুরুষ, পিতা-মাতা—সবাই। এখানেই সমাজব্যবস্থার বিজয়, আবার এখানেই সমাজব্যবস্থার ঐতিহাসিক ত্রুটি। প্রচলিত সমাজব্যবস্থা মেয়েদের যথাযোগ্য আর্থসামাজিক মর্যাদা রক্ষার অন্তরায়। সমাজ কন্যাসন্তানকে তৈরি করে ফেলেছে পিতা-মাতার দায় হিসেবে। এই বাস্তবতার নিয়ম মেনেই সমাজে কন্যাসন্তানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের প্রতি ঔদাসীন্য, বাল্যবিবাহ প্রদানের প্রবণতা এবং গার্হস্থ্য হিংসার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। সমাজের সবাই তা মেনে নিচ্ছে নীরবে। এমনকি এ নিয়মে যাদের ক্ষতি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি, সেই সব নারীও এর বাইরে দেখার প্রয়াস পাচ্ছেন না।

মানব সভ্যতার ক্রমান্বয় উত্তরণ কোনো কোনো উন্নত দেশে পৌঁছে গেলে সেখানে এ অসম ব্যবস্থার পরিবর্তনের সূচনা ঘটে। সেখানে কালো পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসার উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়; কিন্তু কোনো কোনো দেশ সমাজব্যবস্থার ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে আঁকড়ে থাকে এমন ব্যবস্থার মধ্যেই। হয়ে যায় অলক্ষ্যে এক অন্যায় বিচার; নারীকে করা হয় দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। বঞ্চিত করা হয় নারীকে জাগতিক সম্পত্তির মালিকানা থেকে। মা-বাবার ঘরে থাকে তার জন্য শূন্য স্থান, স্বামীর ঘরেও থাকে তার জন্য শূন্য স্থান। সম্পত্তি আসে শুধু পুরুষের হাতে। নারীর আর গড়া হয় না নিজের ঘর, নিজের সংসার। তার শুরু হয় বাবার বাড়ি দিয়ে, শেষ হয় স্বামীর বাড়ি দিয়ে। বর্তমান বাজারব্যবস্থায় আলু, পটল, বেগুন, মাছ, মাংস—সবকিছু হাতের নাগালের বাইরে। চড়া দাম সবকিছুর। তবে শুধু সস্তায় নয়, বরং বিনা মূল্যে লাভ করা যায় নারীর গৃহশ্রম। বিবাহের তকমা দিয়ে বধূ ঘরে এনে তার সমস্ত শ্রমকে বিনা মূল্যে পাওয়ার পাকা ব্যবস্থাই সমাজব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য। সমাজে দুর্ভাগ্যের অন্ধকার নিয়ে অপেক্ষা করে নারী সন্তানেরা। দারিদ্র্যতার অভিশাপে জর্জরিত অভিভাবক অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কন্যাসন্তানকে দায় হিসেবে মেনে নেন। তাই কন্যার ভবিষ্যত্ উন্নত করার তাগিদ তার অভিভাবকের দৃষ্টিতে বড় করে দেখা দেয় না। কোনোভাবে বিয়ে দিয়ে দায় সারার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় এসব অসহায় অভিভাবকদের মধ্যে। তাইতো ভ্রূণ হত্যা, গার্হস্থ্য হিংসা, ধর্ষণ ইত্যাদি নানা তথ্য কাঁপিয়ে দিচ্ছে আজকের সমাজকে। কষ্টের হলেও সত্য যে, শুধু পুরুষ নয়—এসব দেশের নারীকেও কেউ কেউ লিঙ্গবিদ্বেষ হূদয়ে লালন করে। মেয়েদের ‘মানুষ’ বলে মেনে নেওয়ার মতো শিক্ষা এসব দেশের একটি বড় অংশেরই নেই।

ধরুন, আপনার পায়ের আঙুলে হঠাত্ করেই ঘা দেখা দিল। আপনি ভাবলেন, এমনিতেই দুই দিনে ঠিক হয়ে যাবে। ডাক্তার দেখালেন না, হাসপাতালে গেলেন না। ঘা বাড়তে থাকল। ব্যথা বাড়তে থাকল। আপনি নিজেকে সান্ত্বনা দিলেন—‘শরীরের নাম মহাশয়, যাহা সহানো যায় তাহাই সয়’। না, ব্যথাটা কমছে না! বেশ বেড়েই যাচ্ছে। মা চিন্তিত হলেন, পাশের বাড়ির খালা চিন্তিত হলেন। টোটকা চিকিত্সা শুরু হলো। কেউ ফুঁ দিয়ে দিল, কেউ কিছু একটা ঠান্ডা লাগিয়ে দিল; কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। বরং হিতে বিপরীত হলো। ক্ষত গভীর হলো। যখন ডাক্তারের কাছে পৌঁছলেন, ততক্ষণে পায়ে সেপটিক হয়ে গিয়েছে। আঙুলটি কেটে না ফেললে উলটো প্রাণ সংহারের ভয় আছে। দোষ তো আপনার নয়! একটুখানি সয়ে যাওয়ার শিক্ষা নিয়েই তো আমরা বেড়ে উঠেছি। এই সয়ে যাওয়ার তিরেই তো নারীরা কুপোকাত। তাদের জীবনের অর্থ ও গৌরব দুই-ই লুকিয়ে আছে এই মুখ বন্ধ করে সয়ে যাওয়ার সমাজব্যবস্থায়। ঘরের মধ্যে নারীর প্রতি অত্যাচারের ঘটনা তো নিদারুণ চিন্তার বিষয়; কিন্তু তার চেয়েও বেশি চিন্তার বিষয় হলো, দেশের বিবাহিত নারীরা অত্যাচারের এ সামাজিক ব্যবস্থা যুগের পর যুগ বয়ে চলেছেন। মুখ বুজে সয়ে নিয়েছেন। জীবনের অংশ হিসেবে মেনে নিয়েছেন। খুব মারাত্মক কিছু না হলে এখান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেননি। শারীরিক আর মানসিক অত্যাচার যেমনই হোক, নারীরা শিক্ষা পেয়েছেন চেপে যেতে। সহনশীলতাকেই দেশের মেয়েরা জীবনের ব্রত হিসেবে মেনে নিয়েছেন। ‘স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এটুকু সমস্যা হতেই পারে’, ‘সংসারে থাকতে হলে মানিয়ে নিতে হয়’ কিংবা ‘বিয়ের পর স্বামীর ঘরই মেয়েদের আসল ঠিকানা’—এ জাতীয় ভাবনা আর পরামর্শ এবং একটু একটু করে সয়ে যাওয়ার চিরাচরিত শিক্ষাই তাদেরকে মুখ বন্ধ করে সবকিছু সয়ে নিতে সাহায্য করেছে। পাখা মেলে ওড়ার সাহস কিংবা ইচ্ছা কোনোটাই তাদের হয়নি।

সমসাময়িক গবেষণালব্ধ তথ্য বলছে, একদিকে লিঙ্গবৈষম্যের কারণে এবং অন্যদিকে আর্থসামাজিক কারণে দেশের নারীরা পুরুষের থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। এতটাই পিছনে যে, সিংহভাগ নারীই শত অন্যায়-অত্যাচারের পরও বিবাহবিচ্ছেদের পথে হাঁটতে চান না। আর এ সুযোগটাই নিচ্ছেন এক ধরনের পুরুষ। দেশে পারিবারিক হিংসা বৃদ্ধির এটি অন্যতম প্রধান একটি কারণ। আরো একটি দিক আছে। দেশে বিবাহবিচ্ছিন্ন নারীর সংখ্যা বিবাহবিচ্ছিন্ন পুরুষের দ্বিগুণেরও বেশি। সংখ্যাগত এ ব্যবধানের মূল কারণ হলো, বিবাহবিচ্ছিন্ন পুরুষের পুনর্বিবাহ সামাজিকভাবে অত্যন্ত সহজ। অন্যদিকে, নারীর পুনর্বিবাহ সামাজিক বাধার সম্মুখীন হয়। নারীর বিবাহবিচ্ছেদ চাওয়ার মূল কারণ গার্হস্থ্য হিংসা। তাই সামাজিক বাধা বাদ দিলেও সেই হিংসার ক্ষতকে অতিক্রম করে পুনর্বিবাহ তাদের পক্ষে দুঃস্বপ্নের মতো।

জাপানে নারীর আত্মহত্যা বেড়েছে। বিশেষ করে কোভিড সংক্রমণের সময় উদ্বেগজনক হারে আত্মহত্যা বেড়েছে। তারই মোকাবিলায় এবার এগিয়ে এলো জাপান সরকার। জাপানই হবে ব্রিটেনের পর দ্বিতীয় দেশ, যেখানে ‘একাকীত্ব মন্ত্রী’ নিয়োগ দেওয়া হলো। নতুন এ মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন তেতসুশি সাকামোতো। দায়িত্ব গ্রহণের পর মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাকে নারী আত্মহত্যার হার কমানোর উদ্দেশ্যে গঠিত নতুন এই একাকীত্ব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন। আশা করি, সামাজিক একাকীত্ব ও নিভৃতবাস রুখতে এবং মানুষের মধ্যে পারষ্পরিক বন্ধন আরো সুদৃঢ় করতে পারব।’ সংবাদ সংস্থা বিবিসির একটি রিপোর্ট বলছে, ২০২০ সালে জাপানে নারীর আত্মহত্যার হার মারাত্মকভাবে বেড়ে গিয়েছে।

জাপানে বন্ধ দুয়ারের অত্যাচার সহ্য না করতে পেরে প্রতিবাদ নয়, বরং আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে মেয়েরা। বিভিন্ন উন্নয়নশীল বিশ্বের সমাজ বাল্যবিবাহ দেখছে, সহ্য করে নিচ্ছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, জাপান—এসব দেশে ‘বিবাহ’ সামাজিক প্রতিষ্ঠান। বিবাহ দুইটি মানুষের আত্মিক যোগের চেয়েও বেশি জোর দেয় দুইটি পরিবারের সামঞ্জস্য ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর। এসব দেশের সমাজ মূলত পুরুষশাসিত। তাই নিয়মের বেড়াজাল তথা সমাজ ও পরিবার টিকিয়ে রাখার দায় মেয়েদেরই ওপর বর্তায়। সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে। শৈশব থেকেই এ সহজ পাঠটি মেয়েদের অনুভূতিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়। মেয়েদের চারপাশে সয়ে নেওয়ার আহ্বান যেন যুগ যুগ ধরে তাদেরকে শুধু সয়ে নেওয়াটাই শিখিয়েছে, সুস্থ হয়ে বাঁচতে শেখায়নি।

n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা