গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে নদীর বদ্বীপের ধারে বা নিচু স্থানে যেখানে সমুদ্রের লোনা পানি জমে, সেখানেই আংশিক কর্দমাক্ত স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে গড়ে ওঠে ম্যানগ্রোভ বনভূমি। এসব উদ্ভিদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—এদের ঊর্ধ্বমুখী শ্বাসমূল থাকে। আইইউসিএনের হিসাবমতে—গরান, সুন্দরী, গেওয়া, পশর, কেওড়া, বায়েন, গোলপাতাসহ প্রায় ৬১টি প্রজাতির বৃক্ষরাজির জন্ম হয় এসব বনভূমিতে। গবেষণা বলছে, বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় ১,৫০,০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এসব বনভূমি প্রকৃতি সুরক্ষায় প্রতিনিয়ত অবদান রেখে যাচ্ছে। কিন্তু অসচেতনতা ও অজ্ঞতাবশত মানুষ এসব বনভূমির ক্ষতি করে বসে। এমনই এক ঘটনা ঘটেছিল নব্বইয়ের দশকে। ইকুয়েডরে ম্যানগ্রোভ বন কেটে চিংড়ি চাষ শুরু হলে এর প্রতিবাদে ১৯৯৮ সালের ২৬ জুলাই আয়োজিত সমাবেশে একজন অংশগ্রহণকারীর মৃত্যু হয়েছিল। তারই স্মরণে প্রতি বছর ২৬ জুলাই আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এবং এই দিনে ম্যানগ্রোভ বনভূমি রক্ষায় বিভিন্ন কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো।
ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, নাইজারসহ পৃথিবীর ১০২টি দেশে ম্যানগ্রোভ বনভূমি থাকলেও বাংলাদেশের পদ্মা-মেঘনা-ব্রহ্মপুত্রে বদ্বীপে অবস্থিত ‘সুন্দরবন রিজার্ভ ফরেস্ট’ পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহত্তম গরান বনভূমি। ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তীর্ণ বনভূমিটি জীববৈচিত্র্যতার আধার। এখানে রয়েছে ২৮টি প্রজাতির ম্যানগ্রোভ বৃক্ষ, এখানে রয়েছে ৫০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২২০ প্রজাতির পাখি, ৫০ প্রজাতির সরীসৃপ, ৮ প্রজাতির উভচর প্রাণী এবং ৪০০ প্রজাতির মাছ। এখানকার অন্যতম আকর্ষণ রয়েল বেঙ্গল টাইগার। কাঠ, ওষুধ, মধুসহ বনজ সম্পদের প্রায় অধিকাংশই সুন্দরবন থেকে আসে। এটি বাংলাদেশের অন্যতম একটি পর্যটক স্থানও বটে। চোখ জুড়ানো সবুজের সমাহার বনটি ১৯৯২ সালের ২১ মে রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেসকোর প্রাকৃতিক বিশ্ব ঐতিহ্যে ঠাঁঁই করে নেয়। সুন্দরবন কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে অনবদ্য ভূমিকা রাখছে। সাম্প্রতিক তথ্যমতে, ৬৬২ টন কার্বন ডাইঅক্সাইড সুন্দরবনে আটকে আছে। বুলবুলের মতো শক্তিশালী প্রাকৃতিক জলোচ্ছ্বাস থেকেও প্রবল যত্নে আগলে রাখছে বাংলাদেশকে।
তবু পর্যাপ্ত যত্নের অভাবে দিন-দিন জৌলুস হারাচ্ছে সুন্দরবন। অসচেতনতা, পরিবেশদূষণ, তেলদূষণ, নদী ভরাটসহ নানা কারণে এখানকার জীববৈচিত্র্য হারাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে যে সুন্দরীগাছের সুবাদে বনটির নাম সুন্দরবন হয়েছে তাও আর পর্যাপ্ত জন্মাচ্ছে না। আগুনের তাণ্ডব পুড়েছে বনটি। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, বিগত দুই দশকে ২৪ বার আগুন লেগেছে এখানে। এমনকি চলতি বছরের ৩ মে সিগারেটের আগুন বনে ছড়িয়ে পড়লে দীর্ঘ ৩০ ঘণ্টার প্রচেষ্টায় তা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এতে করে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধে জনগণকে সজাগ হতে হবে। তবে আশার বাণী শোনাচ্ছে বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ব জুড়ে করোনা ভাইরাসের প্রভাবে মনুষ্যকুল যখন চরম বিপর্যয়ের মুখে তখন পর্যটকের আনাগোনা কমে যাওয়ার প্রাণ ফিরে পেয়েছে সুন্দরবন। এ অবস্থায় আরো চার পাঁচ-ছয় ছয় মাস চলতে থাকলে সুন্দরবন ফিরে পাবে তার হারানো সৌন্দর্য। তাই সুন্দরবনকে তার ঐতিহ্য ফিরিয়ে দিতে সর্বস্তরের জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারঘোষিত ১৯৯৯ সালের লক্ষ্মণরেখাকে যথাযথভাবে মানতে হবে। পাশাপাশি অভয়ারণ্য সংরক্ষণে বন বিভাগ ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সকল নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা একান্ত জরুরি। সুন্দরবনসহ পৃথিবীর সব ম্যানগ্রোভকে টিকিয়ে রাখতে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
