সিলেটের কোভিড রোগীদের জন্য সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা, এমনকি সাধারণ শয্যাও খালি নেই। আর অক্সিজেন সাপ্লাই নিয়ে টানাপোড়েন তো লেগেই আছে। সিলেট বেসরকারি হাসপাতাল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. নাসিম আহমদ জানান, বর্তমানে কোথাও শয্যা খালি নেই। পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এদিকে করোনা ডেডিকেটেড শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল, ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ করোনা রোগীদের নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। শয্যা দিতে না পেরে অসহায় বোধ করছেন তারা। অবস্থা এতটাই সঙ্গিন যে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া একজন পুরোনো রোগী সুস্থ হওয়া বা মারা যাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন নতুন রোগীরা। বেডের অভাবে অ্যাম্বুলেন্সেই রোগী মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। জেলা প্রশাসক জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোতে শয্যা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
গত শনিবার সিলেট বিভাগে করোনায় মাত্র এক জনের প্রাণহানিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছিল। কিন্তু রবিবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১০ জনের মৃত্যুর খবর সবার উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই ১০ জন নিয়ে সিলেট বিভাগে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৬১৭ জনে। এর মধ্যে শুধু সিলেট জেলায় মারা গেছেন ৪৯১ জন। এদিকে করোনা কেড়ে নিয়েছে সিলেটের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মুহাম্মদ ইসরাইল হোসেনকে। রবিবার বিকালে তিনি চিকিত্সাধীন অবস্থায় ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যান। তিনি গত ৩ জুলাই করোনা আক্রান্ত হন। ইসরাইল হোসেন ছাড়াও করোনায় আক্রান্ত হন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা সিলেটের সিনিয়র জেলা নির্বাচন অফিসার ফয়ছল কাদের, অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা শুক্কুর মাহমুদ, জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আবুল হাসনাত, বালাগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা সোহরাব হোসেনসহ বেশ কয়েক জন। জেলা প্রশাসক কাজী এমদাদুল ইসলাম রবিবার বিকালে ইত্তেফাককে জানান, সিলেটে ১০ জন ম্যাজিস্ট্রেট ও তাদের পরিবার করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।
অ্যাম্বুলেন্সে রোগীর মৃত্যু
করোনা ডেডিকেটেড সরকারি শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের সামনে শনিবার এক জন রোগী অ্যাম্বুলেন্সে মারা যাওয়ার হূদ্য়বিদারক ঘটনা ঘটে। হাসপাতালে সিট খালি নেই শুনেই চিত্কার করে কাঁদতে থাকেন হবিগঞ্জ থেকে আসা রোগী মুহিবুর রহমানের ছেলে। তার কান্নায় আশপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। আইসিইউ তো দূরের কথা, একটা সাধারণ সিটও মিলল না ১০০ বেডের শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে। পরে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যান সেই হতভাগ্য রোগী। গত কয়েক দিন যাবত্ সিলেটে এ রকম ঘটনা অহরহই ঘটছে। হাসপাতালে সিট না পেয়ে কেউ মারা যাচ্ছেন অ্যাম্বুলেন্সে, কেউ বাসায়।
রোগীরা নিবন্ধন করাচ্ছেন সিট খালি হলে শয্যা পাওয়ার আশায়
সিলেটে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল মিলে কোভিড চিকিত্সার জন্য রয়েছে প্রায় ৮০০ শয্যা। আর আইসিইউ শয্যা ১২১টি। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ৮৪টি সাধারণ ও ১৬টি আইসিইউ, ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তিনটি ওয়ার্ড মিলে ১৬৫টি সাধারণ ও আটটি আইসিইউ, খাদিমপাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩১টি করে সাধারণ আইসোলেশন শয্যা রয়েছে। এছাড়া সিলেটে বেসরকারি সব হাসপাতাল মিলে প্রায় সাড়ে ৪০০ সাধারণ ও ৯৭টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। কিন্তু কোথাও শয্যা খালি নেই। ভর্তি হতে না পেরে কেউ কেউ হাসপাতালগুলোতে নাম নিবন্ধন করাচ্ছেন সিট খালি হলে শয্যা পাওয়ার আশায়। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, ওসমানী হাসপাতালে কোভিড ওয়ার্ডের সব শয্যা পূর্ণ থাকায় নির্ধারিত ওয়ার্ড ছাড়াও অন্যান্য ওয়ার্ডেও কোভিড রোগীদের চিকিত্সা দিতে হচ্ছে।
মৃত্যু ও শনাক্ত উভয় সূচকই ঊর্ধ্বমুখী
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় রবিবার ১০ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়ে সিলেট স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে করোনায় মৃত্যু ও শনাক্ত উভয় সূচকই ছিল ঊর্ধ্বমুখী। ২৪ ঘণ্টায় সিলেটের চারটি ল্যাবে ১ হাজার ২২৩টি নমুনা পরীক্ষা করা হলে করোনা শনাক্ত হয় ৪৪০ জনের। নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ৩৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ। আগের দিন শনাক্তের হার ছিল ৩৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এ সময়ে নমুনা পরীক্ষায় শনাক্তের হার সবচেয়ে বেশি ছিল হবিগঞ্জে। এ জেলায় ১২০ জনের নমুনা পরীক্ষা করে করোনা শনাক্ত হন ৬৩ জন। শনাক্তের হার ছিল ৫২ দশমিক ৫০ শতাংশ।
এছাড়া সিলেটের ৭৮০টি নমুনা পরীক্ষা করে ২৬৬ জন, সুনামগঞ্জের ২২১টি নমুনা পরীক্ষায় ৭৮ জন ও মৌলভীবাজারের ১০২টি নমুনা পরীক্ষায় ৩৩ জনের করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়। ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আরো ২৩ জনের শরীরে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়।
