ইতিহাস বারবার স্মরণ করতে হয়। স্মরণ করিয়ে দিতে হয় নতুন প্রজন্মকে। তা না হলে ইতিহাসের মধ্যেও ঢুকে পড়ে ভাইরাস। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের জন্মলগ্ন থেকে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্যের মাত্রা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। এমতাবস্থায় পাকিস্তান মুসলিম লীগের প্রগতিশীল নেতৃবৃন্দ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে এক সম্মেলন আহ্বান করেন। উক্ত সম্মেলনে আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, সামছুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্মসাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ নামক একটি প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৩ সালের ১৪-১৫ নভেম্বর আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ সালের ২৩ অক্টোবর আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ নামটি সংশোধন পূর্বক পাকিস্তান আওয়ামী লীগ করা হয়।
১৯৫৪ সালের ৮ থেকে ১২ মার্চ প্রাদেশিক আইন পরিষদের নির্বাচনে কেএসপির প্রধান এ কে ফজলুল হক ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট অংশগ্রহণ করে। উক্ত নির্বাচনে ৩০৯টি আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট পায় ২২৩ (আওয়ামী লীগ পায় ১৪৩, কেএসপি ও অন্যান্য ৮০) মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনসহ মুসলিম লীগের অন্য সব মন্ত্রীর ভরাডুবি হয়, যা তদানিন্তন পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী নেতিবাচকভাবে গ্রহণ করে। ১৯৫৪ সালের ১৫ মে এ কে ফজলুল হক মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন ও ১৪ সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন করা হয়। মন্ত্রিপরিষদের সদস্য আতাউর রহমান খান, শেখ মুজিবুর রহমান, আবুল মনসুর আহমেদ, এম মনসুর আলী, আবদুস সালাম খান, আবু হোসেন সরকার, খয়রাত হোসেন, কফিল উদ্দিন চৌধুরী, সৈয়দ মোয়াজ্জেম উদ্দীন প্রমুখ। ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৫৮ সালের ৬ অক্টোবর পর্যন্ত আতাউর রহমান খান মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর জেনারেল আইয়ুব খান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিব, মনসুর আলী, তাজউদ্দীন আহমেদসহ শত শত নেতা ও অসংখ্য কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
১৯৬৬ সালের ২৫ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি, তাজউদ্দীন আহমেদ সাধারণ সম্পাদক এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও এম মনসুর আলী সহসভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত আরটিসি সম্মেলনে শেখ মুজিব বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন এবং আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
৬ দফা দাবির সমর্থনে আওয়ামী লীগ ১৯৬৬ সালের ৭ জুন পূর্ব পাকিস্তানব্যাপী হরতাল আহ্বান করে। হরতালে পুলিশের গুলিতে মনু মিঞা, আবুল হোসেন, শফিকসহ মোট ১১ জন শহিদ হন। ৬ দফার মধ্যেই স্বাধীনতার মূল বীজ বপন করা হয়। ১৯৬৮ সালে ৬ দফা আন্দোলন পর্যায়ক্রমে বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়।
১৯৬৮ সালের ৬ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রেসনোট প্রকাশ করা হয়। তাতে সরকারি ভাষ্যে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের তদন্তের অগ্রগতির বিবরণ এবং গ্রেপ্তারকৃত ২৮ জনের নাম প্রকাশ করা হয়। উক্ত প্রেসনোট ৭ জুন ডনসহ পাকিস্তানের অন্যান্য পত্রিকায় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হয়। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখিত যে, পাকিস্তানের নিরাপত্তা আইনে শেখ মুজিব ১৯৬৬ সালের ৯ মে থেকেই কারাগারে আটক ছিলেন। ১৮ জানুয়ারি মধ্যরাতের পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আকস্মিকভাবে শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দেওয়া হয়। অতঃপর তাত্ক্ষণিকভাবে কয়েক জন সেনা কর্মকর্তা শেখ মুজিবকে পুনরায় গ্রেপ্তার-পূর্বক ঢাকা সেনানিবাসে স্থানান্তর করে।
১৯৬৮ সালের জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান অভিযুক্ত করে মোট ৩৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটির রাষ্ট্রীয় শিরোনাম ছিল ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য’, যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবে পরিচিত লাভ করে। ১৯৬৮ সালের ১৯ জানুয়ারি পাকিস্তান দণ্ডবিধি ১২১ ধারা এবং ১৩১ ধারায় মামলটি শুরু করা হয়। পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি জাস্টিজ শেখ আব্দুর রহমানকে চেয়ারম্যান করে একটি বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠনপূর্বক মামলাটির বিচারের দায়িত্ব উক্ত ট্রাইব্যুনালের ওপর ন্যস্ত করা হয়। উক্ত ট্রাইব্যুনালের অপর দুজন সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয় জাষ্টিজ মুজিবুর রহমান খান ও জাস্টিজ মাকসুদুল হাকিমকে।
সেই মামলায় সরকারি পক্ষের প্রধান কৌঁসুলি ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মঞ্জুর কাদের এবং টি এইচ খান। বিবাদীপক্ষের প্রধান কৌশলী ছিলেন আব্দুস সালাম খান, আতাউর রহমান খান ও ড. কামাল হোসেন। ১৯৬৮ সালের ২৯ জুলাই মামলার শুনানি পুনরায় শুরু হয়। প্রখ্যাত ব্রিটিশ আইনজীবী ও ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য টমাস উইলিয়াম ট্রাইব্যুনালে শেখ মুজিবের পক্ষে প্রধান কৌঁসুলি ছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রখ্যাত আইনজীবী মাহমুদ আলী কাসুরী, জুলফিকার আলী ভুট্টো বিবাদীদের পক্ষে প্রতীকী অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৬৮ সালের ৫ আগস্ট টমাস উইলিয়াম শেখ মুজিবের পক্ষে ট্রাইব্যুনাল গঠনসংক্রান্ত বিধানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন পেশ করেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত করার নিমিত্তে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ১৯৬৯ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি রাওয়ালপিন্ডিতে গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান করেন। উক্ত বৈঠকে মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবকে (প্যারোলে মুক্তি) আমন্ত্রণ জানানো হয়। মওলানা ভাসানী ও বেগম মুজিব উক্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। বেগম মুজিব বলেন, শেখ মুজিব একজন মুক্ত মানুষ হিসেবে উক্ত বৈঠকে যোগদান করতে পারেন। (তথ্যসূত্র : কর্নেল শওকত আলী লিখিত ‘সত্য মামলা আগরতলা’, পৃষ্ঠা নম্বর :১৩৭)।
পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন করার নিমিত্তে শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মতিক্রমে একটি বিপ্লবী সংস্থা গঠন করা হয়। স্বাধীনতার স্বপ্ন লালন করা ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে যাদের অবদান অবিস্বরণীয় এবং উল্লেখিত মামলায় অভিযুক্ত, তাদের কয়েকজন লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন (১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ভোরবেলায় পাকিস্তানের সেনাসদস্যের গুলিতে নিহত হন), স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান (১৯৭২ সালের ৫ জানুয়ারি আততায়ীর গুলিতে নিহত হন)। লিডিং সিমান নুর মোহাম্মদ, আহমেদ ফজলুর রহমান সিএসপি, রুহুল কুদ্দুস সিএসপি, সামসুর রহমান খান সিএসপি, সার্জেন্ট জহুরুল হক, ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হক, ক্যাপ্টেন এম শওকত আলী, ক্যাপ্টেন নুরুজ্জামান প্রমুখ।
নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে ১৯৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথ উত্তাল হয়ে ওঠে। হাজার হাজার ছাত্র, শ্রমিক, জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে রাষ্ট্রীয় অতিথী ভবনে (বর্ধমান হাউজ) হামলা চালায় এবং অগ্নিসংযোগ করে। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান ও প্রধান কৌশলী মঞ্জুর কাদের অবস্থান করতেন। তারা উভয়েই ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে তেজগাঁও এয়ারপোর্টে যান। অতঃপর রাতের ফ্লাইটে লাহোরের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহা নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ঢাকাসহ সমগ্র প্রদেশ জ্বলন্ত আগ্নেয়গীরিতে রূপান্তরিত হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সন্ধ্যা ৭টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়। কারফিউ ভঙ্গ করে লক্ষাধিক শ্রমিক, ছাত্র, জনতা মশাল মিছিল নিয়ে রাজপথে বেরিয়ে আসেন।
১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় এবং শেখ মুজিবসহ ৩৪ জন রাজবন্দিকে সসম্মানে মুক্তি দেওয়া হয়। ৬ দফা আন্দোলনই স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল টার্নিং পয়েন্ট বলে বিবেচিত হয়।
n লেখক : প্রাক্তন সাংগঠনিক সম্পাদক, জাতীয় চার নেতা পরিষদ
