বৃদ্ধাশ্রম নয়, ভালোবাসা আশ্রম হয়ে উঠুক

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২১, ২১:৪৮

সময়ের পরিবর্তন হচ্ছে, সেই সঙ্গে পরিবর্তন হচ্ছে আমাদের চিন্তাধারা ও জীবনধারায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে আমরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যে বিশ্বে প্রবেশ করেছি, তাতে অনেকটা যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে আমাদের জীবন। চিরায়ত পরিবারের দায়িত্ব ও কর্তব্য কিছুটা ক্ষীণ হয়ে গেলেও সন্তানের প্রতি মা-বাবার যে নিরন্তন ভালোবাসা, তাতে বিন্দু পরিমাণ ঘাটতি হচ্ছে না। কিন্তু শেষ বয়সে এসে কি মা-বাবা আমাদের পরিপূর্ণ ভালোবাসা, সেবা- যত্ন পাচ্ছেন? যে গুটি গুটি পায়ে আদরের ছোট্ট সন্তানটি হাঁটত, সে মানুষের মতো মানুষ হয়। সময় ও জীবনের শৃঙ্খলে বন্দি হয়ে যায়। শত ব্যস্ততার মাঝে একান্ত কাজ করার সময় হলেও নিজের বৃদ্ধ মা-বাবার খোঁজ নেওয়ার সময় হয় না। ছোটবেলায় যে মা-বাবা ছিলেন পৃথিবীর একমাত্র আশ্রয়স্থল, বৃদ্ধ বয়সে সেই মা-বাবাকে সন্তান ঝামেলা মনে করছে, নিজের কাছে রাখার ন্যূনতম প্রয়োজনও বোধ করছে না। সংসারের ভার কাঁদে নিয়ে যে মা-বাবা জীবনের ষাটটি বছর পার করেছে, জীবনের শেষ মহূর্তে এসে তাঁরা নিজেদের আশ্রয় খুঁজে নিতে বাধ্য হচ্ছে ‘বৃদ্ধাশ্রমে’।

‘বৃদ্ধাশ্রম’ কথাটা শুনলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে বয়োবৃদ্ধ মা-বাবার ছবি, যারা শেষ বয়সে এসে নিরন্তন ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই চান না। যারা সন্তানের ছোট পরিবারকে আগলে রেখে জীবনসায়াহ্নে হাসি-খুশি কাটাতে চান। দিন শেষে সন্তানের মুখে ‘মা’ ‘বাবা’ ডাক শুনে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে চান। অথচ মানবতার চরম উপহাস! সেই সন্তানই ক্রমে ভুলে যায় বাবা-মায়ের সেই স্মৃতিবিজড়িত দিন। তাকে আগলে রাখার প্রতিটি মুহূর্ত। মানুষের মতো মানুষ করার প্রতিটি পদক্ষেপ। নিত্যনতুন  বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন থাকে। থাকেন না ‘জন্মদাত্রী মা’ আর হাজারো ঝড়ের মাঝে আগলে রাখা ‘ত্রাণকর্তা বাবা’।

পৃথিবীর প্রথম বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠেছিল প্রাচীন চীনে। খ্রিষ্টপূর্ব ২২০০ শতকে শান রাজবংশ পরিবার থেকে বিতাড়িত বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য আলাদা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে বৃদ্ধাশ্রম নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল। বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রমের ধারণা প্রবর্তন করেন ডা. এ কে এম আবদুল ওয়াহেদ। মূলত বার্ধক্যে শারীরিক-মানসিক সুস্থতা ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপনের জন্য বৃদ্ধাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে ডা. এ কে এম আবদুল ওয়াহেদের তত্পরতায় ১৯৬০ সালে ‘বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরাবিজ্ঞান’ প্রতিষ্ঠিত হয়। সরকারি উদ্যোগে ১৯৮৫ সালে ঢাকার আগারগাঁওয়ে নিজস্ব ভবন ও পরে ১৯৯৩-৯৪ সালে সরকারি অনুদানে হাসপাতাল ও হোম ভবন নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে সারা দেশে প্রতিষ্ঠানটির ৫০টিরও বেশি শাখা রয়েছে। এছাড়া বেশ কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রবীণদের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। যেমন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতি, প্রবীণ অধিকার ফোরাম, ইআইডি, ব্রাক প্রভৃতি। সংস্থাগুলো মূলত শেষ বয়সে যাদের সহায়-সম্বল নেই, বার্ধক্যে যাদের সেবা-শুশ্রূষা প্রয়োজন, তাদের কথা মাথায় রেখে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে।

বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব সাফল্যে চিকিত্সাশাস্ত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে, যার ফলে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ায় প্রবীণদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজকের যে নবিন, ভবিষ্যতে সে প্রবীণ হবে। প্রকৃতির এক অমোঘ খেয়ালে মানুষের যে জীবনচক্র তাতে সবাইকে বার্ধক্যের স্বাদ নিতে হবে। আজ যে মা-বাবাকে নানা অজুহাতে দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ভবিষ্যতে যে তার প্রতিফলন হবে না তা তো নয়। প্রকৃতির আপন খেয়ালে মানুষ তার কর্মফল ভোগ করে। তাই পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ মা-বাবাকে অবহেলা, অবজ্ঞার চোখে না দেখে তাদের সেই চোখে দেখা উচিত, যে চোখে একজন মা-বাবা সন্তানকে দেখে। যেভাবে মা-বাবা সন্তানকে আগলে রাখে ঠিক সেভাবে বৃদ্ধ বয়সে তাদের সন্তানতুল্য স্নেহ-ভালোবাসা, সেবা-যত্ন করা উচিত। মায়া-ভালোবাসার বন্ধনে অটুট থাকুক প্রতিটি পরিবার। বৃদ্ধ মা-বাবাকে শেষ বয়সে দূরে ঠেলে নয় বরং মায়াগ্রন্থির জালে সেবা-শুশ্রূষা ও ভালোবাসায় তাদের যত্নে রাখুক সন্তান, এটাই কাম্য। আমাদের পৃথিবীতে বৃদ্ধাশ্রম নয়, ভালোবাসা আশ্রম হয়ে উঠুক প্রতিটি শহর, প্রতিটি অলিগলিতে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়