নিষিদ্ধ হওয়া আট জঙ্গি সংগঠনের মধ্যে আনসার আল ইসলামের সাংগঠনিক কার্যক্রম এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে রীতিমতো ‘বিষফোড়া’। নামে বেনামে অত্যন্ত গোপনীয়তার মধ্যদিয়ে এ সংগঠনটি তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজানে ভয়ংকর জঙ্গি হামলার পর থেকে এ পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছে। তবে এই সংগঠনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মেজর (চাকরিচ্যুত) সৈয়দ জিয়াউল হক ওরফে মেজর জিয়া এখনো অধরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, মেজর জিয়ার অবর্তমানে বা তার আত্মগোপনে থাকার সূত্র ধরে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জন ইসলামি বক্তার আড়ালে এই সংগঠনের মতাদর্শ প্রচার করছে। এরই সূত্র ধরে গত ১৫ জুলাই রাজধানীর শাহ আলী থানার বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে সংগঠনের শীর্ষ নেতা মওলানা মাহমুদুল হাসান গুনবীকে গ্রেফতার করে র?্যাব।
র?্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, এই গুনবী প্রকাশ্যে ওয়াজের মাধ্যমে নিষিদ্ধ এই সংগঠনের পক্ষের প্রচারণা করেন। বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির পাহাড়ে গোপনে তিনি সংগঠনের হয়ে কাজ করেছেন। এছাড়া নোয়াখালীর চরাঞ্চল ও রাজবাড়ী এলাকায় তার ওয়াজের ভক্তদের নিয়ে গোপন বৈঠক করেছেন। মূলত ‘মগজ ধোলাই’য়ের কাজটি তিনি করেন। তিনি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার যে কোনো রাজনৈতিক সরকারকে উত্খাতের জন্য উসকানি দিয়ে থাকেন। মাঝেমধ্যে তিনি আফগানিস্তানে তালেবানকে উদাহরণ হিসেবে এনে বলে থাকেন, ‘তারা যদি পারে, আমরাও পারব। আমাদের কি ইমানি শক্তি নাই?’
এক প্রশ্নের জবাবে র্যাবের ঐ কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, ‘আফগানিস্তান থেকে তালবানের কোনো সদস্য তাদের দলে রিক্রুট হয়েছে কি না অথবা আনসার আল ইসলামের কোনো সদস্য তালেবানে যোগ দিয়েছে কি না— সে সম্পর্কে গুনবী কোনো তথ্য দেননি। তবে আনসার আল ইসলামের গ্রেফতারকৃত আধ্যাত্মিক নেতা জসীমুদ্দিন রাহামানীর সঙ্গে বহুবার গুনবীরের দেখা হয়েছিল। মোহাম্মদপুরের বছিলার মাদ্রাসায় রাহমানীর সঙ্গে দেখা হওয়ার সময় আনসার আল ইসলামের মতাদর্শের বয়ান গ্রহণ করেছিলেন। সংগঠনের পলাতক নেতা মেজর জিয়ার সঙ্গে গুনবীর দেখা হওয়ার কোনো তথ্য মেলেনি।’
গুনবী র্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজ অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটে হস্তান্তর করা হয়। সিটিটিসি তাকে দুই দফায় দুই দিন করে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়ার পর গত শনিবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন গুনবী। জবানবন্দিতে তিনি বিভিন্ন জায়গায় দেওয়া বক্তব্যকে ভুল বলে স্বীকার করেন। তবে কাদের নির্দেশে আফগানিস্তানের তালেবানের পক্ষ নিয়ে প্রকাশ্যে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন, সে বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন গুনবী।
সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান, আনসার আল ইসলাম চেষ্টা চালাচ্ছে প্রকাশ্যে দাওয়াতি কাজ করতে। মাদ্রাসার উগ্রপন্থি শিক্ষক, অনলাইনে মগজ ধোলাই করা তরুণ বয়সের ইসলামিক চিন্তা-চেতনার যুবকদের চাইছে সংগঠনের সদস্য হিসেবে ‘রিক্রুট’ করে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে সক্রিয় করতে। আনসার আল ইসলামের সাংগঠনিক কাঠামো বেশ শক্তিশালী। সিটিটিসির উপকমিশনার আব্দুল মান্নান বলেন, আনসার আল ইসলাম আল-কায়েদা ও তালেবান স্ট্র্যাটেজিতে বিশ্বাসী। তাদের কাছ থেকে এখনো কোনো অস্ত্রের ব্যবহার বা হামলার কোনো ছক এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে তারা যে কোনো গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থাকে উত্খাত করতে বদ্ধপরিকর।
আনসার আল ইসলাম ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত ১৩টি হামলার দায় স্বীকার করে। এসব ঘটনায় নিহত হন ১১ জন, যাদের অধিকাংশ ছিলেন ব্লগার। নিহতদের মধ্যে আরো ছিলেন প্রকাশক, শিক্ষক ও সমকামী অধিকারকর্মী।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, এ পর্যন্ত আটটি সংগঠনকে জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সংগঠনগুলো হলো শাহাদত-ই-আল হিকমা, হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ (হুজিবি), জামায়াতুল মুজাহেদিন বাংলাদেশ (জেএমবি), জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি), হিযবুত তাহরীর, আনসারুল্লাহ বাংলাদেশ টিম (এবিটি), আনসার আল ইসলাম ও আল্লাহর দল। এগুলোর মধ্যে আনসার আল ইসলাম সবচেয়ে বেশি সক্রিয়।
