হে পবিত্র সংবিধান, তোমার প্রকৃত জন্মদাতা কে?

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ২১:২৭

নদীতে ডুবন্ত মানুষ নাকি তৃণখণ্ড আশ্রয় করে বাঁচতে চায়। প্রবাদটা যে কতো সত্য, তা আসন্ন নির্বাচন নিয়ে ডামাডোলের সময় বোঝা যাচ্ছে। এককালের বীর মুক্তিযোদ্ধা, অসাম্প্রদায়িক চেতনার যুব নেতা, বঙ্গবন্ধুর এককালের অত্যন্ত কাছের মানুষ, রাজনীতিতে পরে পথভ্রষ্ট হয়ে, বারবার জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাচ্ছিলেন, তারা হঠাত্ বাঁচার জন্য তৃণখণ্ড আশ্রয় করেছেন। এই তৃণখণ্ডটি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ-বিরোধী, সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধ চক্রগুলোর একটি জোট।

এই জোটে ড. কামাল হোসেনের মতো বঙ্গবন্ধুর এককালের ছায়া সহচর, আ.স.ম. আব্দুর রবের মতো একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা বা সুলতান মনসুরের মতো এককালের কট্টর আওয়ামী লীগার যে যোগ দিতে পারেন, সে কথা কি বিশ্বাস করা যায়? কিন্তু সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশে এখন সবই সম্ভব, সবই বিশ্বাস করা যায়। বর্তমান আওয়ামী লীগের নীতি ও নেতৃত্বের সঙ্গে মতৈক্য না থাকায় এই নেতারা নিজস্ব দল ও জোট করেছেন। নিজেদের এই অবস্থানে থেকে আওয়ামী লীগের বিকল্প কোনো অসাম্প্রদায়িক জোট গঠন করে আওয়ামী লীগ-জোটের বিরোধিতায় নামলে আপত্তির কিছু ছিল না। বরং তাতে দেশে গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্তিশালী হতো।

কিন্তু এই গণতান্ত্রিক বিরোধিতার রাজনীতিতে সফল হওয়ার জন্য যে সময়টুকু ধৈর্য ধরার প্রয়োজন, জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য যে ত্যাগ ও নীতিনিষ্ঠা প্রয়োজন সেই ধৈর্য ধরা দূরের কথা, সেই প্রয়োজনটুকুও তারা পূরণ  করেননি। ক্ষমতার লোভ তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। ফলে দল গঠন করে দল ভাঙাভাঙি এবং নেতৃত্বের কোন্দলেই তারা ব্যস্ত রয়েছেন। জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেননি। রাজনীতিতে ধীরে ধীরে তারা ফসিল হয়ে গেছেন।

এই ফসিল অবস্থা থেকে মুক্তি লাভ এবং আবার ক্ষমতায় যাওয়ার লোভে তারা এসে জুটেছেন তাদের নীতি আদর্শের সম্পূর্ণ বিরোধী এমন সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধদের জোটে, যে জোটে একাত্তরের পরাজিত শত্রুরাও আছে। সম্ভবত এই ব্যাপারে আত্মগ্লানি বোধ এবং জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার লক্ষ্যে তারা বঙ্গবন্ধুর নাম বারবার উচ্চারণ করে নিজেদের এখনো বঙ্গবন্ধুর অনুসারী প্রমাণ করতে চাচ্ছেন।

“সেলুকাস কী বিচিত্র এই বঙ্গদেশ” বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদিবসে যারা জন্মদিন পালনের উত্সব করে, বঙ্গবন্ধুর নাম-নিশানা পর্যন্ত ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চক্রান্ত করেছে, তাদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে সুলতান মনসুর শ্লোগান দিচ্ছেন জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর ও জাতীয় নেতাদের ঘাতক ও ঘাতকদের সমর্থকদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে কাদের সিদ্দিকী দাবি করছেন তিনি বঙ্গবন্ধুর অনুসারী এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনীতিই তার রাজনীতি। বঙ্গবন্ধু যদি আজ টুঙ্গিপাড়ার সমাধি থেকে জেগে উঠতেন এবং এদের কার্যকলাপ দেখতেন, তাহলে হয়ত জুলিয়াস সীজারের মতো বিচলিত ভাষায় বলতেন, “ব্রুটাস দাউ টু”?

এই ব্যাপারে ড. কামাল হোসেন দেখিয়েছেন আরও চমত্কার খেলা। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর যিনি মস্কোর এক সেমিনারে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “৭১-এর পরাজিত শত্রুরা বাংলাদেশে ক্ষমতা দখল করেছে”, তিনি এখন সেই পরাজিত শত্রুপক্ষে যোগ দিয়ে বঙ্গবন্ধু-কন্যাকে স্বৈরাচারী শাসক আখ্যা দিয়ে তার বিচার ও কঠোর শাস্তিদানের হুমকি দিচ্ছেন। একই সঙ্গে তার এই পদস্খলন সম্পর্কে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার জন্য কথায় কথায় এখন বঙ্গবন্ধুর নামে দোহাই পারা শুরু করেছেন। বঙ্গবন্ধুর অনুসারী থাকাকালের ছবি ও নানা কাহিনি মিডিয়ায় অতিরঞ্জিত করে প্রচার করা হচ্ছে। অর্থাত্ এই হতাশ এবং ব্যর্থ রাজনীতিককে ইতিহাসের মহানায়ক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হচ্ছে। রঞ্জন অতিরঞ্জন দ্বারা তাকে মহান নেতা হিসেবে তুলে ধরার পরিকল্পিত প্রয়াস এখন একশ্রেণির মিডিয়ায় বিশেষভাবে পরিলক্ষিত।

গত শুক্রবার (১৬ নভেম্বর) একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে দেখলাম এই ধরনের একটি প্রচার। লেখাটির হেডিং দেখে হাসব, না কাঁদব তা বুঝে উঠতে পারিনি। এই হেডিং হলো “ড. কামাল হোসেন : যাকে ছাড়া বাংলাদেশের ইতিহাস অসম্পূর্ণ।” লেখাটি পড়েই মনে হলো ফরমায়েশি লেখা। লেখাটা জুড়ে রয়েছে কেবল বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ড. কামালের তোলা ছবি। তখনই এ লেখার উদ্দেশ্য বুঝতে আমার দেরি হয়নি।

লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে, “৩৫ বছর বয়সে তিনি একটি স্বাধীন দেশের প্রথম আইনমন্ত্রী হন।” কিন্তু  কী করে তিনি পাকিস্তান থেকে দেশে ফিরেছিলেন এবং আইনমন্ত্রী হয়েছিলেন সে কাহিনি চেপে যাওয়া হয়েছে। লেখাটিতে বলা হয়েছে, “ড. কামাল হোসেনের জীবনের আরেকটি বড় সাফল্য জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্বীকৃতি।’ দেশ স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কমনওয়েলথ এবং জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের জন্য বঙ্গবন্ধু তাঁর ব্যক্তিত্ব ও ক্যারিশমা ব্যবহার করে কীভাবে এই সদস্যপদ অর্জন করেছিলেন সে এক দীর্ঘ ইতিহাস! নামে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হলেও তখন ড. কামালের কী ব্যক্তিত্ব ও পরিচিতি ছিল যে তার কথায় বাংলাদেশ জাতিসংঘের স্বীকৃতি পেয়ে যাবে? এটাতো জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বানানোর মতো প্রচারণা।

তদানীন্তন দুই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডোয়ার্ড হিথ এবং হ্যারল্ড উইলসন দুজনের সঙ্গেই বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। বাংলাদেশকে কমনওয়েলথের সদস্যপদ দান করা হলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভূট্টো কমনওয়েলথ ত্যাগের হুমকি দেন। ব্রিটিশ সরকার বিব্রত অবস্থায় পড়েন। বঙ্গবন্ধু এই সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে সরাসরি কথা বলেন এবং ব্রিটেন অন্যান্য সদস্যসহ বাংলাদেশকে কমনওয়েলথের সদস্যপদ দানে অটল থাকে। পাকিস্তান তখনকার মতো কমনওয়েলথ থেকে  বেরিয়ে যায়। জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের জন্যও বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও তার তত্কালীন বিশ্ব জোড়া খ্যাতি কাজ করেছে। টাইম ম্যাগাজিনে পর্যন্ত তখন বঙ্গবন্ধু কভারের ছবি হয়ে ছিলেন। ড. কামাল হোসেন তখন কোথায়? তার কী পরিচয়!

এই ফরমায়েশি লেখাটির অতিরঞ্জিত, রঞ্জিত সাতকাহন নিয়ে লিখে পাঠকদের সময় নষ্ট ও ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে চাই না। শুধু লেখাটির একটি মন্তব্য সম্পর্কে পাঠকদের বিভ্রান্তি দূর করব। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ড. কামালের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতা।’ এই দাবিটিও কি সঠিক? আরেকটি অনলাইন নিউজে দেখলাম, নির্বাচনের তারিখ আরও পিছানোর দাবি নিয়ে ড. কামাল হোসেন সিইসির কাছে যান এবং এই ব্যাপারে সংবিধানের বাধ্যবাধকতার কথা তুলে চীফ ইলেকশন কমিশনার তার অক্ষমতার কথা জানালে ড. কামাল রেগে উঠে বলেন, ‘আমি সংবিধানের রচয়িতা, আপনি আমাকে সংবিধান শেখাবেন?’

এই খবর কতোটা সত্য, আমি জানি না, তবে ড. কামাল হোসেন নিজের মর্যাদা ও অবস্থান ভুলে গিয়ে সময় সময় যে অশোভন আচরণ করেন, তার অনেক নজির আছে। যা হোক এ খবরটি সত্য হোক আর না হোক তাকে সংবিধান প্রণেতা বলে যে প্রচার অভিযান এখন নতুনভাবে শুরু হয়েছে সে সম্পর্কে একটু আলোচনা করা যাক।

এ সময় আমিও দেশে ছিলাম এবং বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত কাছাকাছি ছিলাম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর সবচাইতে বড় কৃতিত্ব সঙ্গে সঙ্গে দেশের সংবিধান প্রণয়ন, পাকিস্তানের যে সংবিধান প্রণয়নে লেগেছিল আট বছর। বন্ধবন্ধুর নির্দেশে তত্কালীন গণপরিষদের কয়েকজন সিনিয়র বিশেষজ্ঞ নিয়ে সংবিধান কমিটি গঠিত হয়। ড. কামাল হোসেন তখন আইনমন্ত্রী। পদাধিকার বলে তিনি সংবিধান প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান হননি। চেয়ারম্যান হওয়ার কথা যার ছিল, তিনি হননি। বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছায় ড. কামাল হোসেন চেয়ারম্যান হন।

এ সম্পর্কে তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, কমিটিতে আইনজ্ঞ ও সংবিধান-বিশেষজ্ঞ অনেক সদস্য আছেন। তাদের কাউকে চেয়ারম্যান করা যায় না? ভারতে তো নেহেরু করেছিলেন ডা. আম্বেদকরকে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, তা হোক, কামাল তরুণ এবং কর্মঠ। সে কমিটির কোঅর্ডিনেশন ভালো করবে। সংবিধান তো লিখবেন সদস্যরা সকলে মিলে। তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করবেন। প্রয়োজনে বাইরের সংবিধান-বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও আলোচনা করবেন।

এই হলো বাংলাদেশের ’৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নের কাহিনি। এটা কমিটির বিশেষজ্ঞ সদস্যরা মিলে তৈরি করেছেন। ড. কামাল হোসেন তাদের মধ্যে একজন মাত্র। তাকে সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা বলা চলে। কিন্তু আজ সময় ও সুযোগ বুঝে তাকে সংবিধান-প্রণেতা বলা সত্যের অপলাপ এবং ’৭২ সালের কমিটির অন্যান্য সদস্যকে অবমাননাতুল্য। আমি যতদূর জানি, এই সংবিধান বাংলায় তরজমা করেছিলেন ড. আনিসুজ্জামান। খুলনার প্রয়াত শিল্পী আব্দুর রউফের হাতের লেখা অত্যন্ত সুন্দর ছিল। সংবিধানের প্রথম কপিটি ছাপা হয়নি। আব্দুর রউফ হাতে লিখেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু দেশে বাকশাল-পদ্ধতি প্রবর্তন করলে এই সংবিধানটির পরিবর্তন দরকার হয়। তখন সেই সময়ের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদউল্লা চৌধুরীর কাছে ছিল সংবিধানের এই প্রথম কপিটি। তার প্রেস সেক্রেটারি মাহ্বুব তালুকদারের (বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের সদস্য) কাছে আমি কপিটি দেখেছিলাম। বর্তমানে এটি আর্কাইভে আছে কিনা জানি না।

ড. কামাল হোসেনকে এখন বলা হচ্ছে সংবিধানের একক প্রণেতা। তাহলে এই সংবিধান যখন স্বাধীনতার শত্রুরা ছেঁড়াখোড়া করে, তখন তিনি কোথায় ছিলেন? আর এই সংবিধান যারা অবৈধভাবে ছেঁড়াখোড়া করেছে, এই বৃদ্ধ বয়সে তাদের সঙ্গে গিয়ে কী করে হাত মেলান?

[ লন্ডন, ১৭ নভেম্বর, শনিবার, ২০১৮ ]