মানুষের জীবন যেমন অমূল্য, তেমনি তাহার বাঁচিয়া থাকিবার জন্য ন্যূনতম কাজের নিশ্চয়তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নহে। আর এইখানেই প্রশ্ন জাগিতে পারে—জীবন আগে, নাকি জীবিকা আগে? যে কেহ খুব সহজেই বলিবেন, জীবন অবশ্যই আগে। কারণ, জীবন না থাকিলে জীবিকার কোনো প্রশ্নই আসে না। কিন্তু জীবিকা না থাকিলে জীবন টিকিবে কী করিয়া? তাহার মানে, মহামূল্যবান জীবনকে রক্ষা করিতে জীবিকাই একমাত্র অক্সিজেন। সেই অক্সিজেন ছাড়া বাঁচিবে না জীবন। জীবন ও জীবিকা উভয় শব্দের মধ্যে ‘জীব’ তথা ‘প্রাণ’ রহিয়াছে। জীবিকার আভিধানিক অর্থ হইল—জীবনধারণের উপায়। অর্থাত্ জীবিকা ব্যতীত জীবন ধারণ সম্ভব নহে। এখন করোনার কারণে সারা বিশ্বেই বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকার উপর কোপ পড়িয়াছে বিধায় ইহা প্রতিটি দেশের জন্য এক যুদ্ধকালীন অবস্থা তৈরি করিয়াছে। অভূতপূর্ব এই সংকটের গভীরতা ও তীব্রতায় তৃতীয় বিশ্বের ছোট অর্থনীতির দেশগুলিকে সম্ভবত স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাকে নিজের হাতে বাঁচাইতে হইবে। করোনার অভিঘাতে বিশ্বের প্রায় ২৭০ কোটি শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা বিপন্ন হইয়াছে। স্পষ্ট করিয়া বলিলে, বিশ্বের মোট শ্রমজীবী মানুষের প্রায় ৮১ শতাংশই চরম অবস্থার মধ্য দিয়া দিনাতিপাত করিতেছে। বাংলাদেশের অবস্থাও তথৈবচ। এই অবস্থায় একটি দেশ-সমাজ পরিচালনার জন্য ম্যানেজমেন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ম্যানেজমেন্ট দুই ধরনের। ইহার একটি স্বাভাবিক সময়ের, অন্যটি অস্বাভাবিক সময়ের। ২০২০ সালে করোনার জন্য বৈশ্বিক অর্থনীতি ৪.৩ শতাংশ সংকুচিত হইয়াছে। তুলনা করিয়া বলা যায়, ১৯২৯ এবং ২০০৯ সালের মহামন্দার চাইতেও গত বত্সর করোনায় বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকোচন হইয়াছে অনেক অধিক। গত বত্সর বিশ্বের সবচাইতে বৃহত্ অর্থনীতির দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি সংকুচিত হইয়াছে প্রায় ৪ শতাংশ। জাপানের অর্থনীতি সংকুচিত হইয়াছে ৫.৪ শতাংশ। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলিতে সংকোচন হইয়াছে ৭.৪ শতাংশ। অর্থাত্ বিশ্ব অর্থনীতির নেতৃত্বদানকারী দেশসমূহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এতটাই মাইনাসের দিকে গিয়াছে যে, এই ধাক্কা কাটাইয়া উঠিতে দশক পার হইয়া যাইতে পারে। গত দেড় বত্সর ধরিয়া করোনার একের পর এক ঢেউ তীব্র হইয়া প্রবাহিত হইতেছে—সুতরাং সার্বিক পরিস্থিতি কত দূর পর্যন্ত কতখানি খারাপ হইতে পারে—তাহা এখনো আমাদের চিন্তার বাহিরে। এই অবস্থায় কোনো দেশ যদি স্বাভাবিক সময়ের মতো গতানুগতিক ম্যানেজমেন্ট দ্বারা পরিচালিত হয়, তাহা হইলে তাহা এই বিপর্যয়কে আরো প্রলম্বিত করিবে। ইতিমধ্যে দেশের বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় টিকিতে না পারিয়া ব্যবসায় সংকুচিত করিয়াছে। শ্রমিক ছাঁটাই করিতে বাধ্য হইতেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধই হইয়া গিয়াছে। কোভিড সংকটে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে উত্পাদিত পণ্যের চাহিদা কমিয়া যাইবার কারণে বিগত সোয়া বত্সরে শত শত কলকারখানা বন্ধ হইবার উপক্রম। স্বাভাবিকভাবেই কমিয়া গিয়াছে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও। নূতন নূতন কারখানা স্থাপিত না হওয়ায় শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির পরিমাণও কমিয়া গিয়াছে। এলসি খোলার হারও কমিয়া গিয়াছে বিধায় সরকারের রাজস্ব আদায়েও চাপ পড়িতেছে। এই অবস্থায় যাহারা টিকিয়া রহিয়াছেন, তাহারা কতদিন বেতন-ভাতা ঠিকমতো চালাইয়া যাইতে পারিবেন—তাহাই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন। এই অবস্থায় আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনায় যদি আলাদা ম্যানেজমেন্ট তৈরি না করে, তবে সামনে দীর্ঘ অন্ধকার রাত দেখা দিবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থাকিলে অদূর ভবিষ্যতে টানেলের শেষ প্রান্তেও আলোর দেখা মিলিবে না।
অর্থনীতিবিদেরা ইতিমধ্যেই বলিয়াছেন, করোনা শুধু আর্থিক বিপর্যয় ডাকিয়া আনিতেছে না, মানসিকভাবেও বিপর্যয় করিয়া তুলিতেছে বেশির ভাগ মানুষকে। করোনায় বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবনমান আরো নিচে নামিয়া যাইতেছে। সচ্ছল অনেক পরিবারই দারিদ্র্যসীমার নিচে চলিয়া যাইতেছে। সুতরাং সময় থাকিতে নূতন পরিস্থিতি সামলাইতে আলাদা ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি।
