আমাদের এই দুর্গতি-নাশন কবে হবে

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২১, ২১:২০

আজ ২৬ জুলাই সোমবার এই লেখাটা লিখছি। লেখার আগে জেনে নিয়েছি, করোনায় বাংলাদেশে আজ মৃতের সংখ্যা কত। সরকারি হিসাবে ২৪৭ জন। বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা আরো বেশি। আক্রান্তের সংখ্যাও ভয়াবহ। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডেঙ্গু জ্বরের আক্রমণ। বাংলার মানুষের আজ আর যেন বাঁচার কোনো উপায় নেই। ধনীর নেই, গরিবেরও নেই। এমন ‘সাম্যবাদী’ রোগ আর কখনো কোথাও আসেনি। ধনী-গরিব সকলেই এক কাতারে মরছে। সারা বিশ্বের মানুষ, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থেকে বাংলাদেশের সামান্য কেরানির মুখে একই মাস্ক। এমন সাম্য স্বয়ং মার্কস সাহেবও সম্ভবত কল্পনা করতে পারেননি।

সহূদয় পাঠকদের মনে হতে পারে, আমি বুঝি পরিহাস করে ওপরের কথাগুলো বলছি। মোটেই তা নয়। আমি অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে কথাগুলো বলছি। এই যে বাংলাদেশে মৃত্যুর নিত্য থাবা, তা থেকে বাংলাদেশকে একেবারে বাঁচানো যেত না এ কথা সত্য, কিন্তু বাংলাদেশে জনসমষ্টির বড় অংশই যদি এতটা অশিক্ষিত ও ধর্মান্ধ হয়, তাহলে তার মাশুল তো গুনতেই হবে। সেই মাশুলই এখন আমরা গুনছি। সরকারকে সব দোষ দিয়ে লাভ নেই।

ভারতকেও ধর্মান্ধতা ও অশিক্ষার মাশুল গুনতে হয়েছে দারুণভাবে। এই দারুণ কোভিডের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী মোদি কীভাবে দেশের পাঁচটি রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন এবং কুম্ভ মেলা ও গঙ্গাস্নানের আয়োজনের অনুমতি দিয়েছিলেন তা আমার বোধগম্য নয়। মোদির এই ‘রাজনৈতিক ধর্মপ্রাণতার’ মূল্য দিতে হয়েছে লক্ষ লক্ষ ভারতবাসীকে। নির্বাচনের জনতা ও ধর্মমেলার জনতার ভিড় কোভিড-১৯-এর প্রাণে দারুণ উত্সাহ জুগিয়েছে।

আমরা যে সৌদি আরবকে গোঁড়া ধর্মীয় দেশ বলি, সেই দেশেও ক্রাউন প্রিন্স সালমান ধর্মীয় অনুশাসনের ওপর বিজ্ঞানকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছেন। করোনা শুরু হওয়ার বছরে তিনি সারা মুসলিম বিশ্বকে বিস্মিত  করে ঈদুল আজহা পালন মুলতুবি করে দেন। মসজিদে নববিতে পর্যন্ত সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে নামাজ পড়ার নির্দেশ দেন। কোলাকুলি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দেন। সৌদি আরবে করোনা পরিস্থিতি আমাদের চাইতে অনেক উন্নত। কারণ ভোটের জন্য ইসলামের নামে সে দেশে লকডাউন প্রয়োজনের আগেই তুলে নেওয়া হয়নি বা শিথিল করা হয়নি। পৃথিবীর আরেকটি দেশে কোভিড নাকি ঢুকতেই পারেনি বলে দাবি করা হচ্ছে। সে দেশটি হচ্ছে উত্তর কোরিয়া। অবশ্য সে দেশে তো চলছে ডিকটেটোরিয়াল শাসন। এই শাসনের সম্ভবত একটাই সুবিধা, ভোটের জন্য, ধর্মের নামে মানুষের প্রাণকে বলি দিতে হয় না।

বাংলাদেশের সরকারকে দোষ দিই না। তারা পৃথিবীর যেখান থেকে পারছেন দুহাতে করোনার ভ্যাকসিন আনছেন। কিন্তু অবাধ্য জনগণকে টীকা দিয়ে কী হবে? তারা অত্যাবশ্যকীয় কোনো স্বাস্থ্যবিধিই মানবেন না। এবারের ঈদুল আজহায় ঘরমুখী মানুষের যে প্লাবন সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে সরকার লকডাউন রাখলেও কেউ তা মানত না। সরকার অবাধ্য জনগণকে তুষ্ট রাখতে সাময়িকভাবে লকডাউন তুলেছে। তার সুযোগ নিয়ে মানুষ দিশেহারা হয়ে দল বেঁধে ঢাকার বাইরে গেছে এবং ঢাকায় ফিরেছে। লঞ্চে, নৌকায়, ট্রেনে বাসে তাদের উপচে পড়া ভিড় দেখে মনে হয়েছে, দেশে করোনা নেই। করোনা কোনো দিন ছিল না। এই অজ্ঞতা ও মূঢ়তা নিয়ে যদি কোনো দেশ চলে, তাহলে সরকার আইন করে কী করবে।

আমাদের সুশীল সমাজের মুখে অহরহ আইনের শাসনের কথা শোনা যায়। আইনের শাসন সে দেশেই চলে যে দেশে আইন মানার শিক্ষা জনগণের মধ্যে আছে। জনগণকে এই শিক্ষায় শিক্ষিত করতে কোনো রাজনৈতিক দলই চায় না। তারা চায় জনগণের অশিক্ষাকে পুঁজি করে রাজনীতি করতে। ধর্মান্ধতা ও কূপমণ্ডূকতা তাই জনমনে শিকড় গেড়ে বসে। রাজনীতিকরা বা আমলারাও কি সকলে আইন মেনে চলেন? আমি ঢাকার রাস্তায় দেখেছি মন্ত্রী ও আমলা শ্রেণির ব্যক্তিরা ট্রাফিক আইন মানেন না।

লন্ডনে আমাকে এক স্কটিশ পণ্ডিত বলেছেন, ‘উন্নত দেশের জন্য গণতন্ত্র এবং অনুন্নত দেশের জন্য সমাজতন্ত্র একটি মাস্ট—অবশ্যপ্রযোজ্য। সমাজতন্ত্রের রেজিমেন্টেশন নাগরিক সমাজকে বাধ্যতামূলকভাবে আইন মানতে শেখায়। সামাজিক দায়িত্ববোধ শেখায়।’ এই পণ্ডিতের কথা আমি সত্য বলে মানি। ঢাকা শহর যদি কোনো সমাজতান্ত্রিক দেশের শহর হতো, তাহলে সেই শহরে নব্য ধনীরা বাড়ি তৈরির সময় যথেচ্ছভাবে ইট, চুন, পলিথিনের ব্যাগ সরকারি রাস্তায়, অন্য প্রতিবেশীর বাড়ির সামনে ফেলে রাখতে পারত না। এই বাড়ি নির্মাতাদের অবহেলায় ডেঙ্গুর মশা বাড়ে এবং এই ডেঙ্গুতে শয়ে শয়ে লোক মারা যায়। এ কথাটা জানা থাকা সত্ত্বেও ঢাকা শহরের অধিকাংশ নতুন বাড়িনির্মাতা কোনো দায়িত্ববোধের পরিচয় দিচ্ছেন না। ফলে ঢাকায় করোনা তো আছেই তার ওপর আছে ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াবহ বিস্তার।

ঢাকা যদি উত্তর কোরিয়ার শহর হতো, তাহলে এই নতুন বাড়িনির্মাতাদের অনেকের পিঠে কিম সাহেবের বেতের আঘাত পড়ত। শেখ হাসিনার পুলিশের লাঠি কেবল রাজনৈতিক বিরোধীদের জন্য। এই লাঠি যদি তাদের দলের নব্য ধনীসহ একশ্রেণির বাড়িওয়ালার পিঠে পড়ত, তাহলে দেশে করোনা অথবা ডেঙ্গু কোনোটাই এমন ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছতে পারত না। এবার ঈদের ছুটিতে লকডাউন শিথিল করার সুযোগে রাস্তায় ভিড় শুধু সাধারণ মানুষ বাড়ায়নি, গাড়িওয়ালা ব্যক্তিরাও বাড়িয়েছেন। ঢাকায় আমার এক পুলিশ বন্ধু আছেন। তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘আপনাদের ওপর তো নির্দেশ আছে বিনা প্রয়োজনে রাস্তায় কাউকে বের হতে না দেওয়ার।’ পুলিশ অফিসার বললেন, ‘কাকে ধরব স্যার, যাকে ধরি, তিনিই দেখি হয় মন্ত্রী নয় এমপি।’

বঙ্গবন্ধু এজন্যই বাকশাল করেছিলেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো বুঝতে পেরে সমাজতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা দ্বারা দেশের নাগরিক সমাজকে নাগরিক দায়িত্ববোধ ও ...সামাজিক দায়িত্ববোধ পালন দেখাতে এবং তা পালনে বাধ্য করতে চেয়েছিলেন। তিনি তা পারলেন না। কারণ, আমাদের পালিত সুশীল সমাজ বর্ষার ভেকের মতো আওয়াজ তুললেন, দেশে গণতন্ত্র নেই, দেশে এক ব্যক্তির শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ইত্যাদি। শেষ পর্যন্ত তাদের সাহায্যে দেশদ্রোহীরা শেখ মুজিবকে হত্যা করল। তা শেখ মুজিবকে হত্যা করে তারা কী পেলেন? জিয়াউর রহমানের একনায়কত্ব, এরশাদের দুর্নীতি এবং এক ক-অক্ষর না-জানা নারীর শাসন।

এখন এসব না হয় অতীত। বর্তমানে অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না কেন? তার কারণ, বর্তমানে জাতীয় সংসদে যারা জনপ্রতিনিধি হয়ে বসে আছেন, তারা প্রকৃত জনপ্রতিনিধি নন। এদের অধিকাংশই ব্যবসায়ী, নব্য ধনী। টাকার জোরে নৌকা মার্কা প্রতীক কিনে, বঙ্গবন্ধুর নাম ভাঙিয়ে নানা কৌশলে এমপি হয়েছেন। এদের অধিকাংশই নিজেদের ব্যবসায়-বাণিজ্য ও চুরি বাটপাড়িতে ব্যস্ত। সংসদে এদের উপস্থিতি শুধু হাত তোলা ও হ্যাঁ বলার জন্য। জনগণের দুঃখ-দুর্গতির দিকে এদের কোনো লক্ষ নেই।

এদের মধ্য থেকে যাদের মন্ত্রী করা হয়েছে, তাদের মধ্যে দু-চার জন ছাড়া কারো মন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা নেই। যোগ্য মন্ত্রী না থাকলে তাদের সচিবদের অর্থাত্ আমলাদের প্রতাপ বাড়ে। আমলারা যোগ্য হলে এই প্রতাপ বাড়লে তেমন ক্ষতি ছিল না। কিন্তু আমাদের আমলাতন্ত্রও অত্যন্ত অযোগ্য ও দুর্নীতিবাজ। কোনো সন্দেহ নেই, ব্রিটিশ আমলের আইসিএস অফিসারেরা ছিলেন দুর্দান্ত শিক্ষিত ও যোগ্য প্রশাসক। তারপর পাকিস্তান আমলের সিএসপি অফিসারদের যোগ্যতার মান একটু কমলেও তারাও কম যোগ্যতার পরিচয় দেননি। কিন্তু বাংলাদেশের বিসিএস সার্ভিসের শিক্ষার মান যেমন নিম্ন, তেমনি বিসিএস অফিসারদের যোগ্যতাও খুব কম। প্রশাসনে মন্ত্রী যদি দায়িত্ব পালনে অযোগ্য হন এবং তার সচিবও হন তেমনি অযোগ্য, তাহলে সেই মন্ত্রণালয়ের অবস্থা কী দাঁড়ায়? আমি এই ধরনের একজন মন্ত্রী, তার সচিব ও মন্ত্রণালয়ের কথা নজির হিসেবে উল্লেখ করতে পারি। করব না এজন্য যে তাতে কোনো লাভ নেই। বরং ঐ মন্ত্রী ও সচিবের পদোন্নতি হতে পারে।

তাহলে কি এই করোনা পরিস্থিতি, ডেঙ্গু পরিস্থিতি থেকে আমাদের মুক্তি নেই? জবাব—আছে, করোনা থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য শেখ হাসিনা আন্তরিকতার সঙ্গে লড়ছেন। তবে অযোগ্য প্রশাসন এবং দুর্নীতিপরায়ণ স্বাস্থ্য মন্ত্রক নিয়ে লড়ছেন এবং ব্যাপকভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে জনসাধারণ ও নব্য ধনীদের ইচ্ছাকৃত অথবা অনিচ্ছাকৃত অসহযোগিতার জন্য আমাদের দুর্গতিটা ভারতের মতো একটু বেশি।

এই দুর্গতি-নাশন হবে প্রাকৃতিক নিয়মে। প্রাকৃতিক নিয়মে যেমন কোভিড এসেছে, প্রাকৃতিক নিয়মেই তেমনি কোভিড যাবে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, কোভিডের সংক্রামক শক্তি ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তা আর থাকবে না। বিজ্ঞানীদের কথা যদি সঠিক হয়, তাহলে শুভ দিন আসছে। এই আশা অন্তত আমাদের মর্মাহত মানসিকতাকে চাঙ্গা করে তুলুক।

n লন্ডন, ২৬ জুলাই, সোমবার, ২০২১