মাছ ধরা নৌযানে জিপিএস প্রসঙ্গ

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২১, ২১:২১

ষাট দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে অধীর অপেক্ষমাণ উপকূলীয় হাজার হাজার মত্স্যজীবী আবারও ছুটেছেন বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে। জীবনের ঝুঁকি আছে জেনেও তারা অথই সমুদ্রের হাতছানিতে ছোট ছোট নৌযানে করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছেন মহিসোপান পর্যন্ত। এ এক চ্যালেঞ্জিং পেশা, নেশাও বটে। সাগরে রূপালি ইলিশসহ নানা প্রজাতির মাছ। ঝাঁকে ঝাঁকে জালে ধরা পড়লে জেলেরা সবকিছু ভুলে যায়। অপার আনন্দে মেতে ওঠে। তারা গহীন সমুদ্রের বুকে আছেন, ঠাঁই নেই—তা তাদের কাছে ঠাওরই হয় না। রাশি রাশি মাছ, মানে রাশি রাশি টাকা; কিন্তু বিস্তীর্ণ জলরাশিতে প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে ট্রলার ডুবির ঘটনা যেমন ঘটে, পাশাপাশি এসব মত্স্যজীবীর আরেক ভয় ডাকাতের। মত্স্যজীবীর ছদ্মবেশে প্রতি বছর মাছ লুট, অর্থ ডাকাতি, খাবার কেড়ে নেওয়ার সঙ্গে অনেক জেলের জীবনহানির খবরও পাওয়া যায়।

নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা ছাড়াও সাগরে সাধারণভাবে মত্স্য সম্পদ আহরণে কতসংখ্যক মাছ ধরার ট্রলার বা নৌযান কোন অবস্থানে রয়েছে তা মনিটরিং করার মতো আধুনিক ব্যবস্থাপনা এখনো প্রয়োগ হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে অনেকটা সহজ সমাধান দিতে পারে জিপিএস (গ্লোবাল পজেসনিং সিস্টেম)। বিশেষ করে কোস্ট গার্ড বা সাগরে নৌযান যাওয়ার অনুমতি প্রদান কর্তৃপক্ষ যদি এ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে তা হলে এক দিকে মত্স্যজীবীদের নিরাপত্তা ও সাগরে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নৌযানকে মনিটরিং করা সম্ভব। যদিও গুগোল অ্যাপস ব্যবহার করে অনেকটা কাজে লাগানো হচ্ছে। তবে আলোচ্য বিষয়টির অধিক্ষেত্র ও ব্যবহারের উপযোগিতা ভিন্নমাত্রিক হওয়ায় তা আমাদের দেশের এবং বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকার জন্য প্রযোজ্য। প্রথমত সাগরে মাছ ধরার উদ্দেশ্যে যেসব ট্রলার বা নৌযান গমন করবে সেসব নৌযানে পৃথক আইডি ব্যবহার করে জিপিএস লাগিয়ে দেওয়া হবে। এর ফলে উপকূলে বসেই মনিটরিং করা যাবে কোন নৌযান কোথায় অবস্থান করছে, কত দূরে অবস্থান করছে বা কী অবস্থায় আছে। এর বাইরে কোনো নৌযান দেখা গেলে স্বাভাবিকভাবে তা অবৈধভাবে সাগরে বিচরণ করছে বলে ধরে নেওয়া হবে। এই জিপিএস হস্তান্তরযোগ্য হবে না এবং তা জোরপূর্বক কেড়ে নিলেও তা মনিটরিংয়ের মাধ্যমে জানা যাবে। এমন একটি অ্যাপস উদ্ভাবন করা যেতে পারে যাতে করে কোনো নৌযান দুর্ঘটনা বা ডাকাতির কবলে পড়লেই পুলিশের ৯৯৯ নম্বরে চাপ দিলেই যেমন তাত্ক্ষণিক অবস্থান নিরূপণ করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, ঠিক কোস্ট গার্ড সে ধরনের একটি নম্বর দিয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে। এ ছাড়া এই জিপিএস ব্যবহারের আরেকটি সুবিধা হলো যখন কোনো মাছ ধরা ট্রলার পর্যাপ্ত মাছ পেয়ে উপকূলে ল্যান্ডিং স্টেশনে আসতে চায় তখন এমন একাধিক নৌযান সিগন্যাল দিলে এক বহরে করে আসতে পারে এবং সেক্ষেত্রে কোস্ট গার্ড নিরাপত্তা বিধান করা অথবা গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সঠিক ডিরেকশন দিতে পারে। এই জিপিএস ব্যবহারের ক্ষেত্রে যেহেতু পৃথক আইডি দেওয়া হবে তাই সহজে স্ব স্ব নৌযান ও সেই সঙ্গে থাকা মত্স্যজীবীদের পরিচয় ও সংখ্যাও নিরূপণ সম্ভব হবে।

প্রতি বছর সুন্দরবন অভ্যন্তরে বা সীমনায় মাছ ধরা ছাড়াও অনান্য সম্পদ আহরণের উদ্দেশ্যে নৌযান প্রবেশে পারমিট দেওয়া হয়। এ ছাড়াও পর্যটনে ব্যবহূত হয় অনেক নৌযান। এসব নৌযানের ক্ষেত্রেও জিপিএস ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা যায়। সুন্দরবনের মধ্যেকার নদীতে মাছ ধরতে যেয়ে কেউ বনের ভেতর প্রবেশ করলে সেটাও মনিটরিংয়ের মাধ্যমে জানা সম্ভব। তবে অনেকে এ কথা বলছেন পৃথীবির অন্যতম প্রাকৃতিক মাছের অভয়ারণ্য ও প্রজনন ক্ষেত্র সুন্দরবনে মাছ ধরতে অনুমতি না দেওয়াই উত্তম। কারণ, প্রতি বছর সুন্দরবনে মাছ ধরতে অনুমতি নিয়ে বনের ক্ষতিসাধনের পাশাপাশি প্রজনন ক্ষেত্রে উপদ্রব করা হয়। সুন্দরবনে মাছ ধরতে দিয়ে যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় হয়, বরং তা যদি নির্বিঘ্ন থাকে তা হলে প্রজনন ঘটার পর শত শত প্রজাতির মাছের রেণু-পোনা-লার্ভা উপকূলের অভ্যন্তরীণ নদনদীতে ছড়িয়ে পড়ে ঢের পরিমাণ মাছ উত্পাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।

বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তির উত্কর্ষে অনেক এগিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশও অনেক অগ্রগতি লাভ করেছে। এখন ঘরে বসেই নতুন নতুন ভাবনা ও উদ্ভাবন নিয়ে প্রতিনিয়ত কাজ হচ্ছে। উত্কর্ষের শেষ বলে কিছু নেই। বাংলাদেশ অসম্ভব সম্ভাবনাময় দেশ। আমাদের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বা তরুণ মেধাবীরা সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া হাজার হাজার নৌযান ও মানুষের সুবিধার্থে, একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও মনিটরিংয়ের প্রয়োজনে জিপিএস ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার যৌক্তিকতা তুলে ধরার পাশাপাশি এ সেক্টরের জন্য একটি নতুন অ্যাপস উদ্ভাবন করতে পারেন। এখানে বেশকিছু সমস্যা সামনে আসতে পারে। তবে আমার বিশ্বাস উদ্ভূত সমস্যা নিরসন করে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। এটা এখন মোটেই অসম্ভব নয়। আমাদের ব্লু ইকোনমি সম্ভাবনার ক্ষেত্রেও বিষয়টি নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখতে পারে। ভেবে দেখা দরকার।

n লেখক :পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত), জনসংযোগ ও প্রকাশনা বিভাগ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।