স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে এ পর্যন্ত শিল্পকারখানার পরিধি অনেক বেড়েছে, কর্মসংস্থানের সীমানাও বেড়েছে, কিন্তু এ খাতে কর্মপরিবেশ কতটা উন্নত হয়েছে? বিগত এক দশকের চিত্র যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তাহলেই এ প্রশ্নের উত্তর অস্পষ্ট থাকে না। ৮ জুলাই বিকেলে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাশেম ফুডস কারখানায় যে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত, ৯ জুলাই বিকেলে বীভত্স ক্ষত আর ধ্বংসলীলার মধ্য দিয়ে এর যবনিকাপাত হয়। ঐ ঘটনার পর থেকেই সংবাদমাধ্যমে যেসব চিত্র উঠে আসছে, তাতে আমাদের শিল্প খাতে অনিরাপত্তা, বিরাজমান বিবর্ণতা, একই সঙ্গে শ্রমিকদের নিপীড়িত-নিষ্পেষিত জীবনের ভয়ংকর চিত্র পুনর্বার ফুটে উঠেছে। ঐ কারখানায় যখন আগুনের সূত্রপাত হয়, তখন হাশেম ফুডস খাদ্যপণ্য উত্পাদন কেন্দ্রের প্রধান ফটক বন্ধ ছিল অগ্নিকুণ্ডে অনেকগুলো জীবন নিপতিত রেখে! তাছাড়া ঐ ভবনের চতুর্থ তলায় জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ হয়ে অনেকের পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়ার আরো কিছু কারণ ছিল সুস্পষ্ট। আগুনের কুণ্ডলীবেষ্টিত ভবনটির চতুর্থ তলায় অনেকগুলো প্রাণের আর্তচিত্কারেও তাদের প্রাণ বাঁচানোর পথ নিষ্কণ্টক হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে পরিণতি যতটা মর্মান্তিক হওয়ার কথা, তাও যেন ছাপিয়ে গেল। ঘটনাটি শুধু দুর্ঘটনা বলে পরিত্রাণের পথ খোঁজার রাস্তা রুদ্ধ হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় ক্ষতের ওপর ক্ষত।
হাশেম ফুডস কারখানায় পণ্য উত্পাদনে নিয়োজিতদের বেশির ভাগই ছিল শিশু শ্রমিক। ধারণা করা হচ্ছে, অগ্নিদগ্ধদের কাতারেও শিশুদের সংখ্যাই বেশি। দেশে শিশুশ্রম আইনত নিষিদ্ধ হলেও ঐ কারখানা কর্তৃপক্ষ সস্তা দামে শিশুশ্রম কিনে নিজেদের মুনাফার পাল্লা ভারী করে চলছিল। পাশাপাশি কর্মরতদের বেতন-ভাতা প্রদানেও ছিল কর্তৃপক্ষের গড়িমসি। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, ঘটনার এক সপ্তাহ আগেও শ্রমিকেরা তাদের ওভারটাইমের টাকা পাওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ করেছিলেন। অগ্নি-আক্রান্ত কারখানাটির শ্রমিকদের জুন মাসের বেতনও বকেয়া রয়েছে এবং এখন শুধু ঐ বকেয়া বেতন পাওয়ার অনিশ্চয়তাই নয়, আরো নানা রকম অনিশ্চয়তাও বেঁচে থাকা শ্রমিকদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পুরু করেছে। একটা কারখানা কিংবা পণ্যদ্রব্য উত্পাদনকেন্দ্র গড়ে তুলতে কিংবা খুলতে সরকারের বেঁধে দেওয়া কিছু নিয়মকানুন, শর্ত কিংবা বিধিবিধান মানতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় সরকারের বিভিন্ন বিভাগ জড়িত। হাশেম ফুডস কারখানায় বিরাজমান যেসব ত্রুটির চিত্র এখন সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে, এসব কি সরকারের ঐ মহলগুলোর দায়িত্বশীলদের দৃষ্টিসীমার বাইরে ছিল? এ প্রশ্নের উত্তরও অস্পষ্ট নয়।
যদি তা-ই না হতো, তাহলে এত বড় দুঃসহ মর্মান্তিকতার মুখোমুখি ফের আমাদের হতে হতো না। দায়িত্বহীনতা কিংবা দায়িত্বশীলদের স্বেচ্ছাচারিতা-লাভ-লোভের আগুনে এ রকম পৈশাচিক ঘটনা দূর অতীত বাদ দিলেও বিগত এক দশকে কম ঘটেনি। কিন্তু বিস্ময় আর বেদনার হলো, বহু ক্ষেত্রেই এর দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার বিরল। প্রতিটি ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। কোনো কোনো তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আলোয় এলেও এসব প্রতিবেদনে উপস্থাপিত সুপারিশ যেমন বাস্তবায়িত হয়নি, তেমনি সম্পন্ন হয়নি বিচারও। আবার কোনো কোনো তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আলোর মুখই দেখেনি! একেকটি বীভত্স ঘটনা ঘটে, তারপর সংবাদমাধ্যমে এবং সামাজিক পরিসরে কিছুদিন হইচই হয় আবার একপর্যায়ে সব থেমে যায়—এই তো আমরা দেখছি।
এরকম হাশেম ফুডস কারখানার সংখ্যা বাংলাদেশে কত? এক কথায় অনেক। এগুলোকে কারখানা না বলে ‘মৃত্যুকূপ’ বলাই শ্রেয়। এই ‘মৃত্যুকূপ’গুলো জিইয়ে আছে রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্বশীলদের নাকের ডগায়! এমন প্রেক্ষাপটে বলা যায়, এই যে মর্মান্তিকতার খতিয়ান ক্রমদীর্ঘ হচ্ছে, এর দায় শুধু এই মৃত্যুকূপগুলোর কর্তৃপক্ষেরই নয়, একই সঙ্গে সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সব বিভাগেরও। নিমতলী থেকে চকবাজার, রানা প্লাজা থেকে হাশেম ফুডস কারখানা—সর্বত্রই মানুষের বসবাস ভয়াবহ বিস্ফোরকের ওপর। মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়ে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যত প্রাণ ঝরে গেছে, তার প্রতিকারে কতটা দৃষ্টান্তযোগ্য দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে আছে? আইনত গুদাম কোনো কারখানারই উত্পাদনক্ষেত্রে হতে পারে না। একের পর এক এমন বীভত্স ঘটনা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও মহলে যে বার্তা দিচ্ছে, তাতে আমাদের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। আমরা জানি, বিলম্বিত বিচার যেমন ন্যায়বিচার পরাহত করে, তেমনি বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি সমাজে শুধু ক্ষতই গভীর করে এবং এর উদাহরণ আমাদের সামনে অনেক আছে। রূপগঞ্জের ঘটনার পর সরকারের দায়িত্বশীলদের তরফে যথারীতি অনেক অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি শোনা গেছে। আমরা আশ্বাসে বিশ্বাস হারাতে না চাইলেও বাস্তবতা আমাদের সেদিকেই ঠেলে দেয়। জনকল্যাণে, জননিরাপত্তায় আমাদের আইনের কোনো অভাব নেই। কিন্তু সুস্পষ্ট ঘাটতি রয়েছে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে। উপরন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনের অপপ্রয়োগ উদ্বিগ্ন না করে পারে না।
সংবিধান অনুসারে সব নাগরিকের অধিকারসহ জীবন-মৃত্যু সবকিছু দেখভালের দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই। এই দায় রাষ্ট্রকেই পালন করতে হয় এবং হবেও। ‘মৃত্যুকূপ’-এর আদলে আমাদের অনেক জীবিকাক্ষেত্রই রয়েছে। আমরা অবশ্যই শিল্পায়ন চাই, নগরায়ণ চাই, কিন্তু এর কোনো ক্ষেত্রই যেন ‘মৃত্যুকূপে’ পরিণত না হয়, তা রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে। অগ্নিদগ্ধ হয়ে মরে যাওয়া, কাজ করে মজুরি না পাওয়া, মানুষের জীবন নিয়ে জুয়া—এসব কিছুই রাষ্ট্র, রাজনীতি কিংবা অর্থনীতির জন্য মোটেও শুভবার্তা নয়। জীবনের যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, জীবিকার সব পথ যদি মসৃণ করা না যায়, মানুষের মৌলিক অধিকারের যদি পূর্ণাঙ্গতা না দেওয়া যায় কিংবা ভেঙে ফেলা না যায় বৈষম্যের দেয়াল, তাহলে যত উন্নয়নই বলি কিংবা জাতীয় প্রবৃদ্ধির কথাই বলি, কোনো কিছুই অর্থবহ তো হবেই না, উপরন্তু সৃষ্টি হবে ক্ষতের ওপর ক্ষত। আমরা এমনটি আর দেখতে চাই না। হাশেম ফুডস কারখানায় সৃষ্ট মর্মান্তিক ঘটনার দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার থেকেই হোক এর সূচনা।
n লেখক : নিবন্ধকার
