চট্টগ্রাম বন্দরে শিপিং এজেন্ট ও বার্থ অপারেটরদের মধ্যে জাহাজে পণ্য ওঠানো-নামানোর ক্ষেত্রে শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা পাঁচ বছরেও নিরসন হয়নি। এ ব্যাপারে গত বছর গঠিত ‘কস্টিং কমিটি’ আগামী ৩১ জুলাইয়ের নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রতিবেদন জমা দিতে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরের একটি ঊর্ধ্বতন সূত্র ইত্তেফাককে এ তথ্য জানায়।
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএএ) আপত্তি উত্থাপন করলে এ জটিলতার সৃষ্টি হয়। তবে শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন ও চট্টগ্রাম বন্দর বার্থ টার্মিনাল ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ইত্তেফাককে বলা হয়, কস্টিং কমিটির প্রতিবেদন নির্ধারিত সময়ে পেশ করার পর তারা বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যস্থতায় বসবেন বলে আশা করছেন। তারা এ-ও আশা করছেন, দীর্ঘদিন ধরে সমাধানের অপেক্ষায় থাকা এই জটিলতার একটি যৌক্তিক সমাধান হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. জাফর আলম ইত্তেফাককে বলেন, কস্টিং কমিটি চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানের নির্দেশে ৩১ জুলাই সময়সীমার মধ্যেই প্রতিবেদনটি জমা দেওয়ার কাজ করে যাচ্ছে পুরোদমে। আশা করা হচ্ছে, প্রতিবেদনটি এই সময়ের মধ্যে উপস্থাপন করা যাবে। তিনি বলেন, শিপিং এজেন্ট ও বার্থ অপারেটর—এ দুটি স্টেকহোল্ডারই তাদের ব্যাবসায়িক প্রয়োজনে চট্টগ্রাম বন্দরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরে আসা জাহাজে অনবোর্ড অপারেশনের কস্টিংয়ের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের প্রদেয় খরচ নিয়ে এ দুই সংস্থার মধ্যে যে জটিলতা, সেটি বন্দরের বিষয় নয়। তার পরও চট্টগ্রাম বন্দরে এ বিষয়টিকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ইস্যু তৈরি না হয় এবং বন্দরের কাজে যাতে ব্যাঘাত সৃষ্টি না হয়, তাই দুই পক্ষকে তাদের যৌক্তিক অবস্থানে রেখে তাদের মধ্যকার এই জটিলতার অবসানের চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা আশা করছি তাদের এই জটিলতার সূত্র ধরে বন্দরের কাজের যেন কোনো ক্ষতি না হয়।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা বার্থ অপারেটরদর কাছে বর্ধিত হারে মোট প্রদেয়ের কথা বলছি না, আমরা জানতে চাইছি অনবোর্ড অপারেশনের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের কত দেওয়া হচ্ছে সেই কস্টিংয়ের বিবরণ।’ তিনি বলেন, ‘এখানে গৃহীত অনেক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নানা ধরনের অযৌক্তিক বিষয় এসেছে। ফলে আমরা আপত্তি করেছি। আমরা মনে করছি, এখানে অনবোর্ড অপারেশনের ক্ষেত্রে যে কস্টিং দেখানো হচ্ছে, সেখানে যদি অপারেটরদের ক্ষেত্রে মনোপলি না থাকত, কাজ নেওয়ার ক্ষেত্রে যদি প্রতিযোগিতা থাকত, তাহলে কিছুতেই কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের কস্টিং ১ দশমিক ৬ শতাংশের এবং খোলা পণ্য বা ব্রেকবাল্ক পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের কস্টিং আড়াই শতাংশের বেশি আসে না আমাদের হিসাবে। এ ক্ষেত্রে ব্রেকবাল্ক পণ্যের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বর্ধিত হার আমাদের কাছে অনেক বেশি মনে হচ্ছে। শুনেছি, কস্টিং কমিটির রিপোর্ট প্রদানের পর বন্দর কর্তৃপক্ষ আমাদের ডাকবে। আমরা আমাদের আপত্তি ও বক্তব্য উপস্থাপন করব।’
চট্টগ্রাম বন্দর বার্থ টার্মিনাল ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, ‘২০১৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রতিটি স্টেকহোল্ডারের সম্মতি ও স্বাক্ষরে গৃহীত চুক্তি অনুসারে আমরা চার্জ আদায় করছিলাম। হঠাত্ করে শিপিং এজেন্টরা চুক্তি অনুসারে চার্জ দেওয়া বন্ধ করে দেয়। বিষয়টি আমরা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। ওরা এ ব্যাপারে আপত্তি দিলে আমাদেরও অনেক আপত্তি আছে। শিপিং এজেন্টরা গত দশ বছর ধরে অনবোর্ড চার্জ বাড়ায়নি। অথচ তারা তাদের প্রিন্সিপালদের নির্দেশে জাহাজভাড়া দ্বিগুণ করেছে। কনটেইনারের ভাড়াও নিচ্ছে দ্বিগুণ হারে। অন্যদিকে দিচ্ছে করোনার দোহাই। কিন্তু আমরা মনে করি নির্ধারিত হারে তাদের অনবোর্ড চার্জ দিতেই হবে। কস্টিং বাড়াতে হবে।’
শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের এক দপ্তরাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে অনবোর্ড অপারেশনের বিপরীতে শিপিং এজেন্টদের কাছ থেকে বার্থ টার্মিনাল অপরেটররা ব্রেকবাল্ক পণ্যের ক্ষেত্রে ৯ শতাংশ এবং কনটেইনারজাত পণ্যের ক্ষেত্রে ৪ শতাংশ হারে প্রতি বছর বর্ধিত দর আদায় করছিল। এ বিষয়ে শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন দ্বিমত প্রকাশ করে বিষয়টি রিভিউ করার আবেদন জানায়। এতে বন্দর কর্তৃপক্ষ দর পুনর্নির্ধারণের জন্য রিভিউর লক্ষ্যে একটি কস্টিং কমিটি গঠন করে। কমিটি রিপোর্ট প্রদান করতে দেরি করলে গত ২৮ জানুয়ারি বন্দর চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে স্টেকহোল্ডারদের এক যৌথ সভায় দুই মাসের জন্য ব্রেকবাল্ক পণ্যের ক্ষেত্রে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং কনটেইনারজাত পণ্যের ক্ষেত্রে ৪ শতাংশ বর্ধিত হারে দর প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়। এই সময়ের মধ্যেও এ বিষয়ে কস্টিং কমিটির পক্ষ থেকে প্রতিবেদন প্রদান করা না হলে বন্দর চেয়ারম্যান এ বছরের ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।
