ভর্তি-বাণিজ্য ও স্বার্থের দ্বন্দ্বে সুনাম হারাচ্ছে ভিকারুন নিসা!

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২১, ২৩:০২

রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ঐতিহ্য ও সুনাম এখন প্রতিষ্ঠানটির জন্যই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রতিষ্ঠানটির সব পক্ষই এখন ভর্তিসহ নানা রকম বাণিজ্য ও ব্যাবসায়িক লাভ-ক্ষতির হিসাব নিয়ে ব্যস্ত। ফলে মান-মর্যাদার শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়ানো প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার মান ও সুনাম ক্রমেই নিচের দিকে নামছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি ঘিরে সাম্প্রতিক কালের বেশ কয়েকটি ঘটনা ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে এর ২৭ হাজার শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকেরা।

বেসরকারি এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়েরও নজর রয়েছে। তাই কোটার বাইরেও বছরের যে কোনো সময় মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তার সন্তানদের ভর্তির নির্দেশনা আসে। আবার সুনামের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কোনো গভর্নিং বডিই দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। সেটা ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের দেওয়া কমিটি হোক আর নির্বাচিত কমিটিই হোক। ভর্তির পাশাপাশি শিক্ষাসংশ্লিষ্ট নানা বাণিজ্যে কোনো কোনো গভর্নিং বডির সদস্য অর্থ আয়ের পথ খুঁজে নেন স্কুলটিকে কেন্দ্র করে। আবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও গভর্নিং বডির বাইরে অভিভাবক ফোরাম নামে একটি সংগঠন রয়েছে। এই সংগঠনের সঙ্গেও নানা বিষয়ে গভর্নিং বডি ও অধ্যক্ষের দ্বন্দ্ব রয়েছে। 

প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ম্লান করতে শিক্ষকদের দায়ও কম নয়। ২০১১ সালে ছাত্রী শ্লীলতাহানির ঘটনায় উত্তপ্ত হয়েছিল ভিকারুননিসা। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক পরিমল জয়ধর ও বরুণ চন্দ্রকে স্কুল থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল।  প্রতিষ্ঠানটির নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় এক শিক্ষককে প্ররোচনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, শাখাপ্রধান এবং এক শ্রেণিশিক্ষককে বরখাস্ত করা হয়েছিল। এছাড়া শিক্ষার্থী ভর্তির নিয়ম না মানায় ২০১২ সালে এক অধ্যক্ষের এমপিও সাময়িক স্থগিত হয়েছিল। ঐ বছর ভিকারুননিসা স্কুল কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত   ৬৮ লাখ ১৭ হাজার ১০০ টাকা আদায় করেছিল।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চারটি শাখায় পরিচালিত বড় এই প্রতিষ্ঠানটিতে ২৭ হাজার শিক্ষার্থী। এ কারণে সবকিছুতেই বাণিজ্য চলছে। সহায়ক বই, স্কুল ইউনিফরম ছাড়াও অবকাঠামো সংস্কার, অনিয়মিত শ্রমিক নিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই কোটি টাকার বাণিজ্য চলে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে উেকাচ নেওয়ার অভিযোগও কম নয়। তবে ভিকারুননিসায় দ্বন্দ্বের মূল কারণ ভর্তি-বাণিজ্য। অতীতে গভর্নিং বডির সব সদস্য কোটা নিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করতেন। আবার কোটার বাইরে ভর্তি করা হয়েছে কয়েক শ। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে নড়েচড়ে বসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তখন এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি হয়। বিষয়টি প্রমাণের পর অধ্যক্ষ ও গভর্নিং বডি একে অপরকে দায়ী করে। আবার এসব অনৈতিক ভর্তিতে সরকারের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদেরও তদ্বির করতে দেখা গেছে। ২০১৯ সালে নিয়োগ পরীক্ষায় ৩০-এর মধ্যে সাড়ে ৩ নম্বর পাওয়া এক অধ্যক্ষকে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টায় জড়িত ছিলেন তত্কালীন গভর্নিং বডি ও শিক্ষা ক্যাডারের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা। যদিও শেষ পর্যন্ত ঐ নিয়োগ বাতিল হয়েছিল। 

সূত্র জানায়, গত ১০ বছর ধরে ভর্তি নিয়ে অভিযোগের পাল্লা ভারী হচ্ছে। গভর্নিং বডি কোটার বাইরে, নিয়মের বাইরে গিয়ে ভর্তি করছে প্রতি বছরই। গভর্নিং বডি নিজের নামে কোটা প্রথাও চালু করে। কোনো কোনো কমিটি সদস্যপ্রতি ১৫টি কোটা চালু করে ভর্তি-বাণিজ্য খুলে বসেছিল।

২০১৯ শিক্ষাবর্ষে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে অতিরিক্ত ৪৪৩ জন ছাত্রী ভর্তির অভিযোগে সাবেক অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয় মন্ত্রণালয়। অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছিল প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত। অথচ ঐ সব ভর্তিই করা হয়েছিল গভর্নিং বডির নির্দেশে। কিন্তু গভর্নিং বডির  বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারায় অধ্যক্ষের এমপিও বাতিল করে মন্ত্রণালয়। দীর্ঘদিন ধরে ভর্তি নিয়ে নানা সংকট তৈরি হলেও দায়ী গভর্নিং বডির বিরুদ্ধে কোনো সময়ই ব্যবস্থা নিতে পারেনি মন্ত্রণালয়।

এদিকে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে শিক্ষা ক্যাডারের এক কর্মকর্তাকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর এই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ ওঠে। অতঃপর তাকেও প্রত্যাহার করে ওএসডি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর পরে নিয়োগ দেওয়া হয় শিক্ষা ক্যাডারের সদস্য কামরুন নাহারকে। কিন্তু সম্প্রতি তার একটি ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার পর তার বিরুদ্ধেও চলছে তীব্র সমালোচনা।

সূত্র জানায়, ভিকারুননিসার এই অধ্যক্ষের সঙ্গে বর্তমান গভর্নিং বডির কয়েক জন সদস্যের দ্বন্দ্ব চরমে উঠেছে। এ বছর প্রথম শ্রেণিতে এখনো ১৫০টি আসন শূন্য রয়েছে। এই আসনের ভাগবাঁটোয়ারা নিয়েই দ্বন্দ্বের শুরু। নানাভাবে এক পক্ষ আরেক পক্ষের দোষত্রুটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।

সর্বশেষ, চলতি মাসে ভিকারুননিসার গভর্নিং বডির সভাপতি ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার স্বাক্ষরিত একটি আবেদন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে পাঠানো হয়েছে। সেখানে গভর্নিং বডির কয়েক জন সদস্যর ভর্তি-বাণিজ্য, শাখা পরিবর্তনসহ নানা অনিয়মের কথা বলা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঈদের ছুটির আগের দিন গত ১৯ জুলাই ঢাকা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক অধ্যাপক মোহাম্মদ আবুল মনছুর ভূঞাকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত এখনো চলছে বলে জানা গেছে।