করোনার এই সময়ে অনেকেই দাঁড়িয়েছেন অসহায় মানুষের পাশে। তাদের অনেকেই দিয়েছেন খাদ্যসামগ্রী, আবার অনেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কিংবা সুরক্ষা সামগ্রী। মানবিক এই উদ্যোগগুলোর অধিকাংশই বিভিন্ন সংগঠননির্ভর। আর অল্পসংখ্যক উদ্যোগ ছিল পুরোপুরি ব্যক্তিনির্ভর, যারা দীর্ঘদিন ধরেই নিজের আয়ের একটা অংশ উৎসর্গ করে যাচ্ছেন মানবতার খাতিরে; সচেতন করে যাচ্ছেন লাখো মানুষকে। তেমনি একজন সাঈদ রিমন।

জনসচেতনতার ফেরিওয়ালা এই মানুষটি পেশায় একজন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার। এই শহরের আর দশজনের মতোই চাকরিজীবী এই মানুষটি। শিক্ষকতা করছেন নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। প্রায় এক যুগ ধরে নিজ উদ্যোগে মানুষকে সচেতন করে চলেছেন রিমন। কখনও পোস্টার বিলি করে, আবার কখনও বাসে বাসে হকারদের মতো দাঁড়িয়ে। উদ্দেশ্য— চুরি, ছিনতাই ও মলম পার্টির কবল থেকে মানুষকে রক্ষা করা। ২০০৯ সালের দিকে বরগুনায় থাকাকালে মানুষের সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন রিমন। নিজ অর্থায়নে একদমই কম খরচে সচেতনতামূলক ভিডিও ক্লিপ বানিয়ে স্থানীয় ক্যাবল অপারেটর আর ফোনের দোকানে দিতেন। এভাবেই তার বানানো ভিডিও ছড়িয়ে পড়তো মানুষের কাছে।

রিমনের এই উদ্যোগকে তখন ভালোভাবে নেননি অনেকেই। কিন্তু থেমে থাকেননি তিনি। শত বিড়ম্বনার মাঝেও নিজেই চালিয়ে যান সচেতনতামূলক স্থিরচিত্র আর ছোট ছোট ভিডিও ক্লিপ বানানোর কাজ। ব্যক্তিগত আয়ের এক অংশ থেকে চালিয়েছেন সমস্ত খরচ। নিজেই মোবাইল ছিনতাইকারী, চোর, মলম পার্টির সদস্য কিংবা দরিদ্র-অসহায় সেজে অভিনয় করেছেন। একে একে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন প্রায় ছয় শতাধিক জনসচেতনতামূলক স্থিরচিত্র। কখনো পথচারীদের হাতে আবার কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চালিয়ে গেছেন সচেতনতামূলক কার্যক্রম। তার নির্মিত পোস্টার বিভিন্ন সময় ব্যবহূত হয়েছে পুলিশের বিভিন্ন ক্যাম্পেইনে।

জনসচেতনতার পাশাপাশি অসহায়-দুস্থ মানুষদের পাশে থেকেছেন রিমন। ভোরবেলা খাবার নিয়ে বের হয়েছেন রাজপথে। সড়কের পাশে রাত কাটানো অসহায়দের সকালে খাবারের ব্যবস্থা করেছেন সাধ্যমতো। রাতের আঁধারেও থেমে থাকেনি তার খাদ্য-সহায়তা। ধীরে ধীরে সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে আসতে শুরু করেন। গত বছরের মার্চে দেশে করোনার প্রভাবে লকডাউন শুরু হলে মহামারি প্রতিরোধে কাজ শুরু করেন রিমন। প্রথম লকডাউনে অসহায় মানুষকে খাদ্য-সহায়তা দিতে গিয়ে বাসায় রান্না করা খাবার বিতরণের কথা চিন্তা করেন। স্ত্রীর সহায়তায় সে অনুযায়ী কাজও শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার কার্যক্রম দেখে এগিয়ে আসতে শুরু করেন সমাজের বিত্তবানরা। পুরো লকডাউনের সময়জুড়ে প্রায় ১৫ হাজার মানুষকে এক বেলার খাবার দিয়েছেন রিমন। প্রয়োজনের সময় প্রায় দেড় হাজার পরিবারের হাতে পৌঁছে দিয়েছেন জরুরি খাদ্য সামগ্রী। শুধু তাই নয়, এর পাশাপাশি পুরো সময়জুড়ে যখনই পেরেছেন করোনা প্রতিরোধে জনসচেতনতার কাজ করে গিয়েছেন। বিতরণ করেছেন মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ বিভিন্ন সুরক্ষা সামগ্রী।

রিমনের ‘গোশত টোকাই’
গত বছর কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে পরিবার, বন্ধু, আত্মীয়দের আহ্বান জানান সাধ্যমতো কোরবানির পশুর মাংস দান করতে। নিজ উদ্যোগে সিএনজি নিয়ে ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করেছেন। এরপর রান্না করে বিতরণ করেছেন অসহায়, দরিদ্র মানুষের মাঝে। ভিন্নধর্মী এই উদ্যোগের নাম দিয়েছেন ‘গোশত টোকাই’। এবারের কোরবানির ঈদেও একই কার্যক্রম নিয়ে মাঠে ছিলেন রিমন। তিনি বলেন, ‘গতবারের মতো এবারও কোরবানির মাংস সংগ্রহ করেছি। এরপর রান্না করে ঈদের তৃতীয় দিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিতরণ করেছি।’ দীর্ঘ সময়জুড়ে জনসচেতনতার কাজ করা রিমন স্বপ্ন দেখেন অপরাধমুক্ত সমাজ গড়ার।
ইত্তেফাক/কেকে
