আফগান মুলুকে ভয়ংকরের রণধ্বনি

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ২০:৫৪

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানের ভবিষ্যত্ নিয়ে রাষ্ট্রসংঘের উদ্বেগ বাড়ছে। সংগত কারণ আছে। প্রত্যক্ষদর্শীর মতো আমরা দেখতে পাচ্ছি, সরকারি বাহিনী ক্রমশ পিছু হটছে। ফৌজি ও অসামরিক লোকেরা সীমান্ত পেরিয়ে মধ্য-এশিয়ার পশ্চিম দিকে পালাচ্ছে।

কান্দাহারসহ দেশটির এক বিশাল ভূখণ্ড আজ তালেবানদের দখলে। অত্যাধুনিক অস্ত্রের সঙ্গে তালেবান কী করে মর্টার ও গুণধর বন্দুক নিয়ে লড়ছে তা বিস্ময়ের যেমন, তেমনি উদ্বেগের বিষয়। আমেরিকা ইতিমধ্যে কতটা সেনা প্রত্যাহার করেছে তা পরিষ্কার নয়। আদৌ ন্যাটোর সব বাহিনী তাদের দেশে ফিরে যাবে কি না, তা এখনো ধোঁয়াটে। এ রকম হতে পারে, সরকারি ফৌজকে কেবল প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য মিত্র শক্তি তাদের অবস্থান খানিকটা বহাল রাখবে।

তালেবানদের পেছনে কে? কে তাদের অস্ত্র দিয়ে মদত জোগাচ্ছে, তা কি ধরাছোঁয়ার বাইরে? পাকিস্তান ধোয়া তুলসীপাতা নয়। তার সেনারা গত দুই দশক ধরে তালেবানদের শক্তি জোগাচ্ছে। পাকিস্তানের মনোভাব আপাতত বদলাবে বলে মনে হয় না। সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পর, তালেবানপন্থি বিভিন্ন গোত্রীয় জনযোদ্ধাদের পাক-ফৌজি সেনানায়করাই একই ছত্রছায়ার নিয়ে এসেছিলেন। আবার ঐ ভূমিকায় সম্ভবত ফিরে যাবে। তালেবানরা ধর্ম, ধর্মযুদ্ধ আর ধর্মীয় রাষ্ট্রের জেদ ছাড়বে না। প্রেসিডেন্ট গনির সার্বিক পতন তাদের লক্ষ্য। গনি যদি ক্ষমতা ছেড়ে দেন এবং সে জায়গা দখল করে তালেবানি যোদ্ধারা, তাহলে যে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়বে এবং গৃহযুদ্ধ দেখা দেবে তা সামলাবে কে? এখানেই পাকিস্তান তার পুরোনো ভূমিকায় ফিরে যাবে। কিন্তু ধর্মের নামে যুদ্ধ পাকিস্তানের অভিজাত শাসকগোষ্ঠীরও একটি সমস্যা। যখনই তালেবানদের প্রশ্রয় দিয়েছে, আশ্রয় দিয়েছে আল-কায়েদার লাদেনকে, তখন পশ্চিম মুখ ফিরিয়ে নেয়। সন্ত্রাস দমনের নামে কোটি কোটি টাকা বিদেশ থেকে নিয়ে এসে অপচয় কিংবা অন্য কাজে ব্যবহার করেছে। তবু এখনো সুযোগ পেলেই পাকভূমিতে অস্ত্র গর্জে ওঠে। গত দুই দশকে সন্ত্রাসবাদীদের হামলায় যত পাকিস্তানি নিহত হয়েছে, তা আগের সব রেকর্ডকে অতিক্রম করেছে। ভারতের সঙ্গে বার কয়েক যুদ্ধে কিংবা অন্যান্য কারণে এতসংখ্যক লোক হতাহত হয়নি। তবু সামরিক মদতপুষ্ট পাকিস্তানের রাষ্ট্রশক্তির বোধোদয় হয়নি। নিছক ভারতকে আটকাতে কাবুলে সে তার অবস্থান যতই সম্প্রসারিত করুক না কেন, তাতে ফায়দা হবে না। তালেবানদের প্রথম প্রজন্মের বড় অংশই ভারতীয় ধর্মশিক্ষায় দীক্ষিত। উত্তরাধিকারীরাও ‘ইন্দুস্তানি’ সুন্নি উলামাদের ভাবাবেগ থেকে দূরে থাকতে চায় না। রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা ও পশ্চিমিদের গায়ের জোরে শান্তি চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে তারা লড়ছে। এ লড়াইয়ে পাকিস্তান আড়ালে তাদের শরিক হলেও বাহ্যত অঘোষিত শত্রু। পাকিস্তানকে তারা যেমন ব্যবহার করছে, তেমনি পাকিস্তানও তাদের কৌশলের শিকার হয়ে ব্যবহূত হচ্ছে। এ এক ধারাবাহিক ট্র্যাজেডি। ভারতের অবস্থান কিছুটা হলেও পরিচ্ছন্ন ছিল। কংগ্রেস আমলে দিল্লি সন্ত্রাসের রাজনীতিকে পছন্দ করেনি। কাবুলের হাতে কাবুলের কর্তৃত্ব থাকা বাঞ্ছনীয়, এ কথা সব সময় মনে রেখেছে। বিজেপি আমলে কাবুল-দিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্ক তলিয়ে যায়নি। দিল্লির সাম্প্রতিক শাসকগোষ্ঠী প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট কার্জাই কিংবা গনির পাশাপাশি দাঁড়িয়েছে। এখানে সমস্যা, যে শাসক নিজ দেশে ধর্মীয় শাসনের ছবি আঁকে তারা অন্য দেশে ভিন্নতর শাসনব্যবস্থার আশা কতটা করতে পারেন? এই সুযোগে পাকিস্তান তলে তলে তালেবানদের ঘরে ঢোকার চেষ্টা করছে। ভারত নিজেকে জড়াতে কতটা আন্তরিক, এ নিয়ে সন্দেহ আছে। এশিয়া ও পশ্চিমের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে গলা মিলিয়ে দিল্লি যতই তালেবানি সন্ত্রাসের বিরোধিতা করুক না কেন, তার নৈতিক যুক্তি বড্ড নড়বড়ে। সম্প্রতি বিভিন্ন দেশ এক হয়ে বলেছে, গায়ের জোরে যেসব সশস্ত্র যোদ্ধা মুলুক দখল করতে চাইছে, তাদের হাতে আফগানিস্তানকে ছেড়ে দেওয়া যায় না। কৌশলগত কারণে ভারতও এই বিবৃতির অংশীদার। কিন্তু কোনো দেশই পাকিস্তানের তত্পরতার বিরুদ্ধে আঙুল তোলেনি।

রাষ্ট্রসংঘ এই প্রথম দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছে, আফগানিস্তানে ২০২১ সালে ১ হাজার ৬০০-এর বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। তাদের রিপোর্ট বলা হয়েছে, গত বছরের একই সময়কালের মধ্যে এ বছর মানুষের মৃত্যু ৪৭ শতাংশেরও বেশি। পরিস্থিতি ভয়াবহ। মাস কয়েকের মধ্যেই হাওয়া আরো ঘোরালো হয়ে উঠবে। বাড়বে গৃহযুদ্ধ। তুরস্ক ও উজবেক-সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলে তালেবানবিরোধী বিভিন্ন গোত্রের যোদ্ধারা বসে থাকবে না। তুরস্কও ইতিমধ্যে বলেছে, তাদের হাতে আফগানিস্তানে নজরদারির ভার দেওয়া হোক। উজবেকিস্তান সরাসরি হস্তক্ষেপের দাবি জানায়নি। কিন্তু বলেই দিয়েছে, মানবিক কারণে আমরা আফগান বাসিন্দাদের আমাদের দেশে ঢোকার অনুমতি দিচ্ছি। উজবেকিস্তান প্রকৃত অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে তার বাধ্যবাধকতাকে অস্বীকার করা যায় না। তালেবানদের বাড়াবাড়ি তারা মানবে না। মানতে পারে না। সব দিক খতিয়ে দেখে মনে হচ্ছে, আফগান সমস্যার আশু-রফা অসম্ভব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো বাহিনীর প্রবেশ ও দীর্ঘস্থায়ী অবস্থানে যে সমস্যা তৈরি হয়েছিল, তাদের প্রত্যাহারে সমস্যার জটিলতর রূপান্তর অনিবার্য।

একই পরিস্থিতি ইরাকেও দেখা গেছে। সাদ্দামমুক্ত ‘ইরাক আবিষ্কারের’ ভয়াবহ আশা নিয়ে আমেরিকা ১৮ বছর ধরে ইরাকের যে সর্বনাশ করে গেল, তার পরিণতি আজও ইরাকি জনগণকে ভুগতে হচ্ছে। যে দেশ ওষুধ ও শিশুদের খেলার সরঞ্জাম তৈরিতে একসময় চমক তৈরি করেছিল, যার সামাজিক উন্নয়ন বিস্ময়কর হয়ে উঠেছিল, যেখানে শালীনতা বজায় রেখে বোরকা ছাড়া নারী প্রশাসনের সব কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকত, শিল্প থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বত্র দাপটে স্বপ্ন নিয়ে উড়ে বেড়াত, যার সামরিক শক্তি আরবদের প্রত্যাশা ও ভরসাকে নিরন্তর উঁচু করত, আজ সে দেশের অনেকটাই অবগুণ্ঠনে আচ্ছাদিত। দিশেহারা। আমেরিকার প্রত্যক্ষ অবস্থান তাদের সুখী করেনি। সমস্যা বেড়েছে, চারদিকে। ভেঙে পড়া অর্থনীতি, মানসিক সিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব, শিল্পের ভেঙে পড়া পরিকাঠামো, তেলের উত্পাদন বৃদ্ধি ইত্যাদি কোথাও পুনর্নির্মাণের আশ্বাস নেই। তথাকথিত ইসলামি স্টেটের অভ্যুদয়, কুর্দদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার পাশে আমেরিকার নৈতিক ও কৌশলগত সমর্থন ইত্যাদি কারণে ইরাকের অভ্যন্তরীণ সমস্যা আগের চেয়ে বেড়েছে। এবার জনচাপে বাধ্য হয়ে মার্কিন প্রশাসন বুঝতে শিখেছে, উড়ে এসে জুড়ে বসে বিশেষ লাভ হয় না। তাতে নিজের ক্ষতি, অন্যেরও সর্বনাশ। এই বোধোদয় আমেরিকা ও ইরাককে কতটা ফায়দা দেবে। আদৌ দেবে কি? ১৮ বছর পর পুরোপুরি ইরাক ছাড়ছে মার্কিন সেনা। জো বাইডেনের সঙ্গে ইরাকের নির্বাচিত জিহুজুর প্রধানমন্ত্রী মুস্তাফা আল-কাদিমির বৈঠকের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, আমরা এবার আমাদের সেনা নিয়ে চললাম। সাদ্দামের পতনের পর থেকে আড়াই হাজার মার্কিন সেনার অবস্থিতিকে ঘিরে সরকারকে অহরহ সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছে। আমেরিকায়ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে। ভোটে, ভোটের বাইরে। ওবামা, ট্রাম্প সবাই মার্কিন সেনা সরাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি আমল দেয়নি। বাইডেন দূরদ্রষ্টা, অভিজ্ঞ রাজনীতিক। বলেছেন, ‘সেনা আমরা সরিয়ে নেবই, তবে আমাদের নজরদারি থাকবে। আইএসকে প্রতিরোধ করব। ইরাকি সেনাকে প্রশিক্ষণ দেবে আমাদের সেনারা।’ সত্যি কি কার্যত ইরাক থেকে হাত গুটিয়ে নিচ্ছে আমেরিকা? মনে হয় না। সেনা থাকবে না। থাকবে তার প্রতিরোধ আর তদারকি। পুরোপুরি সেনা সরালে ছত্রভঙ্গ আইএসআই আবার জড়ো হবে। তাদের মদত দেবে কোনো কোনো আঞ্চলিক শক্তি। এরা কারা? এদের মুখ দুষ্পাঠ্য নয়। আফগানিস্তান থেকে সার্বিক মার্কিন সেনা অপসারণের পর বোতলের দৈত্য ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। এ আশঙ্কা প্রবলভাবে ভাবাচ্ছে ইউরোপ ও এশিয়াকে। অতএব, ভেবে নেওয়া স্বাভাবিক, আফগান মুলুক ছেড়ে দিয়েও তদারকিতে ব্যস্ত থাকবে ন্যাটো ফোর্স।

n লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা