এবার পাহাড় ধসে পাঁচ ভাইবোনের মৃত্যু

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ২২:৩২

টেকনাফের হ্নীলা পাহাড়ের পাদদেশে পরিবারটির ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস। প্রতিদিনের মতো মঙ্গলবার রাতে খাবার খেয়ে পরিবারের সাত সদস্য ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বাইরে তখন টানা বৃষ্টি। মধ্যরাতে হঠাত্ পানির তোড়ে পাহাড়ের একাংশ ধসে পড়ে তাদের ঘরের ওপর। ঘটনাস্থলেই মাটিচাপা পড়ে মারা যায় পাঁচ ভাইবোন। এদের সবাই শিশু। আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে বাবা-মাকে। সন্তানদের হারিয়ে তারা এখন বাকরুদ্ধ।

টেকনাফে একই পরিবারের এই পাঁচ জন ছাড়াও গত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধস ও ঢলের পানিতে ভেসে আরো সাত জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর আগে মঙ্গলবার সকালে জেলার উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং মহেশখালী ও টেকনাফে পৃথক পাহাড় ধসের ঘটনায় পাঁচ রোহিঙ্গাসহ সাত জনের মৃত্যু হয়। এছাড়া একই সময় ঢলের পানিতে গোসল করতে নেমে ভেসে গিয়ে এক রোহিঙ্গা শিশু মারা গেছে। এ নিয়ে গত দুই দিনে জেলায় ২০ জনের মৃত্যু হলো।

এদিকে কক্সবাজার জেলা জুড়ে টানা ভারী বর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। অতিবর্ষণে পাহাড়ি ঢলে বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ে ধসের সৃষ্টি হয়েছে। ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া, রামু, পেকুয়া, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ফুলেশ্বরী নদীর ঢলের তোড়ে ধসে গেছে ‘ঈদগাঁও-ঈদগড়-বাইশারী’ বাণিজ্যিক সড়কের প্রায় ১০০ ফুট এলাকা। জেলার ৯ উপজেলার প্রায় প্রতিটি এলাকায় পানিবন্দি অবস্থায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন কয়েক লাখ মানুষ। কয়েক হাজার একরেরও বেশি চিংড়ি ঘেরের মাছ তলিয়ে গেছে। নষ্ট হয়েছে পানের বরজ ও ধানসহ বিভিন্ন সবজির ফসল।

টেকনাফ :প্রশাসন সূত্র জানায়, মঙ্গলবার দিবাগত রাত ২টার দিকে উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পাহাড়ি গ্রাম ভিলেজারপাড়ার সৈয়দ আলমের বাড়িতে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। এ সময় মাটির নিচে চাপা পড়ে যাওয়া সৈয়দ আলমের পাঁচ সন্তানের মৃতদেহ উদ্ধার করেন স্থানীয়রা। এরা হলো—ছেলে আব্দুল শুক্কুর (১৬), মোহাম্মদ জুবাইর (১২), আবদুর রহিম (৫), মেয়ে কহিনুর আক্তার (৯) ও জয়নবা আক্তার (৭)। এর আগে মঙ্গলবার উপজেলার হোয়াইক্যং এলাকায় পাহাড় ধসে রকিম আলী নামে একজন নিহত হন। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে উপজেলা নির্বাহী অফিসার পারভেজ চৌধুরী বলেন, ভারী বর্ষণে পাহাড় ধসে হ্নীলায় একই পরিবারের পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে।

উখিয়া :উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের চোরাখোলা এলাকায় পানির সে াতে ভেসে মৃত আলী আহমদের ছেলে আবদুর রহমান (৪৫) মারা গেছেন। এছাড়া একইভাবে রাজাপালংক ইউনিয়নের ধইন্যাগুনিয়া গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে আলী আকবর (৩৫) এবং মালিয়ারফুল গ্রামের মো. ইসলামের ছেলে রুবেলের (২২) মৃত্যু হয়েছে। পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী জানান, আবদুর রহমান মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বানের জলে ভেসে যান। বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চোরাখোলা খাল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয়রা। এর আগে মঙ্গলবার উপজেলার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় পাহাড় ধসে পাঁচ রোহিঙ্গা মারা যান।

মহেশখালী :গতকাল উপজেলায় পাহাড় ধসে ঘুমন্ত অবস্থায় এক বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন। নিহত বৃদ্ধ আলী হোসেন (৬৮) হোয়ানক ইউনিয়নের রাজুয়ার ঘোনার মৃত রফিক উদ্দিনের ছেলে। পাহাড় ধসে তাদের বাড়ির ওপর পড়লে তিনি মারা যান। আগের দিন উপজেলার ছোট মহেশখালী ইউনিয়নের সিপাহীপাড়া এলাকায় পাহাড় ধসে মোর্শেদা বেগম (১৪) নামে এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে।

ঈদগাঁও :ঈদগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ছৈয়দ আলম জানান, ফুলেশ্বরী নদীর ঢলে ডুবে থাকা দরগাহপাড়া-ভাদিতলা সড়কের কাঠের সাঁকো এলাকায় গতকাল দুপুরে মাছ শিকারকালে দুই সহোদরসহ তিন জন পানির স্রোতে তলিয়ে গিয়ে নিখোঁজ হন। এরা হলেন—দরগাহপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ শাহাজাহানের দুই ছেলে মোহাম্মদ ফারুক (২৬) ও দেলোয়ার হোসেন (১৫) এবং আবছার কামালের ছেলে মোহাম্মদ মোরশেদ (১৪)। পরে তিন জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ জানান, টেকনাফ-উখিয়া ও মহেশখালীতে পাহাড় ধসে নিহত সকলের পরিবারকে প্রশাসনের পক্ষ হতে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুর ঝুঁকি এড়াতে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে মাইকিং ও অভিযান চলছে।

চট্টগ্রামে পাহাড় থেকে তিন শতাধিক

মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হলো

চট্টগ্রাম অফিস জানায়, গত তিন দিন ধরে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড় ধসের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে জেলা প্রশাসন নগরীর বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসরত ৯২টি পরিবারের ৩১২ জন সদস্যকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে। মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত নগরীর খুলশী ও বায়েজিদ থানা এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে তাদের সরিয়ে নিয়ে ফিরোজ শাহ প্রাথমিক বিদ্যালয়, আল হেরা মাদ্রাসা, রউফাবাদ রশিদিয়া মাদ্রাসা ও লালখান বাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া ২০টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, গত তিন দিন ধরে চট্টগ্রামে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে বাটালি হিল, মতিঝর্ণা, আকবরশাহ হিল-১ ও ২ এবং ভাটিয়ারী-বায়েজিদ লিংক রোড পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরত মানুষজনকে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে সরিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আনার জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এর নেতৃত্বে ছয় জন এসিল্যান্ডসহ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং অব্যাহত আছে।

চট্টগ্রামে গতকাল বুধবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অফিস। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা বিশ্বজিত্ চৌধুরী ইত্তেফাককে জানান, পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামসহ উপকূলীয় বিভাগসমূহে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে এবং সেই সঙ্গে পাহাড় ধসের আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে নগরীর নিচু এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন নগরবাসী। নগরীর চকবাজার, কাপাসগোলা, রাহাত্তারপুল, চাদগাঁও, বাকলিয়া, চাক্তাই, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, প্রবর্তক মোড়, আগ্রাবাদের এক্সেস রোড, মা-শিশু ও জেনারেল হাসপাতাল এবং হালিশহরের নিচু এলাকায় রাস্তায় পানি জমে যায়। লকডাউনের কারণে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কর্মস্থলে যেতে বিপাকে পড়েন সাধারণ মানুষ।

পানির তোড়ে ধসে পড়ল সড়ক

বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বুধবারও বন্যার পানিতে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী, ঘুমধুম, সোনাইছড়ি ইউনিয়নে পাহাড় ধসে পড়েছে। বাইশারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলম ও সোনাইছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এনিমং মারমা জানান, পানেরছড়া নামকস্থানে বাইশারী-ঈদগা সড়কের বিশাল একটি অংশ ধসে গেছে বন্যার পানিতে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে উপজেলার সাথে।

এদিকে আলীকদম-চকরিয়া-লামা সড়কের শীলেরতোয়াসহ কয়েকটি স্থানে বন্যার পানিতে সড়ক ডুবে যাওয়ায় আলীকদম উপজেলার সাথে দ্বিতীয়দিনের মত সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। অব্যাহত ভারী বর্ষণে বান্দরবানে সাঙ্গু, মাতামুহুরী, বাকখালী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে লামা উপজেলার রুপসীপাড়াসহ আশপাশের এলাকা এবং বান্দরবান সদরের পুশ্চিম বালাঘাটা, ইসলামপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থানে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কোনাক খালের পানিতে ডুবে গেছে মিয়ানমার সীমান্তের শূন্যরেখায় আশ্রয় নেওয়া ঘুমধুমের তুমব্রু কোনাপাড়া রোহিঙ্গা আশ্রয় কেন্দ্রও।

জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি জানান, বৃষ্টিতে উপজেলাগুলোতে পাহাড় ধসে সড়ক, ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতির খবর পেয়েছি। প্রাণহানি ঠেকাতে পাহাড়ে ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আশ্রয়কেন্দ্র হিসাবে খুলে দেওয়া হয়েছে।