উড়োজাহাজ আবিষ্কারের বহুকাল পরও যান্ত্রিক ত্রুটি বা আবহাওয়াজনিত কারণে এদের কোনো একটি দুর্ঘটনায় পতিত হলে এর পেছনে কারণ হিসেবে অনুমাননির্ভর ও অস্পষ্ট যুক্তিকে দাঁড় করানো হতো। কারণ ফরেনসিক স্যাম্পলগুলো বিরূপ পরিবেশে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। ফলে ঠিক কী কারণে এমন দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে সেটা যেমন জানা সম্ভব হচ্ছিল না, তেমনি উড়োজাহাজের কারিগরি মানোন্নয়নও একরকম থমকে গিয়েছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে উড়োজাহাজে অধিক ঘাত প্রতিঘাত সহনশীল এবং ডিজিটাল বার্তা সংরক্ষণে সক্ষম একধরনের যন্ত্র তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে। অস্ট্রেলীয় সরকারের অ্যারোনটিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে গবেষণা বিজ্ঞানী ডেভিড ওয়ারেন ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে ‘ব্লাক বক্স’ নামে এক ধরনের যন্ত্রের অবকাঠামো সর্বপ্রথম বিশ্ববাসীর সামনে আনেন।
তবে দুর্ঘটনার পর উড়োজাহাজের শক্ত আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও কোনো ইলেক্ট্রিক যন্ত্র আসলেই অবিকৃত তথ্য সরবরাহ করতে পারবে কি না এমন সমালোচনাও হয়। যেহেতু স্টেইনলেস স্টিল বা টাইটেনিয়ামের খোলস দিয়ে ব্ল্যাক বক্সের আবরণ তৈরি করা হয়, ফলে ভাঙচুর, প্রচণ্ড উত্তাপ, পানি বা বাতাসের প্রচণ্ড চাপের মধ্যেও এটি টিকে থাকতে পারে। সেইসঙ্গে ব্লাক বক্সের অভ্যন্তরীণ তথ্য প্রায় এক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেও অক্ষত থাকতে পারে। টিকে থাকার এমন বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে অস্ট্রেলিয়ার একটি উড়োজাহাজে ১৯৬২ সালের ২৩ মার্চ সর্বপ্রথম পরীক্ষামূলকভাবে যন্ত্রটি ব্যবহার করা হয়।
সবাই ব্লাক বক্স নামে চিনলেও অনেকটা কমলা রঙের এ যন্ত্রটিকে এভিয়েশন বা উড়োজাহাজ নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এটিকে ফ্লাইট রেকর্ডার নামে ডাকেন। যন্ত্রটি মূলত ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডার বা এফডিআর এবং ককপিট ভয়েস রেকর্ডার বা সিভিআর নামে দুটি স্বতন্ত্র অংশ নিয়ে গঠিত। অংশ দুটির সমন্বয়ে যন্ত্রটি ককপিটের যাবতীয় কথাবার্তা এবং বিমানের কারিগরি তথ্য রেকর্ড করে। এই দুটি রেকর্ডার একত্রে উড়োজাহাজের উড্ডয়নের যাবতীয় তথ্য নিখুঁতভাবে সরবরাহ করে, যা দুর্ঘটনাকবলিত উড়োজাহাজ নিয়ে বিস্তারিত তদন্তের কাজে লাগে। তবে আলাদা সেন্সেশনিং পদ্ধতি ছাড়াও এফডিআর এবং সিভিআর একত্রে একটি যন্ত্র হিসেবেও ব্যবহূত হতে পারে।
বর্তমানে উড়োজাহাজগুলোতে যেসব ব্ল্যাক বক্স ব্যবহার করা হয়, সেগুলো দুর্ঘটনার পর প্রায় পঁচিশ ঘণ্টা পর্যন্ত ফ্লাইট ডাটা এর ভেতর পাশাপাশি সন্নিবেশিত মেমরি চিপে সংরক্ষণ করে রাখতে পারে। মেমরি চিপে রক্ষিত এসব তথ্য আসে মূলত উড়োজাহাজের বিভিন্ন জায়গায় লাগানো সেন্সর থেকে।
এসব সেন্সর থেকে পাঠানো ডিজিটাল সিগন্যালের মধ্যে রয়েছে উড়োজাহাজের গতি, ভেতর-বাইরের চাপ, তাপমাত্রা, উচ্চতা, দুর্ঘটনায় পড়াকালীন স্থানীয় সময় ইত্যাদি। উড়োজাহাজের সামনের দিকে থাকা ফ্লাইট ডাটা অ্যাকুইজিশন ইউনিট নামের একটি অংশে প্রথমে এসব সিগন্যাল আসার পর তা পরবর্তী সময়ে ব্ল্যাক বক্সের রেকর্ডারে জমা হয়।
তবে দীর্ঘ যাত্রাপথের ক্ষেত্রে যাতে দুর্ঘটনার আগের বিশাল ডাটা দিয়ে মেমোরি চিপগুলো পূর্ণ না হয়ে থাকে, সেজন্য ব্ল্যাক বক্সে উড়োজাহাজ চলা অবস্থায় একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর আগের তথ্য মুছে যেতে থাকে এবং নতুন তথ্য জমা হয়। দুর্ঘটনায় পড়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তের তথ্যগুলো এভাবে জমা থাকে বলে সর্বশেষ তথ্য ব্ল্যাক বক্সে পাওয়া যায় এবং তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়।
কোনো উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় পড়লে ব্ল্যাক বক্সটি সর্বপ্রথম খুঁজে বের করা হয়। এরপর বিমান সংস্থা, বিমান দুর্ঘটনা তদন্তকারী সংস্থা, প্রযুক্তিবিদ এবং এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি তথ্য উদ্ধারের কাজটি শুরু করেন।
