সায়ীদ আলমগীর, কক্সবাজার
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও শ্রাবণের প্রবল বর্ষণে উত্তাল সাগরের ঢেউয়ে ভাঙছে কক্সবাজার সৈকতের বালিয়াড়ি ও ঝাউবাগান। গেল পাঁচ দিনে কস্তুরাঘাট, কলাতলি ও হিমছড়ি বন বিটের আওতায় সৈকতের ডায়াবেটিক, শৈবাল, হিমছড়ি, দরিয়ানগর ও সমিতিপাড়া পয়েন্টে প্রায় ১০ হেক্টর জমির ছোট ঝাউগাছ ও ১০৪টি বড় ঝাউগাছ উপড়ে গেছে। এটি অব্যাহত থাকলে ঝাউবীথি একেবারে নিশ্চিহ্ন হতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
বৃহস্পতিবার বিকালে সৈকতের ডায়াবেটিক, শৈবাল, হিমছড়ি, দরিয়ানগর ও সমিতি পাড়া পয়েন্ট এলাকার গিয়ে বালিয়াড়ির ভাঙন ও ঝাউগাছ বিলীনের দৃশ্য দেখা যায়। পৃথক পয়েন্টে কয়েক কিলোমিটারের মতো এলাকায় ঝাউগাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা সমীর রঞ্জন সাহা জানিয়েছেন, তারা উপড়ে যাওয়া গাছগুলো সংরক্ষণের কাজ করছেন। তিনি আরো জানান, বঙ্গোপসাগরে চলমান লঘুচাপের কারণে অতিমাত্রার জোয়ারে কক্সবাজারের কস্তুরাঘাট, কলাতলি ও হিমছড়ি বন বিটের আওতায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাগানের প্রায় চার হেক্টর ও ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রায় ছয় হেক্টর বাগানের ছোট গাছ ও ১০৪টি বড় ঝাউগাছ উপড়ে গেছে। গেল বছর সমিতিপাড়া ও ডায়াবেটিক পয়েন্টের মাঝখানে নতুন করে ঝাউবাগান সৃষ্টি করা হয়েছিল। লকডাউনের কারণে গাছগুলো দ্রুত বেড়েও উঠে। বঙ্গোপসাগরে চলমান লঘুচাপ ও পূর্ণিমার জোয়ারে ভাঙনের কবলে পড়ে বেশ কিছু ঝাউগাছ উপড়ে গেছে। একইভাবে মেরিনডাইভ সড়কের দরিয়ানগর, হিমছড়ি অংশে সৃজিত ঝাউবাগানের চারা গাছও সমুদ্রে ভেসে গেছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রের পানির উচ্চতা প্রতি বছরই বাড়ছে। বাড়ন্ত জোয়ারের ঢেউয়ে বালিয়াড়ি ভেঙে যাচ্ছে। পাশাপাশি উপড়ে যাচ্ছে ঝাউগাছও। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে সৈকত বা ঝাউবাগান রক্ষায় আমরা কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছি না। তিনি আরো বলেন, ইতিমধ্যে দেওয়া জিও ব্যাগের বাঁধও কোনো কাজে আসছে না। পৃথিবীর কোনো দেশে বাঁধ দিয়ে সমুদ্র রক্ষা করার নজির নেই। শ্রীলঙ্কা, কলম্বিয়াসহ বিভিন্ন দেশে সৈকত এলাকায় নারিকেলগাছ লাগিয়ে ঢেউয়ের ধাক্কা সামাল দেওয়া হয়েছে। নারিকেলগাছের শেকড় ছড়িয়ে মাটি ধরে রাখে। ঝাউগাছ সৌন্দর্য বর্ধন করলেও শেকড় খুবই হালকা। তাই ঝাউগাছের সামনের অংশে নারিকেলগাছ লাগানোর প্রস্তাবনা আমরা বারবার দিয়ে এসেছি। এটি করা গেলে সৈকত রক্ষার পাশাপাশি আয়ের সম্ভাবনাও রয়েছে। কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আমিন আল পারভেজ বলেন, সৈকতের ঝাউবাগান রক্ষা এবং সেখানে আরো বনায়ন সৃজনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর তরফে নির্দেশনা রয়েছে। এখন ঝাউগাছ রক্ষায় পাউবো জিও টিউব প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
পাউবো কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী বলেন, ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের বর্ষাকলে ভাঙনের কবলে পড়া বালিয়াড়ি ও ঝাউগাছ রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ১ হাজার মিটার প্রতিরক্ষা বাঁধ (জিও টিউব) করা হয়। সেটিও বেশি দিন টেকেনি। পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালে লাবণী পয়েন্ট থেকে ডায়াবেটিক পয়েন্ট পর্যন্ত দুই কিলোমিটারে ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে জিও বাগের বাঁধ বসানো হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পূর্ণিমা-অমানিশার জোয়ারে অতিমাত্রার পানির তোড়ে জিও ব্যাগের বাঁধও ধীরে ধীরে তলিয়ে যায়। সাম্প্রতিক লঘুচাপ ও পূর্ণিমার জোয়ারে বিমান বাহিনীর ঘাঁটির পশ্চিমাংশের সৈকত অংশ ও ডায়াবেটিক পয়েন্টে নতুন করে প্রায় ২০০ মিটার ভাঙনের কবলে পড়েছে। এই ভাঙন অংশে দ্রুত জিও ব্যাগ বসাতে ইতিমধ্যে ৮৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
