ঐতিহাসিক একটি ভুল দীর্ঘ সময় একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে তমসায় ডুবিয়ে রেখেছিল। একটি অবাস্তব সিদ্ধান্তে ঐসব অঞ্চলের মানুষকে পরিচয়হীন হয়ে বেঁচে থাকতে হয়েছিল দীর্ঘ ৬৮ বছর। ভোগ করতে হয়েছে অবর্ণনীয় অভিশপ্ত জীবন। কোনোরকমে জীবনকে বাঁচানোই ছিল মূল উপজীব্য। গভীর সমুদ্রে পড়ে গেলে মানুষ যেমন সামনে যা পায় সেটাকে আঁকড়ে ধরেই তীরে পৌঁছাতে চায়, তেমনি একটি স্বপ্নকে অবলম্বন করেই তারা দিনাতিপাত করে। পরিচয়হারা এই মানুষগুলো পায়নি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি এমনকি স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার। সরকার আসে সরকার যায়, তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। কিন্তু তাদের কাছে ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
রেডক্লিফের ঐতিহাসিক ভুল থেকেই উদ্ভব হয়েছিল ছিটমহল। ভারত উপমহাদেশ বিভক্ত করে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লগ্নে ১৯৪৭ সালে বাংলা ও পাঞ্জাবের সীমারেখা টানার পরিকল্পনা করেন লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্রিটিশ আইনজীবী সিরিল রেডক্লিফকে প্রধান করে সে বছরই গঠন করা হয় সীমানা নির্ধারণের কমিশন। আর এই বিভাজন করতে গিয়ে এক অসহনীয় মানবিক সমস্যার উদ্ভব হয়। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে রয়ে যায় ভারতের খণ্ডিত অংশ ও ভারতের ভূখণ্ডে রয়ে যায় বাংলাদেশের খণ্ডিত অংশ। ১৬২টি ছিটমহল ছিল দুই প্রতিবেশী দেশে মধ্যে। এর মধ্যে ভারতের ১১১টি ছিটমহল ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এবং বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল ছিল ভারতের অভ্যন্তরে। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ছিটমহলে বসবাসরত লোকসংখ্যা ছিল ৩৭ হাজার এবং ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ছিটমহলের লোকসংখ্যা ছিল ১৪ হাজার। সব মিলিয়ে ছিটমহলে বসবাসকারী জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৫১ হাজার। ২৪ হাজার ২৬৮ একর ভূমি নিয়ে দুই দেশের ছিটমহল ছিল। তার মধ্যে ভারতের জমির পরিমাণ ছিল ১৭ হাজার ১৫৮ একর। বাংলাদেশের ছিটমহলের জমির পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ১১০ একর। ভারতীয় ছিটমহলগুলোর অধিকাংশই ছিল বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে। এসবের মধ্যে লালমনিরহাটে ৫৯টি, পঞ্চগড়ে ৩৬টি, কুড়িগ্রামে ১২টি ও নীলফামারীতে চারটি ভারতীয় ছিটমহল ছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের অবস্থান ছিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে। এর মধ্যে ৪৭টি কোচবিহার ও চারটি জলপাইগুড়ি জেলায় ছিল।
মানবজীবন ও মানবসম্পদ সুন্দর ও শান্তিময় করতে গেলে যুদ্ধকে নির্বাসন দিতে হবে। তবে অধিকার আদায় ও পরিচয় অর্জনের জন্য যে যুদ্ধ তা চালিয়ে যেতে হয় সমাজের উন্নয়নের কথা ভেবেই। সে সংগ্রামের পথ ধরেই ছিটমহল সমস্যা সমাধানে প্রথম চুক্তি হয় ১৯৫৮ সালে, যা ‘নেহরু-নুন’ চুক্তি হিসেবে পরিচিতি পায়। ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নুন সীমান্ত সমস্যা সমাধানে একটি চুক্তি করেন। তবে এই সমস্যাটির অঙ্কুরেই বিনাশ ঘটে আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতায়।
১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের বিভাজনের পর পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি যে নিজস্বতা হরণের হিংস্র ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ছিল, সেই অমানবিকতার শেষ দৃশ্যপট ছিল ১৯৭১ সাল। অসহায়ত্বের শেষ সীমানায় গর্জে উঠেছিল বাঙালি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নায়কোচিত নেতৃত্ব ও ৩০ লাখ শহিদের রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠা পায় স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ’। স্বাধীনতা যুদ্ধে সর্বাঙ্গীণ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল ভারতীয় সরকার ও ভারতীয় জনগণ। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে নয়াদিল্লিতে সম্পাদিত হয় ‘মুজিব-ইন্দিরা’ চুক্তি। এই চুক্তির প্রধান বিষয় ছিল সমঝোতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যকার স্থলসীমানা নির্ধারণ সম্পন্ন করা। মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি অনুসারে, বাংলাদেশের ভেতরে ছিটমহলবাসী বাংলাদেশের নাগরিক ও পশ্চিমবঙ্গের ভেতরে ছিটমহলবাসী ভারতের নাগরিক হয়ে যাবে।
এই চুক্তি বাংলাদেশের পার্লামেন্টে অনুমোদিত হলেও ভারতের সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন সাময়িক সময়ের জন্য আটকে যায়। আর এর মধ্যে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে এবং এর মাধ্যমে ক্ষমতার দখল নেয় ৭১-এর পরাজিত শক্তি। ক্ষমতায় এসেই তারা শুরু করে ভারত বিরোধিতা এবং জাগিয়ে দেয় সাম্প্রদায়িক উসকানি। অবশেষে অনেক প্রতীক্ষার পর পিতার স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে আসেন বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসে একে একে সম্ভব করেন অনেক অসম্ভবকে, যার মধ্যে অন্যতম ছিটমহল। ২০১৫ সালের ৭ মে ভারতীয় সংসদের নিম্নকক্ষে স্থলসীমা চুক্তিটি ৩৩১-০ ভোটের ব্যবধানে পাশ হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭৪ সালেই চুক্তিটি অনুমোদন করা হয়ে গিয়েছিল। চুক্তিটি ২০১৫ সালে ৩১ জুলাই মধ্যরাতের পর থেকে কার্যকর হয়। ২০১৫ সালের ১ আগস্টের আগে ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের আর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের সর্বমোট যে ১৬২টি ছিটমহল ছিল, ১ আগস্ট রাত ১২টা ১ মিনিটে দুই দেশ ঐতিহাসিক মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির আওতায় একে অন্যের অভ্যন্তরে থাকা নিজেদের ছিটমহলগুলো পরস্পরের সঙ্গে বিনিময় করে। চুক্তি অনুযায়ী যে ছিটমহল যে দেশের অভ্যন্তরে আছে, সেই দেশই ছিটমহলগুলোর মালিকানা প্রাপ্ত হয়। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে অর্ধলক্ষাধিক জনগণের যাত্রা শুরু হয় অন্ধকার হতে আলোর পথে। সেদিন ৬৮টি মোমবাতি প্রজ্বালন করে আলোর আহ্বান জানায় সেই মুক্তি পাওয়া জনগণ। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ছিটমহল বিনিময়সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে যে বিজয় সূচিত হয়েছে তা শেখ হাসিনা সরকারের কূটনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে এক অভাবনীয় সাফল্য। এই ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বাংলাদেশ-ভারতের বন্ধুত্বের উজ্জ্বল দ্যুতি ছড়িয়েছে এই চুক্তি।
২০১৯ সালে নোবেল কর্তৃপক্ষ দুই দেশের মধ্যেকার দীর্ঘদিনের যুদ্ধের অচলাবস্থার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে শান্তির পরিবেশ তৈরির জন্য প্রেসিডেন্ট আফওয়ের্কির ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। একই সঙ্গে নোবেল কমিটি বলেছে, এই পুরস্কার ইথিওপিয়া এবং উত্তর ও উত্তর-পূর্ব আফ্রিকায় শান্তি ও সুস্থিতি ফেরানোর জন্য যারা কাজ করছেন তাদেরও স্বীকৃতি দিচ্ছে। অথচ কোনো প্রকার রক্তপাত ছাড়াই ছিটমহল সমস্যার সমাধান ছিল বিশ্বশান্তি ও মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অভাবিত দৃষ্টান্তের জন্য দুই দেশের শীর্ষ নেতা-নেত্রীরই আন্তর্জাতিক সম্মাননা প্রাপ্য।
n লেখক :সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ
