ঢাকার ল্যান্ডফিলগুলোর দুর্দশা এবং পরিবেশগত প্রভাব

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২১, ০০:৩০

 

সাধারণত লোকালয় থেকে দূরে একটি নির্দিষ্ট স্থানে কঠিন বর্জ্য পদার্থ জমা করা ও নিষ্পত্তি করার পদ্ধতি হলো ল্যান্ডফিলিং। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে উপযোগী পদ্ধতি হলো এটি। সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ল্যান্ডফিলিং করা হলে বর্জ্যের কবল থেকে পরিবেশকে রক্ষা করা যায়। কিন্তু সেটি না হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পরিবেশ। প্রতিদিন ঢাকা শহরে ৬ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন বর্জ্য উত্পন্ন হয়। দুই সিটি করপোরেশন এসব বর্জ্য অপসারণ করার পর এদের ঠিকানা হয় দুই সিটি করপোরেশনের দুটি ল্যান্ডফিল। এদের একটি রাজধানীর আমিনবাজারে আর অন্যটি মাতুয়াইলে।

সম্প্রতি এক আন্তর্জাতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ মিথেন গ্যাস ছড়ানো দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ পৃথিবীর ১২তম বৃহত্ মিথেন সোর্স! আর এই মিথেনের বড় অংশ আসছে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল থেকে। মাতুয়াইল এবং ২০১৭ সালে মেয়াদোত্তীর্ণ আমিনবাজারের ল্যান্ডফিল এখন বর্জ্য সরবরাহে অনুপযোগী। এককথায় স্যানিটারি ল্যান্ডফিল তৈরির উদ্দেশ্যে এগুলো স্থাপন করা হলেও এগুলো খোলা ডাম্পের চেয়েও ভয়াবহ। পরিবেশের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে প্রথমত, ল্যান্ডফিল গ্যাস। এর মধ্যে মিথেন গ্যাস প্রধান। ল্যান্ডফিলে নিক্ষিপ্ত জৈব বর্জ্যগুলো প্রতিনিয়ত পচছে। সঙ্গে উত্পন্ন করছে ব্যাপক পরিমাণ মিথেন গ্যাস। এই গ্যাস কার্বন-ডাই-অক্সাইডের চেয়ে ৮৪গুণ বেশি পরিবেশের তাপমাত্রা বাড়ায়। জলবায়ু পরিবর্তনে মিথেনের এই গুণ তাকে শক্তিশালী গ্রিনহাউজ গ্যাসে পরিণত করেছে! দ্বিতীয়ত, লিচেট! এটি এক ধরনের তরল, যা ল্যান্ডফিল থেকে নিষ্কাশিত হয়। এটি বিভিন্ন উপায়ে গ্রাউন্ডওয়াটার টেবিলে প্রবেশ করতে পারে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে লিচেট ঢুকতে পারলে নিমিষেই নষ্ট করে ভূগর্ভের স্বচ্ছ বিশুদ্ধ পানির বিশুদ্ধতা! তৃতীয়ত, ভূমি অধিগ্রহণ! ল্যান্ডফিল সাইট তৈরির সময় নির্ধারিত আয়তনের কথা উল্লেখ থাকলেও জনসংখ্যার ঊর্ধ্বগমন সঙ্গে বর্জ্যের ঊর্ধ্বগমন সেই আয়তনে সীমাবদ্ধ থাকা সম্ভব হয় না। কারণ মাথা যতই বাড়ে, মাথাপিছু বর্জ্যও তত বাড়ে। আর ঢাকার ল্যান্ডফিল দুটি তাদের ধারণক্ষমতা ছাড়ালেও তাতে নিক্ষিপ্ত বর্জ্যের চাপে বর্জ্য আশেপাশের জায়গা দখল করছে।

অবৈজ্ঞানিক পন্থায় পরিচালিত ল্যান্ডফিলগুলো থেকে বর্জ্যগুলি মাটি, পানি ও বায়ু দূষণ, বাস্তুতন্ত্রের ধ্বংস, জমির উর্বরতা হ্রাস, পরিবেশের নান্দনিকমান হ্রাস করা ছাড়াও পানিবাহিত বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই শুধু বর্জ্য অপসারণের সুব্যবস্থা করলেই হবে না, অপসারণের পর বর্জ্যের উপযুক্ত ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা করতে হবে। আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত ল্যান্ডফিলে এমন অনন্য ডিজাইন থাকে, যার জন্য না লিচেট ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত করতে পারে, না কোনো ক্ষতিকর গ্যাস পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে। এসব উন্নত ল্যান্ডফিলে বিশেষ সেন্সর লাগানো থাকে, যা ল্যান্ডফিল গ্যাস ও লিচেট শনাক্ত করতে পারে।

সিটি করপোরেশন থেকে বর্জ্য সংগ্রহের পর বাছাই করে পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য পৃথক করা হয়। সংগৃহীত বর্জ্য নির্ধারিত জায়গায় কয়েকটি সেলের মধ্যে ধাপে ধাপে রেখে ভারী যন্ত্রপাতির সাহায্যে চাপা দিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়। বৃষ্টির পানির প্রবেশ প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা হয়। সাইটটি ভরাট হয়ে গেলে স্থায়ীভাবে প্লাস্টিক লাইনারে আবদ্ধ করা হয়, যাতে বৃষ্টির পানি ও বাতাস ঢুকতে না পারে। লাইনারের স্তরের ওপর  দুই ফুট বা ততোধিক মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এ মাটির স্তরের ক্ষয় রোধ করতে সাধারণত ঘাস জাতীয় উদ্ভিদ এবং কম শিকড়যুক্ত গাছপালা রোপণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে এটি হতে পারে শক্তি উত্পাদনের একটি উত্স অথবা বৃক্ষ সম্বলিত উদ্যান অথবা পাবলিক প্রকল্প নির্মাণের স্থান।

পরিবেশদূষণ নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। করোনাকালে এই ইস্যু কিছুটা ধামাচাপা পড়লেও নীরবে দূষণ চালিয়ে যাচ্ছে তার ধ্বংসযজ্ঞ। ব্লুমবার্গ দাবি করেছে, বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ ‘রহস্যময়’ মিথেন গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ এত বিপুল পরিমাণ মিথেন গ্যাস উত্পন্ন করুক বা না করুক, স্যাটেলাইটে মিথেনের উপস্থিতি বাংলাদেশের বায়ুমণ্ডলে দেখা গেছে। যা আমাদের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ! আমরা বর্তমানে বাংলাদেশের জলবায়ুর পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করছি। উপযুক্ত ল্যান্ডফিলিংয়ের মাধ্যমে পরিবেশ থেকে অনেক বর্জ্য বিয়োজন সম্ভব। এবং অনেক শক্তি উত্পাদন সম্ভব। তাই অবিলম্বে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে ল্যান্ডফিল পরিচালনা করা অতীব জরুরি।

শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ,

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ