বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যম তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সামনে আনে, যখন তারা ভালো কোনো গবেষণার ফল প্রকাশ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের খবর তখন সামনে নিয়ে আসে, যখন তাঁরা একাডেমিক পুরস্কার পান। ধরা যাক, করোনার টিকার কথা। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকাণ্ড বন্ধ। সেখানে এই আপত্কালে করোনার টিকা আবিষ্কার করেছে বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা, গবেষকরা। আর এটাই হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্থকতা। করোনাকালে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সরকার পাশে পায়নি কিংবা তাদের নেওয়া হয়নি, যতটা না অন্য পেশার মানুষ সামনে দাঁড়িয়েছে।
উচ্চশিক্ষার মান ও গবেষণার পরিবেশ যখন থমকে আছে, ঠিক তখন আমাদের দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বেড়েই চলছে। করোনার সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মলাভ বন্ধ থাকেনি। সম্প্রতি ঘোষণা করা হয়েছে—জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় হবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হলেই শিক্ষার মান বাড়বে, ব্যাপারটা এমন সহজ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় আর সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মলাভের আগে তার আনুষঙ্গিক প্যারামিটারগুলো পূর্ণ হওয়া চাই। সেটা করতে না পারলে, কেবল অলিগলিতে বিশ্ববিদ্যালয় পয়দা করলে শিক্ষার শক্তিশালী ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
আমাদের দেশে কয়েক হাজার কলেজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে উচ্চশিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে। এইসব কলেজ থেকে পাশ করে কখনোই একটি ছেলে বা মেয়ে বাইরের কোনো দেশে গবেষণা করার স্বপ্ন দেখে না। উচ্চশিক্ষার জন্য স্কলারশিপের জন্য লড়ে না। শুধু কলেজ কেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরাও ঠিক একই সমস্যায় নিমজ্জিত। এই যখন আমাদের উচ্চশিক্ষালয়ের অবস্থা, ঠিক তখন আমরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে তত্পর। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ব র্যাংকিংয়ে যখন হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের তালিকায় দেশের কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান দখল করতে পারছে না, তখন আমরা জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার স্বপ্ন দেখছি!
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পার হলো, পঞ্চাশটি বিশ্ববিদ্যালয়ও হয়েছে। এই তো কয়েকদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শতবর্ষ পার করল। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে আমরা এমন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে পারিনি, যে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমরা শিক্ষা ও গবেষণার দাপট নিয়ে গর্ব করতে পারি। আমরা এমন কোনো শিক্ষানীতি গ্রহণ করতে পারিনি, যে শিক্ষানীতির আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মান বাড়ে।
কেন আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গড়তে পাচ্ছি না, সাহস দেখাচ্ছি না? আমাদের দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে যাওয়া ছেলেমেয়েরা দেশের জন্য ভারী হয়ে উঠছে।
মূলত আমাদের শিক্ষার মানের নিম্নমুখিতার সুযোগ নিয়ে অন্য দেশের গ্রাজুয়েটরা যত সহজে আমাদের দেশের কোম্পানি ও সংস্থাগুলোতে থিতু হচ্ছে, ততটা আমাদের ছেলেমেয়েরা পারছে না। আমরা কখনো ভাবছি না, বিশ্ববিদ্যালয় মানে কেবল সনদ দেওয়ার কারখানা নয়, বিশ্ববিদ্যালয় মানে একটি ছেলে বা মেয়েকে বিশ্ব মানব তৈরি করে দেওয়া। যা দিয়ে তারা সারা বিশ্বে চষে বেড়াবে, নেতৃত্ব দেবে। অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যস্ত থেকে কখনোই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি মনোযোগ দেওয়া হয়নি। এভাবে দিনের পর দিন যদি আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল স্নাতক উত্পাদনের কারখানা বানিয়ে রাখি, তাহলে আমাদের ভবিষ্যতের জন্য তা অশনি সংকেত।
আমরা জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে চাই না। বরং এমন বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে চাই, যে বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে দেশের বাইরে গর্ব হবে। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবে না। আমরা এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় চাই, যেখানে কেবল সনদ দেওয়া নয়, বরং স্বীয় দক্ষতায় শিক্ষার্থীদের জীবন-জীবিকার নতুন দিগন্তের সূচনা করে দিতে পারে। আমাদের এমন একটি উচ্চশিক্ষালয় প্রয়োজন, যেখানে পাঁচটি গবেষণাগার আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার সুযোগ-সুবিধা পাবে, গবেষণা-প্রবন্ধ বড় বড় জার্নালে প্রকাশ পাবে।
আমরা এমন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পেতে চাই, যাকে নিয়ে বিদেশের পত্রিকা লিখবে—দ্যা মোস্ট প্রেস্টিজিয়াস একাডেমিক রিসার্স ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ। মানহীন শিক্ষালয়ে স্নাতক-স্নাতকোত্তর শেষে বাপ-মায়ের বোঝা হওয়ার চেয়ে খেটে খাওয়া দিনমজুর হওয়া শ্রেয়। আজকে দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদধারী যখন পাশ করে চাকরি পাচ্ছে না, তখন সেটাকে কার অযোগ্যতা বলা যায়?
আমরা অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয় গড়বো। তা অবশ্যই উচ্চশিক্ষার বিকাশে যুগোপযোগী বিশ্ববিদ্যালয় হতে হবে। আমরা চাই, সরকার তার নীতিগত সিদ্ধান্তগুলোকে পুনর্বিবেচনা করুক। গবেষণার সুধা যতদিন বাংলাদেশ ভোগ করবে না, ততদিন আমরা উন্নয়নের ইমিউনিটি তৈরি করতে পারব না।
গবেষক, ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান
